নীলফামারীতে আমন চাষে খরচের বোঝা, শঙ্কায় কৃষক
প্রভাত সংবাদদাতা, নীলফামারী: সবুজে ঘেরা আমন ধানের মাঠজুড়ে এখন মৌ মৌ গন্ধ ছড়ানোর কথা। তবে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার কৃষকদের মনে নেই সেই প্রত্যাশিত আনন্দ। ডিজেল, সার, কীটনাশক ও কৃষিশ্রমিকের বাড়তি খরচের চাপে দিশেহারা তারা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেচের অনিশ্চয়তা। সব মিলিয়ে আমন চাষে বাড়তি ব্যয়ের বোঝা আর ফসল ঘরে তোলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে কৃষকদের।একদিকে উৎপাদন খরচের ঊর্ধ্বগতি, অন্যদিকে ধান কাটার পর ন্যায্য দাম পাওয়ার অনিশ্চয়তা। সব মিলিয়ে আমন চাষে লাভের আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে প্রান্তিক কৃষকদের। ফসল ঘরে তুলেও উৎপাদন খরচ উঠবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় দিন কাটছে তাদের।চলতি আমন মৌসুমে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় ২১ হাজার ২৪১ হেক্টর জমিতে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে উপজেলা কৃষি বিভাগ। তবে ধান রোপণ থেকে শুরু করে পরিচর্যা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বাড়তি খরচের চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।
কৃষকদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি। সম্প্রতি লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকায় পৌঁছেছে। এতে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র চালাতে গিয়ে বাড়তি খরচের মুখে পড়ছেন কৃষকরা। পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে জমিতে সেচ দিতে অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে তাদের। ফলে সেচের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন চাষিরা। অনেকেই এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির অপেক্ষা করছেন।কৃষকদের ভাষ্যমতে, সার ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধির কারণে খরচের চাপ সামলাতে অনেকেই বাধ্য হয়ে প্রয়োজনের চেয়ে কম সার ও বালাইনাশক ব্যবহার করছেন। এতে ধানের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া এবং রোগবালাইয়ের আক্রমণে ফলন মার খাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অথচ কৃষকদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফলানো ধানের বাজারমূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে বরাবরই তারা ঠকে যান। মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে ফসল তোলার পর উৎপাদিত ধানের যে দাম পাওয়া যায়, তা দিয়ে অনেক সময় উৎপাদন খরচই ওঠে না।এ অবস্থায় কৃষকদের জোরালো দাবি সার, বীজ ও কীটনাশকের দাম অবিলম্বে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা হোক। একই সঙ্গে কৃষিতে সাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ধান উৎপাদনের খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারিভাবে লাভজনক সংগ্রহমূল্য নির্ধারণ করা সময়ের দাবি।
উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের সোলেমানের চৌপতি গ্রামের কৃষক বিধান চন্দ্র রায় হতাশার সুরে বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ার পর সেচ খরচ আকাশচুম্বী হয়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি। জমিতে এত টাকা ঢেলে ফসল ফলালেও বিক্রির সময় সেই খরচ উঠবে কি না, তা নিয়ে এখন রাতে ঠিকমতো ঘুম হচ্ছে না।একই গ্রামের কৃষক শুকারু মাহমুদের সুরও যেন একই ব্যথায় গাঁথা। তিনি আক্ষেপ করে জানান, প্রয়োজনে সময়মতো জমিতে পানি দিতে না পারলে ধানের ফলন অর্ধেকের নিচে নেমে যেতে পারে। কিন্তু সেচ দেওয়ার খরচ যেভাবে নাগালের বাইরে চলে গেছে, তাতে চাহিদামতো পানি দেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।নাউতারা ইউনিয়নের আকাশকুড়ি গ্রামের কৃষক বছির উদ্দিন বলেন, সেচের বাড়তি খরচ থেকে বাঁচতে প্রকৃতির বৃষ্টির দিকে চেয়ে আছি। কিন্তু সময়মতো বৃষ্টি না হলে পাম্প চালাতেই হবে। আর প্রতিবার পানি দিতে যে বাড়তি টাকা খসে পড়ছে, তাতে ধান চাষ করে লাভের বদলে ঋণের বোঝা বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি।আরেক কৃষক রোবায়ত আলী বলেন, ভালো বীজের চারা কেনা থেকে শুরু করে জমি প্রস্তুতের ট্রাক্টর ভাড়া, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ, শ্রমিকদের উচ্চ মজুরি, সেচ দেওয়া এবং পরিশেষে ধান কাটা ও মাড়াই-পুরো প্রক্রিয়াটিতে খরচের পাহাড় জমেছে। বাজারে ধানের দাম যদি সেই অনুযায়ী না বাড়ে, তবে ধারদেনা করে চাষ করা কৃষকরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়বেন।এ বিষয়ে ডিমলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মীর হাসান আল বান্না বলেন, জ্বালানি তেল এবং কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধির ফলে আমন চাষিদের উৎপাদন ব্যয় কিছুটা বেড়েছে এটি বাস্তব। তবে আমরা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের পানি ও জ্বালানি সাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করছি। সঠিক সময়ে সুষম সার ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার (আইপিএম) মাধ্যমে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাজ করে যাচ্ছে আমাদের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা।
More News Of This Category

