রিয়াদের কিং খালিদসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ইয়েমেনের হুতিদের হামলায় সৃষ্ট পরিস্থিতিতে সীমিত পরিসরে চলছে ফ্লাইটের কার্যক্রম। কোথাও ফ্লাইট একেবারেই বন্ধ। সৌদিমুখী অনেক ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও। গতকাল সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৫১টি ফ্লাইটের প্রায় সাড়ে ৫ হাজার যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
ফ্লাইটের সময়সূচির অনিশ্চয়তায় বিপাকে পড়েছেন হাজারো সৌদিপ্রবাসী। তাঁদের অনেকের ছুটি শেষ হয়ে গেছে। কারও ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফিরতে না পারলে চাকরি হারানো কিংবা আর্থিক সংকটে পড়ার আশঙ্কায় উদ্বেগের মধ্যে সময় কাটছে তাঁদের।
ঢাকায় আটকে পড়া যাত্রীদের মধ্যে সৌদি আরবগামী সরাসরি ফ্লাইটের যাত্রী যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন অন্য দেশের বিমানবন্দর হয়ে সৌদি আরবে যাতায়াতকারী ট্রানজিট যাত্রীরাও।
গতকাল সন্ধ্যায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট শাখার স্কোয়াড্রন লিডার সাকিব জানান, কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত ৫১টি ফ্লাইটের মধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে সরাসরি চলাচলকারী ১২টি এবং ট্রানজিট ফ্লাইট ৩৯টি। সরাসরি ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চারটি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের দুটি, সৌদিয়া এয়ারলাইনসের তিনটি এবং রিয়াদ এয়ারওয়েজের তিনটি ফ্লাইট রয়েছে।
ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগোর ১৬টি, সালামএয়ারের তিনটি, ইজিপ্টএয়ারের একটি, এমিরেটসের নয়টি, কাতার এয়ারওয়েজের পাঁচটি এবং ফ্লাইদুবাইয়ের পাঁচটি ফ্লাইট রয়েছে।
রিয়াদ অভিমুখী ফ্লাইট স্থগিত
সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ রুটের সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। গতকাল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিমান কর্তৃপক্ষ বলেছে, বাংলাদেশ সময় ও তারিখ অনুযায়ী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা থেকে রিয়াদগামী সব ফ্লাইট স্থগিত থাকবে। স্থগিত ফ্লাইটগুলোর বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও নতুন সময়সূচি যথাসময়ে জানানো হবে। একই পরিস্থিতিতে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসও ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটের সব ফ্লাইট বাতিল করেছে। সংস্থাটির বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় তাদের বিএস৩৮১ ও বিএস৩৮২ ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকবে। নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করা হলে সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের জানিয়ে দেওয়া হবে।
বিঘ্নিত অন্যান্য ফ্লাইট
নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে ঢাকা-দাম্মাম রুটেও ফ্লাইট পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটেছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৪৯ ফ্লাইটটি গতকাল বেলা ৩টা ১০ মিনিটে স্থগিত করা হয়। বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ফ্লাইটটির পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও নতুন সময়সূচি সম্পর্কে আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে হালনাগাদ তথ্য দেওয়া হবে। এর আগের দিন রোববারও একই ফ্লাইট নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ঢাকা থেকে দাম্মামের উদ্দেশে যাত্রার সময় সৌদি আরবের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলেও কিছু সময় পরে তা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। যাত্রীদের নিরাপত্তা বিবেচনায় বিজি-৩৪৯ ফ্লাইটটি বাংলাদেশ সময় রাত আড়াইটায় কাতারের দোহা বিমানবন্দরে অবতরণ করে। প্রায় তিন ঘণ্টা পর দাম্মাম বিমানবন্দর আবার চালু হলে ফ্লাইটটি বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছায়।
বিকল্প পথে সৌদি পাঠানোর উদ্যোগ
সৌদি আরবের কর্মস্থলে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়া যাত্রীদের বিকল্প পথে সে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এ ক্ষেত্রে যেসব যাত্রীর ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার কাছাকাছি, তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। গতকাল বিকেল থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রধান কার্যালয় বলাকার টিকিট কাউন্টারে ভিড় করেন রিয়াদগামী যাত্রীরা। তাঁদের কেউ ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে চান, আবার কারও ভিসার মেয়াদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। বিকল্প ফ্লাইটের টিকিট পেয়ে অনেকে স্বস্তি প্রকাশ করেন। তবে অনেক যাত্রীকে দীর্ঘসময় টিকিটের অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়।
বিকল্প ফ্লাইটের টিকিট পাওয়া যাত্রী আরেফিন আহমেদ বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, অবশেষে যেতে পারছি।’ তবে ময়মনসিংহের যাত্রী রহিম শেখের মতো অনেকের অপেক্ষা তখনো শেষ হয়নি। দ্রুত বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। এ ধরনের যাত্রীদের উদ্বেগের বড় কারণ, নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে যোগ দিতে না পারার আশঙ্কা। তাঁদের ভাষ্য, ছুটি শেষে কাজে ফিরতে দেরি হলে চাকরি নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
দাম্মামগামী যাত্রীদের মধ্যেও একই ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যশোরের যাত্রী সবুজের গতকাল সকাল ৮টায় দুবাই হয়ে দাম্মাম যাওয়ার কথা ছিল। এ জন্য শনিবারই যশোর থেকে ঢাকায় আসেন তিনি। কিন্তু গতকাল ভোরে কাউন্টারে দাঁড়ানোর পর ফ্লাইট বাতিলের খবর পান। এতে কোথায় থাকবেন, কীভাবে গন্তব্যে পৌঁছাবেন—তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন তিনি। সবুজের ভাষ্য, তাঁর ভিসার মেয়াদও কমে আসছে।
আকরাম নামের এক যাত্রী জানান, তিনি দুই দিন ধরে ঢাকায় অবস্থান করছেন। রোববার তাঁর সৌদি আরবে যাওয়ার কথা থাকলেও ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় যেতে পারেননি।
আগে না জানায় দুর্ভোগ
যাত্রীদের অভিযোগ, ফ্লাইট বাতিল বা সময়সূচি পরিবর্তনের তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই আগে থেকে জানতে পারছেন না তাঁরা। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর খবর পাওয়ায় বাড়ি থেকে ঢাকায় আসার যাতায়াত খরচ, থাকা-খাওয়ার ব্যয় ও সময়—সবই বাড়ছে। কেউ কেউ বলছেন, আগে থেকে জানানো হলে তাঁরা অযথা বিমানবন্দরে আসতেন না। বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে ঢাকায় এসে আবার ফিরে যাওয়া মানসিকভাবেও কষ্টকর। তার ওপর নতুন ফ্লাইট কখন ছাড়বে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য না পাওয়ায় তাঁদের অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে। হোটেলে থাকতে গিয়ে অতিরিক্ত খরচও বহন করতে হচ্ছে। টিকিটের তারিখ পরিবর্তন, অর্থ ফেরত কিংবা বিকল্প ফ্লাইট পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও অনেকের মধ্যে স্পষ্ট ধারণা নেই।
সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসগুলোর কাছ থেকে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা, বিকল্প যাত্রার সুযোগ এবং টিকিট পরিবর্তন বা অর্থ ফেরতের নিয়ম সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য চাইছেন যাত্রীরা। বিশেষ করে যাঁদের ছুটি শেষ, ভিসার মেয়াদ সীমিত কিংবা দ্রুত কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তাঁদের জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা জরুরি।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ বলেন, ‘এটি একটি বৈশ্বিক সংকট। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসগুলো ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করছে।’
যাত্রীদের নিজ নিজ এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করে যাত্রার সময় নিশ্চিত হওয়ার পর বিমানবন্দরে আসার অনুরোধ জানান গ্রুপ ক্যাপ্টেন সামাদ।
সৌদিতে বাংলাদেশিদের সতর্ক থাকার পরামর্শ
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের সতর্ক থাকার এবং স্থানীয় আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস। গতকাল প্রকাশিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে সৌদি কর্তৃপক্ষের জারি করা নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ ও প্রতিপালনের অনুরোধ জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ ও জনবহুল স্থান এড়িয়ে চলার পাশাপাশি নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। দূতাবাস আরও জানিয়েছে, চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কিত তথ্য, ছবি বা ভিডিও ধারণ, আদান-প্রদান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা সৌদি আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ কারণে ফেসবুক, ইউটিউব, এক্সসহ কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের ছবি, ভিডিও কিংবা স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশ না করার জন্যও বাংলাদেশিদের অনুরোধ করা হয়েছে।
