যুক্তরাষ্ট্রের ইরান যুদ্ধের প্রভাব এখন আর মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘাতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা সরাসরি চাপ তৈরি করছে মার্কিন অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকে রাজনৈতিক চাপে ফেলেছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে নিয়মিত পেট্রলের জাতীয় গড় দাম প্রতি গ্যালনে ৪ দশমিক ৩৩ ডলারে পৌঁছেছে। যুদ্ধের আগে এই দাম ছিল ২ দশমিক ৯৮ ডলার। অর্থাৎ, দাম বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। একই সময়ে ডিজেলের দাম প্রতি গ্যালনে ৬ দশমিক ৩৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ৬৮ শতাংশ বেশি।
মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তাকে এই মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ডিজেলের দাম বাড়ায় পণ্য পরিবহন, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের ব্যয়ও বাড়ছে। এপি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে বিমানভাড়া আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেশি ছিল।
মুডিস অ্যানালিটিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক জান্ডির হিসাব অনুযায়ী, জ্বালানি, সুদের হার ও সামরিক ব্যয়সহ যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট খরচের কারণে একটি গড় মার্কিন পরিবারের ওপর প্রায় ২ হাজার ডলারের সমপরিমাণ আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানির বাড়তি ব্যয় ১ হাজার ১০০ ডলার, সুদের হার বৃদ্ধির প্রভাব ৫৪০ ডলার এবং সামরিক ব্যয়ের অংশ ৩৬০ ডলার। তবে এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপের একটি অনুমান; প্রতিটি পরিবারের সরাসরি ক্ষতির হিসাব নয়।
শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের ১ অক্টোবর প্রকাশিত ‘আমেরিকানস, ফরেন পলিসি অ্যান্ড দ্য ২০২৬ মিডটার্মস’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, মার্কিন ভোটারদের কাছে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী ইস্যু।
১০ থেকে ২১ জুলাই পরিচালিত জরিপে ৩৭ শতাংশ উত্তরদাতা বিষয়টিকে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। বিপরীতে, মাত্র ২ শতাংশ উত্তরদাতা ইরান যুদ্ধকে সরাসরি প্রধান নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত করেন।
তবে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ ব্যাপক। জরিপে ৮৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়েছে। এ ছাড়া ৭২ শতাংশ মনে করেন, সংঘাতটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তির ক্ষতি করেছে। যুদ্ধের ব্যয় সম্ভাব্য সুফলকে ছাড়িয়ে গেছে বলে মনে করেন ৬৮ শতাংশ উত্তরদাতা।
দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতেও মতামতের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। রিপাবলিকানদের ৬৩ শতাংশ যুদ্ধকে ব্যয়সাপেক্ষ হলেও সমর্থনযোগ্য মনে করেন। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটদের ৯১ শতাংশ এবং স্বতন্ত্র ভোটারদের ৭৬ শতাংশ মনে করেন, যুদ্ধের ব্যয় এর সম্ভাব্য সুফলের চেয়ে বেশি। তবে জরিপটি জুলাইয়ে পরিচালিত হওয়ায় নির্বাচনের ঠিক আগের জনমত এতে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি।
ট্রাম্প প্রশাসন ও রিপাবলিকানদের একটি অংশ ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যুক্তিতে সামরিক অভিযানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধের ব্যয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
যুদ্ধের লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে, সামরিক ব্যয়ের যৌক্তিকতা কী এবং সংঘাত কত দিন চলবে—এসব বিষয় নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক বাড়ছে। রিপাবলিকানদের মধ্যেও যুদ্ধের সময়কাল ও ব্যয় নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসন এবং সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এ নির্বাচনের ফল কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়ন, বাজেট এবং পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের সক্ষমতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে।
ইরান যুদ্ধ নির্বাচনের ফল কতটা প্রভাবিত করবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে ভোটারদের কাছে যুদ্ধ সরাসরি প্রধান নির্বাচনী ইস্যু না হলেও এর অর্থনৈতিক মাশুল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার খরচ নিয়ে অসন্তোষ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ বাড়াতে পারে।
পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব যখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ে এসে পড়ে, তখন আন্তর্জাতিক সংঘাত আর শুধু সামরিক কৌশল বা কূটনীতির বিষয় থাকে না; তা হয়ে ওঠে অর্থনীতি, জনজীবন ও রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই চাপ ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানে কতটা প্রভাব ফেলবে, তার উত্তর মিলবে ভোটের ফলাফলে।
The post ইরান যুদ্ধের খেসারত দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, ভোটের আগে চাপে ট্রাম্প appeared first on ভোরের চেতনা.
