মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রীদের যাত্রাসংকটের মধ্যে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবের বিমানবন্দরে বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশের ১০৩টি সরাসরি ও ট্রানজিট ফ্লাইটের কার্যক্রমে প্রভাব পড়েছে। ভোগান্তিতে পড়েছেন ১৫ হাজার ৭৭৯ জন যাত্রী। এর মধ্যে মালয়েশিয়ায় ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী সম্পূর্ণ বিনা অভিবাসন ব্যয়ে নিয়োগের বিষয়ে নীতিগত সম্মতি পাওয়া গেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করতে সম্মত হয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
দুটি ঘটনা বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক যাতায়াতে কার্যকর প্রস্তুতি এবং বিকল্প সুযোগ সম্প্রসারণের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। তবে সৌদির ফ্লাইটে বিঘ্নের অর্থ মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়; অন্যদিকে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের ঘোষণাটিও এখনো নীতিগত সম্মতির পর্যায়ে রয়েছে।
সৌদিতে ১০৩ ফ্লাইটে প্রভাব: সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে পরিচালনাগত বিধিনিষেধের কারণে ১০৩টি ফ্লাইটের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট ৪২টি এবং ট্রানজিট ফ্লাইট ৬১টি। এতে ১৫ হাজার ৭৭৯ জন যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১৭টি, ইউএস-বাংলার ১০টি, সৌদিয়ার আটটি এবং রিয়াদ এয়ারের সাতটি ফ্লাইট প্রভাবিত হয়েছে। ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগোর ২২টি, এমিরেটসের ১৪টি, কাতার এয়ারওয়েজের আটটি, সালামএয়ারের সাতটি, ফ্লাইদুবাইয়ের ছয়টি, এয়ার ইন্ডিয়ার তিনটি এবং ইজিপ্টএয়ারের একটি ফ্লাইট রয়েছে।
রিয়াদ ও দাম্মাম বিমানবন্দরে কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ফ্লাইটের সময়সূচি পরিবর্তন ও বাতিলের ঘটনা ঘটে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদ ও দাম্মাম রুটে ফ্লাইট স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। যাত্রীদের সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে সর্বশেষ সময়সূচি জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে যাত্রীদের পাশাপাশি বিদেশে চাকরিতে যোগ দিতে যাওয়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ, যোগদানের সময়সীমা ও সংযোগ ফ্লাইট নিয়ে জটিলতা এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত সহায়তা প্রয়োজন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) জানিয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার কর্মী সম্পূর্ণ বিনা অভিবাসন ব্যয়ে নিয়োগের বিষয়ে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে মালয়েশিয়া। উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে বিদেশে চাকরি পেতে কর্মীদের আর্থিক চাপ কমবে এবং ঋণনির্ভরতা হ্রাসের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে কোন খাত থেকে কর্মী নেওয়া হবে, নির্বাচনপ্রক্রিয়া কী হবে এবং বিমানভাড়া, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় কারা বহন করবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা প্রয়োজন। নীতিগত সম্মতির পর নিয়োগকর্তার চাহিদা, কর্মীদের যোগ্যতা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ভিসা ও প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই কর্মী পাঠানোর অগ্রগতি নিশ্চিত হবে।
মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল), ২৫টি বেসরকারি প্রসেসিং বা সার্ভিস এজেন্সি এবং ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে।
অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো মালয়েশিয়ায় নিয়োগকর্তা খুঁজে চাকরির চাহিদাপত্র সংগ্রহ ও কর্মী নির্বাচন করতে পারবে। কলিং ভিসা, ই-ভিসাসহ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বোয়েসেল ও ২৫টি প্রসেসিং এজেন্সি সহায়তা করবে। এরপর বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী কর্মীদের ছাড়পত্র নেওয়া হবে।
২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, নির্ধারিত যোগ্যতার ভিত্তিতে রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন ও তালিকাভুক্তির বিধান রয়েছে। এর আগে ৪২৩টি এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল।
মালয়েশিয়ায় কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারের তালিকা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। দুই দেশের যৌথ প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রগুলো যাচাই-বাছাই করে তালিকা অনুমোদন করা হবে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র বাদ দিয়ে অনুমোদিত অবশিষ্ট কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোনো একটি কেন্দ্রকে এককভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে না।
একই সঙ্গে নিয়োগকর্তার বৈধতা, চাকরির চুক্তি, বেতন, কর্মঘণ্টা ও আবাসনের শর্ত যাচাই করা জরুরি। কর্মীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের হিসাব স্বচ্ছ রাখা এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে অনিয়মের সুযোগ কমবে।
বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক কর্মী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজ করেন। এসব দেশের কর্মসংস্থান ও যাতায়াতব্যবস্থায় পরিবর্তন হলে প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবার প্রভাবিত হতে পারেন। তাই বিদ্যমান শ্রমবাজারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি মালয়েশিয়ার মতো বাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদির ফ্লাইট পরিস্থিতি মোকাবিলায় যাত্রীদের দ্রুত তথ্য ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া এবং মালয়েশিয়ায় নিয়োগের প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা এখন অগ্রাধিকার। ১০ হাজার কর্মী বিনা খরচে নিয়োগের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা কর্মীদের আর্থিক সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষণার বাস্তবায়ন, দক্ষতাভিত্তিক নির্বাচন এবং কর্মীদের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর।
