বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি স্মার্টফোনের কল্যাণে ছবি ও শব্দ আদান-প্রদান এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
তবে দূরবর্তী ডিজিটাল যোগাযোগের ক্ষেত্রে এতদিন অনুপস্থিত ছিল গন্ধের অনুভূতি। বিজ্ঞানের নতুন উদ্ভাবনে এবার সে অভাবও পূরণ হতে চলেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
গবেষকরা এমন প্রযুক্তি তৈরির দাবি করেছেন, যেখানে এক ধরনের ‘ইলেকট্রনিক নোজ’ বা ই-নোজ দূর থেকেই কফির পরিচিত সুবাসের মতো নির্দিষ্ট কোনো গন্ধ শনাক্ত করবে।
পরে সেই তথ্য পেয়ে সংকেত পৌঁছে যায় অন্য প্রান্তে থাকা পরা যায় এমন ছোট এক ডিভাইসে, যা হুবহু একই গন্ধের অণু বাতাসে ছড়িয়ে দেয়। পৃথিবীর যে কোনো দূরত্বেই এই তথ্য পাঠানো সম্ভব।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ।
এ গবেষণার প্রধান লেখক ও ‘ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি’র ‘মেটেরিয়ালস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং’য়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী চুনইউ ইয়ান বলেছেন, “সহজ কথায়, এটা এক স্থানের গন্ধ শনাক্ত করার পর তা অন্য স্থানে হুবহু তৈরি করার সংযোগ ঘটাতে পারে।
“আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল এতদিন ধরে ডিজিটালি শেয়ার করা ছবি ও শব্দের সংকেতের সঙ্গে গন্ধ যোগ করা, যাতে বিভিন্ন অভিজ্ঞতাকে আরও আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত করে তোলা যায়।”
‘ডিজিটাল সেন্ট টেকনোলজি’র নতুন সংস্করণটিকে গবেষকরা নাম দিয়েছেন ‘সেন্ট্রোনিক’।
ইয়ান বলেছেন, “সেন্ট্রোনিককে অনন্য করে তুলেছে এর দূরবর্তী স্থানে গন্ধ পাঠানোর উদ্দেশ্যে গন্ধ শনাক্তকরণ ও তৈরির প্রক্রিয়াকে একসঙ্গে নিয়ে আসার বিষয়টি। আমাদের জানামতে, দূরবর্তী গন্ধ শেয়ারের মতো কমপ্যাক্ট প্ল্যাটফর্মে এটাই প্রথম গবেষণা।”
গবেষকরা যে ‘ই-নোজ’ ডিভাইসটি তৈরি করেছেন তাতে গ্যাস সেন্সরের একটি বিশেষ অ্যারে ব্যবহৃত হয়েছে, যা বিভিন্ন গন্ধের পেছনে থাকা রাসায়নিক উপাদান শনাক্ত করতে পারে।
এরপর একটি ‘মেশিন লার্নিং মডেল’ ই-নোজকে শেখানো নির্দিষ্ট গন্ধগুলো চিনতে সাহায্য করে, যেমন বিয়ার, কেক, কফি, কমলা ও রেড ওয়াইন।
প্রযুক্তিটিতে এক অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গন্ধের তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয় রিসিভার প্রান্তে থাকা সেন্ট জেনারেটরে, যা সুবাস তৈরি করে। এতে ইন্টারনেটের মাধ্যমে আসল গন্ধের অণু স্থানান্তরিত হয় না, কেবল সুবাস তৈরির তথ্য পাঠায় ডিভাইসটি।
ই-নোজ ডিভাইসটির ব্যাস প্রায় ৬ ইঞ্চি ও এটা সহজে বহনযোগ্য। অন্যদিকে, গবেষকরা রিসিভারের জন্য রিস্টব্যান্ড, নেকলেস ও হ্যান্ডহেল্ড ডিজাইনসহ ঘ্রাণ উৎসারক বা সেন্ট জেনারেটরের বেশ কয়েকটি ধরন তৈরি করেছেন।
‘দৈনন্দিন পরিচিত গন্ধ’
আপাতত ‘ই-নোজ’ কেবল উল্লিখিত পাঁচটি গন্ধই শনাক্ত করবে।
গবেষণার প্রধান গবেষক ইয়ান বলেছেন, “আমরা এই পাঁচটি গন্ধ বেছে নিয়েছি, কারণ এগুলো দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত গন্ধ ও এদের ঘ্রাণওয়ালা বৈশিষ্ট্য আলাদা, যা ব্যবস্থাটির কার্যকারিতা প্রমাণের জন্য বেশ উপযোগী। আমরা এখনও এই তালিকা বড় করিনি।
“তাত্ত্বিকভাবে সুবাসের বড় সংগ্রহশালা তৈরি করা সম্ভব হলেও, অসীমসংখ্যক গন্ধ তৈরি করা আমাদের বর্তমান সক্ষমতার বাইরে। কোনো গন্ধ শনাক্ত ও তা নির্ভুলভাবে পুনরায় তৈরি করা দুটি সম্পূর্ণ আলাদা চ্যালেঞ্জ।
“এর জন্য অনেক উন্নয়নের প্রয়োজন। তবে দৈনন্দিন জীবনের উপযোগী বিভিন্ন গন্ধের কার্যকর পরিসর তৈরি করাই এখন আমাদের বাস্তবসম্মত লক্ষ্য।”
তবে রিসিভার ডিভাইসটি সেন্ট্রোনিকের শনাক্ত করা সব গন্ধ তৈরি করতে পারবে না।
ইয়ান বলেছেন, “অতিরিক্ত কোনো গন্ধ যোগ করতে হলে আমাদের ইলেকট্রনিক নোজকে তা শনাক্ত করার প্রশিক্ষণ দিতে হবে ও গন্ধ তৈরির যন্ত্রে সেই অনুসারে সুবাসিত তরল সরবরাহ করতে হবে।”
তবে এই প্রযুক্তির বিভিন্ন সম্ভাব্য ব্যবহার খতিয়ে দেখছেন গবেষকরা।
ইয়ান বলেছেন, “কেউ দূরদূরান্তে থাকা পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে নিজের খাবারের সুবাস শেয়ার করতে পারবেন। অন্যান্য সম্ভাব্য ব্যবহারের মধ্যে রয়েছে ভার্চুয়াল ও অগমেন্টেড রিয়ালিটির অভিজ্ঞতাকে বাস্তবসম্মত করা ও অনলাইন কেনাকাটায় দূর থেকেই নির্দিষ্ট কোনো পণ্যের গন্ধ নেওয়ার সুযোগ তৈরি।”
‘গবেষণাগারের প্রোটোটাইপ’
ইয়ান বলেছেন, এ গবেষণা পরিচালনা ও ডিভাইস তৈরির কাজে কোনো বাণিজ্যিক কোম্পানির অংশগ্রহণ ছিল না।
“বর্তমানে এটা গবেষণাগারের একটি প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক মডেল মাত্র। এটাকে বাণিজ্যিক রূপ দিতে হলে বাস্তবের জটিল পরিস্থিতিতে, যেখানে একাধিক গন্ধ একসঙ্গে মিশে থাকে সেখানে সঠিক গন্ধ শনাক্তকরণের সক্ষমতা বাড়াতে এবং আরও বড় ও বৈচিত্র্যময় ডেটাসেটের প্রয়োজন হবে।
“এ ছাড়া সেন্ট জেনারেটরটিকে আকারে ছোট ও ব্যবহারবান্ধব রেখে আরও বেশি গন্ধের সুবিধা দিতে এর নকশায় উন্নয়ন প্রয়োজন।
“পাশাপাশি গন্ধের সঠিকতা রক্ষা, রিফিল করার ব্যবস্থা, স্থায়িত্ব, উৎপাদন খরচ ও বারবার এই সুবাসিত বাষ্প বা অণুর সংস্পর্শে আসার নিরাপত্তাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
বিভিন্ন স্মার্টফোন দিন দিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে। ভবিষ্যতে কি স্মার্টফোনেও এমন প্রযুক্তি যোগ হতে পারে, যাতে ‘ওহাইও স্টেট ফুটবল’ ম্যাচের আগের কোনো পার্টি থেকে বন্ধুকে কল দিয়ে ভিডিও ও অডিওর পাশাপাশি গ্রিল করা হট ডগের সুবাসও পাঠানো যাবে?
এমন প্রশ্নে ইয়ান বলেছেন, “তাত্ত্বিকভাবে একটি স্মার্টফোন সেন্ট জেনারেটিং কোনো এক্সেসরিজ বা যন্ত্রাংশের সঙ্গে যোগ হতে পারে। তবে ফোনের ভেতরেই সব প্রযুক্তি সমন্বয় করা বেশ কঠিন, কারণ সেন্ট রিজার্ভার, ইলেকট্রনিক্স ও অটোমাইজারগুলো বাড়তি জায়গা নেয় ও ওজন বাড়ায়।
“এগুলোকে ক্ষুদ্রাকৃতির করা ও সহজে রিফিলের ব্যবস্থা রাখা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে। ফুটবল ম্যাচের পার্টির উদাহরণটি দিয়ে ধারণাটি দারুণভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।
“ভবিষ্যতের কোনো ব্যবস্থা হয়ত ভিডিও ও অডিওর সঙ্গে মানানসই সুবাস পাঠাতে সক্ষম হবে, যদি তা নির্দিষ্ট গন্ধ শনাক্ত করতে পারে ও রিসিভারের কাছে উপযোগী তরল সুবাস থাকে।
