স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দল বা সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ ও প্রভাব থাকবে না বলে জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের এখনই জনগণের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। পাশাপাশি দল থেকেও এমন যোগ্য প্রার্থীকে মনোনীত করতে বলেছেন, যাঁর জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রাম নগরের রেডিসন ব্লুতে অনুষ্ঠিত সাংগঠনিক সভায় এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। সভায় উপস্থিত একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে তাঁরা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সভায় চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির প্রায় ৫০০ নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। সময়স্বল্পতার কারণে সভায় কেবল তারেক রহমান বক্তব্য দেন। একাধিক নেতাকর্মী জানিয়েছেন, সভায় প্রধানমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নেও দলীয় নেতাকর্মীদের অবদান রাখতে নির্দেশনা দেন। তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাকে দুটো জিনিস এনে দেবেন। সব এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে আপনাদের যেকোনো মূল্যে অবদান রাখতে হবে। মানুষ যেরকম শান্তি-শৃঙ্খলা চায়, সেটা। আপনি যা চান, তা নয়; আপনি যেটা চান, সেটা রাখা যাবে না। সাধারণ মানুষ শান্তি-শৃঙ্খলার মধ্যে যে সেন্স তৈরি করে, সেটাই হলো আমাদের কথা।’ তারেক রহমান দলের নেতাকর্মীদের বলেছেন, ‘আপনি যদি চান, আপনার এলাকায় ড্রাগের সমস্যা কমে আসতে পারে। আপনি যদি চান, আপনার এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। আপনি যদি চান, বিভিন্ন রকমের যে চোর-বাটপার আছে, সেগুলো কমে আসতে পারে। এই চাওয়াটা আপনাদেরই হতে হবে, শুধু প্রশাসনিকভাবে হলে হবে না।’ তিনি বলেছেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তি জনগণ। রাজনৈতিক শক্তি যদি সঠিক চায়, তাহলে কিন্তু অনেক খারাপ কাজ কমে যাবে। আপনারা যদি চান, ইনশাআল্লাহ, তাহলে আমরা পারব। মানুষের মধ্যে যে প্রত্যাশা আছে, মানুষ যে প্রত্যাশা করেছে বা তৈরি হয়েছে, তার মাধ্যমে আমরা সুন্দর পরিবেশ তৈরি করে তা বাস্তবায়ন করতে পারি।’ নেতাকর্মীদের কাছে নিজের দ্বিতীয় প্রত্যাশা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘লোকাল ইলেকশন আসছে। গত নির্বাচনে জনগণ যে আস্থা আমাদের শক্তির ওপর রেখেছে, লোকাল ইলেকশনেও সাধারণ মানুষের সমর্থন নিয়ে বের হয়ে আসতে হবে। এই অঙ্গীকার আপনাদের করতে হবে। আপনি যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন, জনগণ আপনার পক্ষে থাকবে।’ সাংগঠনিক সভায় প্রধানমন্ত্রী কী বার্তা দিয়েছেন, জানতে চাইলে সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর পুরো বক্তব্যের মূল কথা হলো, জনগণ আমাদের ওপর সর্বাধিক আস্থা রেখে ভোট থেকে শুরু করে এখনো পর্যন্ত পাশে আছে। সেটাকে দেশের জন্য শক্তিতে পরিণত করতে হবে। কেননা, তারা আমাদের কাছ থেকে আশা করে। সুতরাং, তাদের আশা পূরণ করাটাই আমাদের দায়িত্ব। এটার মর্যাদা দিতে হবে। আমাদের কর্মীদের, আমাদের নেতৃত্ববৃন্দকে জনগণের সেবা, জনগণের জন্য এবং জনগণের আস্থা রক্ষায় কাজ করতে হবে। সেজন্য নির্বাচন থেকে শুরু করে যা-ই সামনে আসবে, আমাদের মূল কাজ একটাই—জনগণের পাশে থাকা।’ সভায় উপস্থিত সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান বলেন, প্রধানমন্ত্রী দলের নেতাকর্মীদের মানুষের পাশে থাকার নির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে আগামীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জনগণের সমর্থন পাবেন এবং জনগণের পাশে থাকবেন, এমন প্রার্থী দেওয়ার কথা বলেছেন। সাংগঠনিক সভায় প্রধানমন্ত্রী কী বলেছেন, জানতে চাইলে নগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সারমর্ম হচ্ছে, আমাদের নিজেদের ভালোভাবে চলতে হবে, মানুষের সঙ্গে সদাচরণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন করতে হলে একা প্রশাসনের পক্ষে সম্ভব নয়। আমাদের দলীয় নেতাকর্মী, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষসহ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করতে হবে।’ স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কোনো বক্তব্য ছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগামীতে স্থানীয় সরকারের যেসব নির্বাচন হবে, সেখানে সরকার অথবা দলের কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না। যেটা অতীতে ছিল, তার ছিটেফোঁটাও এখানে থাকবে না। সুতরাং, যারা নির্বাচন করবেন, তাঁদের জনগণের কাছে যেতে হবে। পাশাপাশি দলকেও এমন একজনকে মনোনীত করতে হবে, যিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার সক্ষমতা রাখেন।’ সভায় উপস্থিত একাধিক নেতা জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষ বিএনপিকে ভালোবাসে বলেই দলের ছোটখাটো ভুলত্রুটি হলেও আপত্তি তোলে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাই জনগণের সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে নেতাকর্মীদের সতর্ক করেছেন তিনি। তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে নেতাকর্মীদের রাজপথের ত্যাগের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘সভায় উপস্থিত প্রত্যেকটি মানুষ গত ১৭ বছর বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মিথ্যা মামলা ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। কিন্তু তারপরও তাঁরা রাজপথে ছিলেন। বিএনপি ১৭ বছর ধরে রাজপথে অত্যাচারিত ছিল বলেই সমস্ত পৃথিবীর মানুষ জানতে পেরেছে। ১৭ বছর বাংলাদেশে একটি স্বৈরাচারী শাসনামল চলেছে। বিএনপির লক্ষ-কোটি কর্মীর কারণে বিশ্ববাসী উপলব্ধি করতে পেরেছিল, বাংলাদেশে স্বৈরাচার ছিল।’ চব্বিশের আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘প্রথমে বিএনপি আন্দোলন শুরু করেছে। এরপর বিএনপি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে আস্থায় এনেছে এবং আন্দোলনের জন্য তৈরি ও প্রস্তুত করেছে। একপর্যায়ে তা ছাত্র-জনতার মহাবিস্ফোরণে রূপ নিয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বর্তমানে সরকারকে দুটি ফ্রন্টে লড়াই করতে হচ্ছে। একটি হচ্ছে রাজনৈতিক ফ্রন্ট, অন্যটি প্রশাসনিক। প্রশাসনিক ফ্রন্ট বলতে অর্থনীতি, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং গত ১৭ বছরের সরকারের সময়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া বিভিন্ন খাতকে বোঝানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের শূন্য থেকে নয়, একেবারে মাইনাস থেকে শুরু করতে হয়েছে। এই মাইনাস থেকে আস্তে আস্তে পরিশ্রম করে শূন্যতে আসতে হবে। শূন্য থেকে তারপরে ইনশাআল্লাহ আমরা প্লাসে যাব।’ সভায় উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, নিতাই রায় চৌধুরী, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য গোলাম আকবর খন্দকার, এস এম ফজলুল হক, পানিসম্পদমন্ত্রী শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ভিপি হারুনুর রশিদ হারুন, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ এমপি, নগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান, দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়া, সদস্যসচিব লায়ন হেলাল উদ্দীন, মোস্তফা কামাল পাশা এমপি, নুরুল আমিন এমপি, সরোয়ার আলমগীর এমপি, সরোয়ার জামাল নিজাম এমপি, আবু সুফিয়ান এমপি, সাঈদ আল নোমান এমপি, এনামুল হক এনাম এমপি, জসিম উদ্দিন এমপি, মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসেম বক্কর প্রমুখ।
