বিশকেকে দ্বিতীয় দফা পররাষ্ট্র দপ্তর পর্যায়ের আলোচনার (এফওসি) পর বাংলাদেশ ও কিরগিজস্তান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গভীর করা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ইস্যুতে সমন্বয় জোরদারের অঙ্গীকার করেছে।
ঢাকায় প্রাপ্ত এক বার্তায় জানা গেছে, মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত এই দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র সচিব রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম সিয়াম এবং কিরগিজস্তানের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাইরাত তুরসুনকুলভ।
উজবেকিস্তানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ড. এম মনিরুল ইসলামও বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে ছিলেন।
আলোচনায় উভয় পক্ষ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, শিক্ষা, বৃত্তি, শ্রম গতিশীলতা (লেবার মোবিলিটি), ব্যবসায়ী পর্যায়ে যোগাযোগ (বিটুবি), সংসদীয় আদান-প্রদান, উচ্চপর্যায়ের সফর, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, সংস্কৃতি, পর্যটন, জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং ভিসা সহজীকরণসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সার্বিক দিক পর্যালোচনা করে।
এ সময় দুই দেশের ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমির মধ্যে সহযোগিতাবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা এগিয়ে নিতে ২০২৬-২০২৭ মেয়াদে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মপরিকল্পনা-সংক্রান্ত আরেকটি সমঝোতা স্মারক সই হয়।
বাংলাদেশ ও কিরগিজস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৩৫তম বার্ষিকী ২০২৭ সালে উদযাপনের বিষয়েও দুই পক্ষ সম্মত হয়েছে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অব্যবহৃত সম্ভাবনা কাজে লাগানোকে উভয় দেশ উচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। রাজনৈতিক যোগাযোগ জোরদারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠকসহ উচ্চপর্যায়ের সফর বিনিময়ের আয়োজন করতেও সম্মত হয়েছে তারা।
জাতিসংঘ, ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থাসহ (এসসিও) আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে সহযোগিতা সম্প্রসারণেও দুই দেশের প্রতিনিধিদল একমত হয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং কিরগিজস্তান ২০২৭-২০২৮ মেয়াদে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হতে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় ও পারস্পরিক সহযোগিতার অঙ্গীকার করেছে দুই পক্ষ।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল বিনিময়ে সম্মত হয়েছে দুই দেশ।
বস্ত্র, তৈরি পোশাক, ওষুধশিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তিকে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আলোচনায় ইউরেশীয় অঞ্চলের ভূকৌশলগত গুরুত্ব এবং ১৮ কোটিরও বেশি মানুষের বাজারের বিষয়টি উঠে আসে। এ অঞ্চলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ানো ও বৃহত্তর আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
সরকার-পর্যায়ে, ব্যবসায়ী-পর্যায়ে এবং বেসরকারি খাতের অংশীদারত্বের মাধ্যমে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছে কিরগিজ পক্ষ।
শিক্ষা, খেলাধুলা, পর্যটন, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।
কিরগিজস্তানে দক্ষ ও আধা-দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। তৈরি পোশাক, ওষুধশিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
কিরগিজ প্রতিনিধিদল বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ, বিশেষ করে মেডিকেল কলেজে পড়াশোনার সম্ভাবনার বিষয়টিও তুলে ধরে। শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও ভর্তি প্রক্রিয়ায় নিয়মিত ও বৈধ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
এ ছাড়া কূটনৈতিক ও সরকারি পাসপোর্টধারীদের ভিসা অব্যাহতি, দুই দেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠনের মধ্যে সহযোগিতা, কৃষি, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সংস্কৃতি, পর্যটন, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং শিল্প সহযোগিতাসহ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিষয়ে প্রস্তাবিত কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা নিয়েও আলোচনা হয়।
আলোচনা শেষে পররাষ্ট্রসচিব সিয়াম কিরগিজস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিনবেক কুলুবায়েভের সঙ্গে বৈঠক করেন।
তারা পারস্পরিক সুবিধার জন্য দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় অংশগ্রহণ আরও গভীর করার উপায় নিয়ে কথা বলেন।
কুলুবায়েভ গত সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে তার বৈঠকের কথা স্মরণ করেন এবং উভয় পক্ষের জন্য সুবিধাজনক সময়ে তাকে কিরগিজস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানান।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম ২০৩১-২০৩২ মেয়াদের জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং ২০২৮-২০৩০ মেয়াদের জন্য মানবাধিকার কাউন্সিলে বাংলাদেশের প্রার্থিতার জন্য কিরগিজস্তানের সমর্থন কামনা করেন।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনেও তিনি কিরগিজস্তানের সহযোগিতা কামনা করেন।
২০২৭-২০২৮ মেয়াদে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হতে কিরগিজস্তানকে সমর্থন দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান কুলুবায়েভ।
দুই পক্ষই আশাবাদ ব্যক্ত করে যে, দ্বিতীয় দফার এ আলোচনা বাস্তবভিত্তিক ও ফলাফলমুখী সহযোগিতার আরও দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করবে।
উভয় পক্ষের সুবিধাজনক সময়ে ঢাকায় পররাষ্ট্র দপ্তর পর্যায়ের তৃতীয় দফা আলোচনা আয়োজনের বিষয়ে তারা সম্মত হয়েছে।
