মুক্তধারা
উৎসব ১৪৩৩
প্রবন্ধ
সমস্যাদীর্ণ কুমোরটুলির মৃৎশিল্প
পল্লব মুখোপাধ্যায়
২০ অক্টোবর ২০২৬
৪র্থ বর্ষ
মহালয়ার সকালে কুমোরটুলিতে প্রতিমার চক্ষুদানের মাধ্যমেই ঘটে দেবীপক্ষের সূচনা। বহু বছরের ইতিহাসের সাক্ষী এই কুমোরটুলি। পাশাপাশি এটি পশ্চিমবঙ্গের একটি বিখ্যাত হস্তশিল্প কেন্দ্রও বটে | দশকের পর দশক কুমোরটুলি হয়ে উঠেছে শারদোৎসবের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ |
কলকাতা শহরের উত্তরে শোভাবাজার সুতানুটিতে অবস্থিত এই কুমোরটুলি। পলাশির যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ইংরেজরা বিভিন্ন পেশার মানুষের কাজকর্মের জন্য বিভিন্ন জায়গা নির্ধারণ করেন। যেমন, সুরা বিক্রেতাদের জন্য শুঁড়িপাড়া, কাঠের মিস্ত্রিদের জন্য ছুতোরপাড়া, কুমোরদের জন্য কুমোরটুলি ইত্যাদি। এই সময়ই নবদ্বীপ, শান্তিপুর, কৃষ্ণনগর ইত্যাদি অঞ্চল থেকে থেকে কুমোররা ভালো আয়ের আশায় কলকাতা শহরে এসে বসবাস করতে শুরু করেন।
কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীদের দক্ষতার কথা আজ সর্বজনবিদিত। প্রথমে কাঠ দিয়ে মূল কাঠামোটি তৈরি করা হয়। তার ওপর বাঁশের ফ্রেম, খড় ও সুতলি দিয়ে প্রতিমার আকার দেওয়া হয়। প্রতিমা বানাতে প্রধানত দু’রকম মাটি ব্যবহার করা হয় – এঁটেল মাটি ও বেলে মাটি। এঁটেল মাটি দিয়ে প্রথমে মূর্তি গড়া হয় এবং পরে বেলে মাটি দিয়ে সেই মূর্তিগুলিকে পালিশ করা হয়। গঙ্গা থেকেই প্রধানত মাটি আনা হয়, যদিও উলুবেড়িয়া থেকে আনা মাটিই বেশি পছন্দ করেন শিল্পীরা। আগে প্রতিমা একচালা ডিজাইনেই তৈরি করা হত। পরে কুমোরটুলিতে দোচালা ডিজাইনের প্রতিমার প্রচলন ঘটে |
প্রথমে কেবল পুরুষরাই প্রতিমা তৈরি করতেন কুমোরটুলিতে। কিন্তু ১৯৯০ থেকে মহিলা মৃৎশিল্পীরাও শুরু করেন প্রতিমা গড়া। পরবর্তীকালে তাঁদের মধ্যে কোনও কোনও শিল্পী নয়া দিল্লির ন্যাশনাল হ্যান্ডিক্রাফ্টস অ্যান্ড হ্যান্ডলুম মিউজিয়াম থেকে প্রদর্শনীর জন্য ডাক পান। তাঁদের গড়া প্রতিমা রপ্তানি হয় সুদূর জার্মানি, ফ্রান্স, কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সর্বত্রই। প্রায় ১২০০০ প্রতিমা প্রতিবছর তৈরি হয় এখানে। কমপক্ষে ৯০টি দেশ থেকে এখানে প্রতিমার বায়না আসে। এমনকি ২০০৪ সাল থেকে শুরু হয়েছে অনলাইনে প্রতিমা বিক্রয়ও|
কিন্তু সেই উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী পটুয়াপাড়া কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীদের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত সংগ্রামপূর্ণ ও সমস্যাদীর্ণ । একদিকে তাঁদের হাতের জাদু ইউনেস্কোর হেরিটেজ স্বীকৃতি এনে দিয়েছে, অন্যদিকে বিশ্বায়নের যুগে বেশ কিছু কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে এই মাটির জাদুকরদের।
বর্তমানে কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা মাটি এবং বাঁশের অভাব। ডায়মন্ড হারবার বা উলুবেড়িয়া থেকে প্রতিমা তৈরির গঙ্গামাটি আসতে দেরি হওয়ায় এবং জোগান কমে যাওয়ায় শিল্পীদের চড়া দামে কাঁচামাল কিনতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি দড়ি, পেরেক, খড় ও রঙের দামও প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
গত কয়েক বছরে বড় বারোয়ারি উৎসবে 'থিম'-এর প্রতি ঝোঁক বাড়ায় অনেক ক্ষেত্রে মণ্ডপ শিল্পীরাই প্রতিমা তৈরির দায়িত্ব পেয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে কুমোরটুলির সাবেকি প্রতিমা শিল্পীদের বায়না ও লাভ অনেকটাই কমে এসেছে। তবে অতি সম্প্রতি থিম মূর্তির চাহিদা কিছুটা কমে আবার সাবেকি মূর্তির দিকে ফেরার একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
কুমোরটুলির প্রতিমা দেশ ছাড়িয়ে আমেরিকা, ব্রিটেন বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি দেয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচা মাটির মূর্তির চেয়ে ফাইবার গ্লাসের মূর্তির চাহিদা বাড়ছে, কারণ এটি সহজে ভেঙে যায় না। ফলে ঐতিহ্যবাহী মাটির কাজ জানা অনেক শিল্পী এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন এবং দালালদের কারণে তাঁদের লভ্যাংশ কমে যাচ্ছে।
কুমোরটুলির গলিগুলি অত্যন্ত সংকীর্ণ। সামান্য একচিলতে ঘরে আলো-আঁধারির মধ্যে বসে শিল্পীদের কাজ করতে হয়। বর্ষাকালে বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে মূর্তি শুকনো এবং সেগুলি সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিনের দাবি সত্ত্বেও স্থায়ী পুনর্বাসন বা আধুনিক পরিকাঠামোর অভাব এখনও রয়ে গেছে।
কঠোর পরিশ্রম এবং বিপুল পুঁজি বিনিয়োগের তুলনায় প্রতিমার সঠিক মূল্য না মেলায়, বর্তমান মৃৎশিল্পীদের নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আর আসতে চাইছে না। ফলে বংশানুক্রমিক এই শিল্প টিকিয়ে রাখা বর্তমান কারিগরদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
ইদানীংকালে পুজোর আগে কুমোরটুলির স্টুডিওগুলিতে ছবি ও ভিডিও করার জন্য ইউটিউবার এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ভিড় উপচে পড়ছে | কারিগরদের অভিযোগ, এই অতিরিক্ত প্রচার এবং অনুমতিহীন ছবি তোলার হিড়িক তাঁদের কাজে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায়।
তবু শত প্রতিকূলতার মধ্যেও কুমোরটুলির শিল্পীরা হার মানেননি। পুরুষদের পাশাপাশি এখন বহু মহিলা মৃৎশিল্পীরাও এই পেশায় সাফল্যের সাথে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং লিঙ্গবৈষম্য ভেঙে মাটির কাজে নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিচ্ছেন। বাংলার এই অনন্য শিল্প সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি অনুদান এবং প্রতিমার ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলের এগিয়ে এসে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণও আশু প্রয়োজন |
