মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, অনিয়মিত জীবনযাপন, কিছু ওষুধ, শারীরিক অসুস্থতা এবং পরিবেশগত নানা কারণে অনিদ্রা বা ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। স্বাস্থ্য বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘হেলথলাইন’-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনের রুটিন ও ঘুমানোর অভ্যাসে কিছু ছোট পরিবর্তন আনলে ঘুমের মান উন্নত হতে পারে। তবে সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অনিদ্রার সাধারণ কারণসমূহ
স্ট্রেস ও দুশ্চিন্তা: কাজ, সম্পর্ক, আর্থিক অবস্থা বা স্বাস্থ্য নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ সহজে ঘুমাতে না দেওয়ার প্রধান কারণগুলোর একটি।
বাজে ঘুমের অভ্যাস: অনিয়মিত সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং বিছানায় যাওয়ার আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করা ঘুমকে ব্যাহত করে। বিশেষ করে দিনের শেষভাগে ক্যাফেইন, নিকোটিন বা অ্যালকোহল গ্রহণ করলে ঘুমাতে আরও বেশি সমস্যা হয়।
ওষুধ ও শারীরিক অসুস্থতা: কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ (যেমন—অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, উদ্দীপক বা সর্দি-কাশির ডিকনজেস্ট্যান্ট) ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। এ ছাড়া ক্রনিক ব্যথা, অ্যাজমা, এসিড রিফ্লাক্স এবং স্লিপ আপনিয়ার মতো স্বাস্থ্যগত সমস্যাও এর জন্য দায়ী। পাশাপাশি দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতার মতো মানসিক অবস্থাও অনিদ্রার সঙ্গে জড়িত।
পরিবেশগত কারণ: ঘরের অতিরিক্ত গোলমাল, আলো এবং অস্বস্তিকর তাপমাত্রা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
ঘুম ভালো করার সহজ উপায়
শ্বাসের ব্যায়াম: মনের মধ্যে অতিরিক্ত বা বারবার ঘুরে বেড়ানো চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর মন দেওয়া যেতে পারে। যেমন—মনে মনে ৫ পর্যন্ত গুনে ধীরে ধীরে দম নেওয়া এবং একইভাবে ৫ পর্যন্ত গুনে দম ছাড়া। এভাবে কয়েক মিনিট একটানা করতে পারেন।
যোগনিদ্রা: এটি আরেকটি দারুণ রিলাক্সেশন বা শিথিলকরণ পদ্ধতি। সাধারণত শুয়ে থেকে মৌখিক নির্দেশনার মাধ্যমে শরীর, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং অন্যান্য অনুভূতির ওপর মনোযোগ দিয়ে এটি অনুশীলন করা হয়।
সাদা বা ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড: বাইরে থেকে আসা বিরক্তিকর আওয়াজ বা কোলাহল নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হলে সাউন্ড মেশিন বা রিলাক্সেশন অ্যাপ ব্যবহার করে ঘরের ভেতর একটি স্থির ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড তৈরি করা যেতে পারে।
ঘুমের ওপর নীল আলোর প্রভাব
দৃশ্যমান আলোর বর্ণালীতে নীল আলোর শক্তির মাত্রা সবচেয়ে বেশি। এটি মানবদেহের জৈবিক ঘড়ি এবং মেলাটোনিন হরমোনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে ভূমিকা রাখে, যা সরাসরি ঘুমের সঙ্গে জড়িত। তাই ঘুমানোর আগে উত্তেজনাপূর্ণ কার্যক্রম এবং ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ব্যবহার সীমিত করা একটি প্রশান্তিদায়ক ঘুমের রুটিন তৈরি করতে সাহায্য করে।
২০২১ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বিছানায় শুয়ে বই পড়েন, তাদের ঘুমের মান যারা পড়েন না তাদের চেয়ে ভালো হয়।
ভেষজ চা ও স্লিপ এইড বা ঘুমের ওষুধ
ভেষজ চা: ঘুমানোর আগে ক্যামোমিল বা ল্যাভেন্ডার চা পান করলে শরীর ও মন শিথিল হতে সাহায্য করে।
মেলাটোনিন: এটি শরীর দ্বারা প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত একটি হরমোন, যা ঘুম-জাগরণের চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।
ওভার-দ্য-কাউন্টার ওষুধ: বাজারের সাধারণ ঘুমের ওষুধগুলোতে সাধারণত ডাইফেনহাইড্রামিন বা ডোক্সিলামিনের মতো অ্যান্টিহিস্টামিন থাকে। তবে এই ধরনের ওষুধ সেবনের আগে, বিশেষ করে অন্য কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে বা নিয়মিত কোনো ওষুধ খেলে অবশ্যই চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রা বলতে সাধারণত সপ্তাহে অন্তত তিন দিন এবং টানা তিন মাসের বেশি সময় ধরে ঘুমাতে সমস্যা হওয়াকে বোঝায়। দীর্ঘমেয়াদী অনিদ্রার কারণে হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের মতো বিভিন্ন গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।
একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এমন অন্তর্নিহিত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে সাহায্য করতে পারেন যা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে (যেমন—অতিরিক্ত সক্রিয় মূত্রথলি, যার কারণে রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়)।
কারণ অনুযায়ী চিকিৎসকের কাছে এর সমাধান হিসেবে কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি ফর ইনসোমনিয়া (CBT-I), ওষুধ বা অন্যান্য পদ্ধতি ব্যবহার করা হতে পারে।
ঘুমের রুটিন বজায় রাখা, ঘুমানোর আগে ক্যাফেইন ও উত্তেজনাকর কাজ পরিহার করা, শ্বাসের ব্যায়াম করা এবং শোবার ঘরটি শান্ত ও আরামদায়ক রাখা ঘুম ভালো হতে সাহায্য করতে পারে। তবে ঘুমের সমস্যা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা অবহেলা করবেন না; কারণ এটি গভীরে লুকিয়ে থাকা অন্য কোনো বড় শারীরিক সমস্যার লক্ষণও হতে পারে।
সূত্র: সামা টিভি