আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে পিটিয়ে হত্যা, সামাজিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান দখলে নিতে সংঘবদ্ধ হামলা- দেশে ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে মব সন্ত্রাসের এমন ভয়ংকর ও অবক্ষয়মুখী রূপ। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ, চুরি, নানা গুজব কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে কেন্দ্র করে উত্তেজিত জনতার নামে প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। উদ্বেগের বিষয় হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতেও হামলা ও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ পুলিশের পেশাদারত্ব ও সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার প্রবণতা মব সন্ত্রাসকে আরও উসকে দিচ্ছে, যা দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে।
সংগৃহীত পরিসংখ্যান ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য পর্যালোচনা করলে এই চিত্র আরও স্পষ্ট ও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মব সন্ত্রাসে ১২৮ জনের মৃত্যু হয়, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১৯৮ জনে। আর ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসেই (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) পিটিয়ে হত্যার শিকার হয়েছে ১৭১ জন। অর্থাৎ আগের বছরের একই সময়ের (১৫২ জন) তুলনায় এই সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। ভৌগোলিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় মব সহিংসতার ঘটনা সবচেয়ে বেশি, যা নগর নিরাপত্তার দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। রাজশাহী মেডিক্যালের ভিসিকে লাঞ্ছিত করে পদত্যাগে বাধ্য করা কিংবা মিরপুরে স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র দখলের ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই সংস্কৃতি কেবল সামাজিক অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং প্রতিষ্ঠান দখল ও চাঁদাবাজির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
মব সন্ত্রাসের পেছনের অন্যতম বড় কারণ হলো আইনের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা এবং বিচারহীনতার দীর্ঘসূত্রতা। সাতক্ষীরার দেবহাটায় ফেসবুকে উসকানি দিয়ে যুবককে পিটিয়ে হত্যা কিংবা কুষ্টিয়ায় পুলিশের উপস্থিতিতে দরবারে হামলার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে সহজেই জনরোষ তৈরি করা হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাইবার মনিটরিং ও বিট পুলিশিংয়ের কথা বলা হলেও বাস্তবে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে স্পষ্ট শিথিলতা দেখা যায়। আমিনবাজারের আলোচিত ৬ ছাত্র হত্যা কিংবা বাড্ডায় রেণু হত্যাকাণ্ডের মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনাগুলোতে বছরের পর বছর বিচার ঝুলে থাকা সাধারণ মানুষের মনে এ ধারণাই জোরদার করছে যে, মব তৈরি করে অপরাধ করলে পার পাওয়া সম্ভব।
আইন-আদালতকে পাশ কাটিয়ে মব বানিয়ে বিচার করা কোনো সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে অবিলম্বে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রভাবমুক্ত হয়ে অপরাধীদের তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার ও সুরক্ষা প্রদানে পেশাদার ভূমিকা পালন করতে হবে; দায়িত্বে অবহেলাকারী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সামাজিক মাধ্যমে গুজব ও উসকানিমূলক পোস্ট ঠেকাতে সাইবার নজরদারি জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে- মব বা দখলবাজিতে নিজ দলের নেতাকর্মী যুক্ত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে দলীয় ও আইনি শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে মব সন্ত্রাসের বিচার সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।
এই মর্মান্তিক পরিস্থিতি নিরসনে এবং জনমনে আইনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারের দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
