জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে থাকা অগভীর পানির প্রায় সমস্ত প্রবাল প্রাচীর ২০৭৫ সালের মধ্যে ধসে পড়ার বা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) প্রবাল প্রাচীরের ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন)।
বিশ্বের ১২৭টি ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় প্রবাল প্রাচীর ব্যবস্থার ওপর পরিচালিত প্রথম পদ্ধতিগত সমীক্ষায় আইইউসিএন জানিয়েছে, এর ৯৬ শতাংশ প্রবাল প্রাচীরই মারাত্মক বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে, যা তাদের ঝুঁকির সর্বোচ্চ বিভাগ।
অগভীর পানির প্রবাল প্রাচীরগুলো মূলত ৪০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত পাওয়া যায়। বর্ণিল এই বাস্তুতন্ত্রগুলো জীববৈচিত্র্যে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোরাল ট্রায়াঙ্গেল, মেসোআমেরিকান রিফ সিস্টেম এবং লোহিত সাগরের প্রবাল প্রাচীরগুলো।
আর্মেনিয়ার ইয়েরেভানে আয়োজিত জাতিসংঘের কপ-১৭ জীববৈচিত্র্য সম্মেলনে এই গবেষণা উপস্থাপন করে আইইউসিএন জানায়, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট তাপীয় চাপ বা উত্তাপই বিশ্বব্যাপী প্রবাল প্রাচীর ধ্বংসের প্রধান ও সবচেয়ে ধারাবাহিক হুমকি।
প্রবালগুলো তাপমাত্রার পরিবর্তনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এর অর্থ হলো, পানি যখন অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়, তখন প্রবালগুলো তাদের টিস্যুতে বাস করা ক্ষুদ্র শৈবালগুলোকে বের করে দেয়, যা তাদের পুষ্টির প্রধান উৎস। এর ফলে প্রবালগুলো সাদা হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তাদের মৃত্যু হতে পারে।
অতিরিক্ত মাছ ধরাও এর আরেকটি বড় হুমকি। বিশেষ করে প্যারোটফিশ এবং গ্রুপার জাতীয় মাছ অতিরিক্ত শিকার করার ফলে প্রবাল বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কারণ এই মাছগুলো পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে। এছাড়া উপকূলীয় উন্নয়ন, দূষণ, পর্যটন এবং দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়া তীব্র ঝড়ও প্রবাল প্রাচীর ধ্বংসের জন্য দায়ী।
শক্ত প্রবালগুলো অদৃশ্য হয়ে গেলে সেই স্থানগুলো শৈবাল, পাথর ও স্পঞ্জ দিয়ে পূর্ণ হয়ে যায়। ফলে সেখানে প্রজাতি বৈচিত্র্য কমে যায় এবং আগের মতো অনেক প্রাণী বাঁচতে পারে না। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে রিফ ফিশ, ঝিনুক, সামুদ্রিক কচ্ছপ এবং হাঙর।
প্রবালপ্রাচীরগুলোকে কি এখনো বাঁচানো সম্ভব
আইইউসিএন রেড লিস্ট অব কোরাল রিফ ইকোসিস্টেমের বৈজ্ঞানিক প্রধান মিশাল গুডকা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যতের হুমকি অত্যন্ত ভয়াবহ এবং স্পষ্ট, যা এই বাস্তুতন্ত্রের টিকে থাকার ওপর অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই গবেষণায় জাতিসংঘের ইন্টারগভর্মেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ- এর একটি জলবায়ু পরিস্থিতি ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে ২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে প্রায় ২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে এই হতাশাজনক পূর্বাভাসের মধ্যেও আইইউসিএন জানিয়েছে যে, বেশিরভাগ প্রবাল প্রাচীর এখনো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়নি। ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস বাদ দিয়ে কেবল গত ৫০ বছরের পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে হিসাব করলে দেখা যায়, বর্তমানে মাত্র ২৪ শতাংশ প্রবাল প্রাচীর মারাত্মক বিপন্ন শ্রেণীতে পড়বে।
গুডকা ব্যাখ্যা করে বলেন, সর্বোত্তম ফলাফল নিশ্চিত করতে এবং সবচেয়ে খারাপ পরিণতি রোধ করার জন্য এটি আমাদের পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পদক্ষেপ জোরদার করার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
তিনি আরও বলেন, আগামী কয়েক বছরে আমরা কী পদক্ষেপ নেব তা-ই নির্ধারণ করবে চলতি শতাব্দীর শেষে এই বাস্তুতন্ত্রগুলো কেমন থাকবে এগুলো কি আমরা যেভাবে চিনে এসেছি সেভাবেই টিকে থাকবে, নাকি অন্য কোনো বাস্তুতন্ত্রে রূপান্তরিত হবে যা প্রকৃতি ও মানুষ উভয়ের জন্যই কম মূল্যবান।
আইইউসিএন-এর মহাপরিচালক গ্রেথেল অ্যাগুইলার বলেন, প্রবাল প্রাচীরগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়ার জন্য এখনো খুব বেশি দেরি হয়ে যায়নি।
তিনি যোগ করেন, আমাদের কী করতে হবে তা আমরা জানি: উচ্চাভিলাষী কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করা, আরও শক্তিশালী সুরক্ষা ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালানো এবং স্থিতিস্থাপক উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র ও তার ওপর নির্ভরশীল সম্প্রদায়গুলোর পেছনে টেকসই বিনিয়োগ করা।
তামান্না রুপা/
