মাথায় ও পিঠে ধারালো অস্ত্রের কোপ, ডান পায়ের রগ কেটে ফেলা—মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত রক্তাক্ত বিভীষিকার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নামা মোঃ উবাইদুল হককে। ঢাকা মেডিকেলের আইসিইউতে নাক-কান দিয়ে রক্ত ঝরা অবস্থায় ৮ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে হার মানেন তিনি। বুধবার নিজের ভাইকে এভাবে নির্মমভাবে হারানোর বর্ণনা দিতে গিয়ে আদালতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর বড় বোন মোছাঃ রোকসানা আক্তার।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এবং সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী নেতা কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে করা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ তিনি এ সাক্ষ্য দেন।
সাক্ষ্যর একপর্যায়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামিদের শনাক্ত করে তিনি বলেন, "শেখ হাসিনাসহ ১৪ দলের নেতাদের নির্দেশেই আমার ভাইকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে।" নিহত উবাইদুল হক ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের দত্তগ্রামের বাসিন্দা হলেও জীবিকার তাগিদে চালক হিসেবে ঢাকায় বোন রোকসানার সাথে তেজগাঁও উত্তর বেগুনবাড়িতে থাকতেন। পাশাপাশি ১৪–১৫ বছর ধরে বিএনপির রাজনীতির সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বোন রোকসানা জানান আন্দোলনের দিনগুলোর রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা। তিনি বলেন, গত ১৯ জুলাই সকাল ৯টা–১০টার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে বাড্ডায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে প্রথম আন্দোলনে যান উবাইদুল। সন্ধ্যায় ফিরে এসে বাড্ডার রণক্ষেত্রের বর্ণনা দেন—চারপাশে লাশ আর আহতের আর্তনাদ, তিনি নিজে কোনোমতে প্রাণ নিয়ে ফিরেছেন। পরদিন ২০ জুলাই বেলা ১১টায় বোনের শত নিষেধ ও চোখের জল উপেক্ষা করে আবারও বাড্ডার রাজপথে নামেন তিনি। সেদিনও ফিরে এসে আতঙ্কিত কণ্ঠে জানান, গত দুই দিন ধরে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ ও পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালিয়ে অসংখ্য মানুষ মেরেছে। পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার বারণ করা সত্ত্বেও গোপনে আন্দোলনে যেতেন উবাইদুল।
সবশেষ ৪ আগস্ট সকাল ১০টায় নয়াপল্টন দলীয় কার্যালয়ের সামনে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে অবস্থান নেন তিনি। বিকেল ৪টার দিকে কাকরাইল নাইটিঙ্গেল মোড়ে আসতেই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও পুলিশের যৌথ হামলার মুখে পড়েন আন্দোলনকারীরা। হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে উবাইদুলের কপাল ও হাতে উপর্যুপরি আঘাত করে, ডান পায়ের গোড়ালিতে কোপ দিয়ে রগ কেটে ফেলে এবং পিঠের ডানপাশেও কুপিয়ে গুরুতর জখম করে।
রক্তাক্ত অচেতন অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকলে সঙ্গীরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে কাকরাইল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। রাত ৩টার দিকে সহযোদ্ধারা উবাইদুলের ফোন থেকে কল দিলেও ঘুমিয়ে থাকায় ধরতে পারেননি বোন রোকসানা। ফজরের সময় ঘুম ভেঙে মিসড কল দেখে ফোন করতেই জানানো হয়, ভাই মৃত্যুর মুখে।
ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের আইসিইউতে গিয়ে যে দৃশ্য দেখেন, তা ভাষায় প্রকাশের মতো ছিল না। রোকসানা আদালতে জানান, "গিয়ে দেখি ভাই অচেতন, নাক-কান দিয়ে রক্ত পড়ছে, দুই চোখ ফুলে কালো হয়ে গেছে, কপালে ব্যান্ডেজ। আর পুরো হাসপাতালের ফ্লোর রক্তে ভেসে যাচ্ছিল, শত শত গুলিবিদ্ধ লাশ আর আহত মানুষের ভিড়।"
সেই আইসিইউতেই ৮ দিন থাকার পরে অবশেষে ১২ই আগস্ট দিবাগত রাত ১২টা ০১ মিনিটে মারা যান উবাইদুল। পোস্টমর্টেম শেষে নয়াপল্টন পার্টি অফিসের সামনে প্রথম এবং তেজগাঁও থানার পেছনে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ১৩ আগস্ট রাতে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। সরকারের প্রকাশিত গেজেটে উবাইদুল হকের নাম ৬৪৩ নম্বর শহীদ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
জবানবন্দিতে রোকসানা আক্তার স্পষ্ট উল্লেখ করেন, ১৯ জুলাই শেখ হাসিনার বাসভবনে ১৪ দলের বৈঠকেই কারফিউ জারি এবং ছাত্রদের দেখামাত্র গুলির সিদ্ধান্ত হয়। ওই বৈঠকে উপস্থিত থাকা ওবায়দুল কাদের, কামরুল ইসলাম ও রাশেদ খান মেননসহ অন্য নেতাদের ডকে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় শনাক্ত করেন তিনি।
তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে দাবি করেন, শীর্ষ মহলের ওই গুলির নির্দেশ ও উসকানিতেই মাঠের সন্ত্রাসীরা তাঁর ভাইকে নির্মমভাবে কুপিয়ে ও রক্তাক্ত করে হত্যা করেছে। জবানবন্দি শেষ করে তিনি এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রত্যেকের দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
