ইসরাইলে আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন। আরব নেতা মানসুর আব্বাস দেখাতে চাইছেন, পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দেশ পরিচালনা সম্ভব। কিন্তু দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আরবদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে হুমকি হিসেবে তুলে ধরছেন। বিরোধীদের একাংশও আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনে অনীহা দেখাচ্ছে।
এই স্ববিরোধিতাই হয়তো নির্ধারণ করবে যে, ২৭ অক্টোবরের ইসরাইলের নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হবে কি না।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি থেসালোনিকিতে ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ আয়োজিত এক সম্মেলনে ইসরাইলের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্লোমো বেন-আমি একটি জটিল পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করেন। সরকার গঠনের জন্য নেতানিয়াহুর বিরোধীদের হয়তো আরব দলগুলোর সমর্থনের প্রয়োজন হতে পারে, অথচ তারা এই অংশীদারিত্ব মেনে নিতে দ্বিধাগ্রস্ত।
নেতানিয়াহুর জন্য তার বিরোধীদের পরাজয়ই যে একমাত্র কাম্য তা নয়; বরং তিনি চান তারা যেন কখনোই ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকার গঠন করতে না পারে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে আব্বাসের সঙ্গে ইহুদি রাজনীতিক ইয়োভ সেগালোভিৎজের অংশীদারিত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে। আরব অধ্যুষিত এলাকায় সহিংস অপরাধ দমনে তাদের যৌথ উদ্যোগ ইহুদি-আরব অংশীদারত্বের বাস্তব পরীক্ষা। ২০২১ সালে নেতানিয়াহুও আব্বাসের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। অথচ এখন তিনি আরবদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে বিপজ্জনক হিসেবে উপস্থাপন করছেন।
বিরোধী নেতা ইয়াইর লাপিদ ও গাদি আইজেনকোটও আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের প্রশ্নে অনীহা প্রকাশ করেছেন। জেরুজালেম পোস্টে প্রকাশিত এক জরিপ অনুযায়ী, প্রধান দুই রাজনৈতিক শিবিরের প্রত্যেকের আসনসংখ্যা ৫১ হতে পারে। আরব দলগুলোর ১৪টি আসন এবং অন্য একটি দলের চারটি আসন সরকার গঠনের হিসাবকে জটিল করে তুলেছে। ফলে আরব দলগুলোর সমর্থন বিরোধীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাজনৈতিক সমঝোতা এখনো অনিশ্চিত।
গাজা নিয়ে আব্বাসের সংযত অবস্থানের সমালোচনাও রয়েছে আরব সমাজে। কারণ, সমান নাগরিক অধিকার কোনো সংখ্যালঘু নেতার রাজনৈতিক আপসের ওপর নির্ভর করতে পারে না। নিরাপত্তা, আবাসন, শিক্ষা ও সম্পদে ন্যায্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে নেতানিয়াহুর বিচারব্যবস্থা সংস্কার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ইসরাইলে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। ঘুষ, জালিয়াতি ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে তার বিচারও চলছে; যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। হামলার আগে নিরাপত্তা ও প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হওয়ার বিষয়ে কৌশলগত সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল বলে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২ জানিয়েছে। তবে হামলার নির্দিষ্ট পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল—এমন দাবি নয় এটি। নেতানিয়াহু এসব প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তার সরকারের ভূমিকা যাচাইয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত জরুরি। এই ধরনের তদন্তের বিরোধিতা করার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই।
নেতানিয়াহু দীর্ঘস্থায়ী জরুরি অবস্থাকে নিজের অপরিহার্যতা প্রমাণের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। কোনো নেতার শাসনামলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটলে, তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য রাজনৈতিক সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী হতে পারেন না। নির্বাচনে জয় কখনোই কোনো তদন্ত বা আদালতের রায়ের বিকল্প হতে পারে না।
হামাসের হামলা যেমন নিন্দনীয়, তেমনি ফিলিস্তিনিদের অধিকার অস্বীকার করাও অগ্রহণযোগ্য। ফিলিস্তিনি চিকিৎসা সূত্রের হিসাবে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় নিহতের সংখ্যা ৭৪ হাজার ছাড়িয়েছে। এর প্রভাব ইসরাইলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতেও পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব বেড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও নেতানিয়াহুর পুনর্নির্বাচনের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানাননি, যদিও এতে তাদের সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
তবে নেতানিয়াহুর বিদায়ই সব সমস্যার সমাধান নয়। ইসরাইলের ভবিষ্যৎ সরকারকে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, বসতি সম্প্রসারণ ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে।
ইসরাইলের অভ্যন্তরে আরব নাগরিকদের সমান অধিকার এবং ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পরস্পরের বিকল্প নয়; বরং টেকসই শান্তির জন্য দুটিই জরুরি। নিরাপদ ও স্বীকৃত সীমান্তের পাশাপাশি ইসরাইল ও ফিলিস্তিন-উভয়ের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
একজন নেতাকে ক্ষমতায় ধরে রাখা কোনো জাতীয় কৌশল হতে পারে না। ইসরাইলের এখন এমন সরকার দরকার, যে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারবে এবং শান্তির বাস্তব পথ তৈরি করবে।
আরএ
