বাউলসম্রাট ফকির লালন শাহের ১৩৬তম প্রয়াণ দিবস আজ ১৭ অক্টোবর। ১৮৯০ সালের এই দিনে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মরমি সাধক লালন শাহ। গান ও দর্শনের মধ্য দিয়ে তিনি দিয়ে গেছেন জাতপাত, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও বিভেদ ভুলে মানুষকে ভালোবাসার চিরন্তন বার্তা।
লালনের সাধনার মূল কেন্দ্র ছিল মানুষ। ধর্ম, বর্ণ ও সামাজিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি মানুষের মর্যাদাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর গান শুধু সুরের মূর্ছনায় শ্রোতাকে মুগ্ধ করে না, বরং আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান, দেহতত্ত্ব, মানবপ্রেম ও সমাজের নানা অসংগতির বিরুদ্ধে প্রশ্নও তুলে ধরে।
‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে’ গানের এই পঙ্ক্তির মধ্য দিয়ে জাতপরিচয়ের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন তিনি। মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিকারী আচার ও সংস্কারের বিপরীতে লালন তুলে ধরেছেন সহজ মানবিকতার দর্শন। তাঁর ভাবনায়, মানুষকে জানার মধ্য দিয়েই নিজেকে চেনার পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
লালনের গানে জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বের পাশাপাশি রয়েছে সময়কে অর্থবহ করে তোলার আহ্বান। ‘এমন মানব জনম আর কি হবে/ মন যা কর ত্বরায় কর এই ভবে’ এই বাণীতে তিনি তুলে ধরেছেন মানবজীবনের মূল্য ও সাধনার গুরুত্ব। সহজ ভাষা ও পরিচিত উপমায় গভীর জীবনজিজ্ঞাসা প্রকাশ করাই তাঁর গানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ি লালনের সাধনা ও স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁর প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে এই আখড়াবাড়ি সাধু, শিষ্য ও অনুরাগীদের স্মরণ ও সাধনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। লালনগান এবং তত্ত্বালোচনার মধ্য দিয়ে তাঁরা ধারণ করেন সাঁইজির জীবনদর্শন।
লালনের গান ও চিন্তা বাংলা সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব রেখেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বহু কবি, সাহিত্যিক ও গবেষক তাঁর গানের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিল্পী ও সাধকদের কণ্ঠে বেঁচে আছে তাঁর মানবপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িকতার বাণী।
প্রয়াণের ১৩৬ বছর পরও লালনের দর্শন সমান প্রাসঙ্গিক। সংঘাত, অসহিষ্ণুতা ও বিভেদের এই সময়ে তাঁর গান মানুষকে আত্মজিজ্ঞাসায় উদ্বুদ্ধ করে এবং অন্যের পরিচয়ের আগে তার মানবিক সত্তাকে গুরুত্ব দিতে শেখায়। মানুষকে ভালোবাসার সেই চিরন্তন দর্শনেই আজ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে বাউলসম্রাট ফকির লালন শাহকে।
