Published on
:
3 min read
ক্রিস্তিয়ানো রোনাল্দোর (Cristiano Ronaldo) সঙ্গে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে (Manchester United) সম্পর্কের তিক্ততা নিয়ে প্রায় চার বছর পর মুখ খুললেন এরিক টেন হ্যাগ (Erik ten Hag)। ২০২২ সালে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে রোনাল্দোর দ্বিতীয় ইনিংস শেষ হয়েছিল তীব্র বিতর্ক, বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার এবং ক্লাব ছাড়ার মধ্যে দিয়ে। এ বার সেই বিচ্ছেদের নেপথ্যের কারণ জানালেন তৎকালীন কোচ টেন হ্যাগ। তাঁর দাবি, অনুশীলনে অনীহা, ফিটনেসের অভাব এবং দলের জন্য নিজের দায়িত্ব পালন করতে না পারার কারণেই রোনাল্দোর সঙ্গে সংঘাত তৈরি হয়েছিল। ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকার প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেও দলের স্বার্থে তাঁকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ডাচ কোচ।
অনুশীলন ও ফিটনেস নিয়ে রোনাল্দোর বিরুদ্ধে অভিযোগ টেন হ্যাগের
২০২২ সালের এপ্রিল মাসে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোচের দায়িত্ব নেন টেন হ্যাগ। তার আগে ২০২১ সালের অগস্টে রিয়াল মাদ্রিদ ও জুভেন্তাসের হয়ে খেলার পর ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ফিরেছিলেন রোনাল্দো। দায়িত্ব নেওয়ার আগে পর্তুগালে গিয়ে রোনাল্দোর সঙ্গে নিজের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনাও করেছিলেন টেন হ্যাগ। ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল বলেও জানিয়েছেন তিনি।
টেন হ্যাগ বলেন, ‘ইউনাইটেডের দায়িত্ব নেওয়ার আগে আমি পর্তুগালে গিয়ে রোনাল্দোর সঙ্গে কথা বলেছিলাম। ওকে নিয়ে আমার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলাম। ও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। ওকে আমি যথেষ্ট সম্মান করতাম। কিন্তু তখন কোচ হিসেবে আমাকে বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। যে খেলোয়াড়কে আমি এত শ্রদ্ধা করি, তাকেও দলের নিয়মের মধ্যে রাখতে হতো।’
টেন হ্যাগের অভিযোগ, প্রত্যাশিত শারীরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিলেন রোনাল্দো। তাঁর দাবি, একাধিক বার অনুশীলন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন পর্তুগিজ তারকা। অনুশীলনে যোগ দিলেও তাঁর হৃদস্পন্দনের গতি যথেষ্ট বাড়ত না বলেও অভিযোগ করেছেন প্রাক্তন কোচ। ২০২২ সালের অগস্টে ব্রেন্টফোর্ডের কাছে ০-৪ গোলে হারের পর দলের ফুটবলারদের তিন বার মাঠ প্রদক্ষিণ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন টেন হ্যাগ। তাঁর দাবি, রোনাল্দো সেই তিন বারের মধ্যে মাত্র দু’বার মাঠ প্রদক্ষিণ করেছিলেন। টেন হ্যাগের কথায়, ‘ও দলকে হতাশ করেছিল, আমাকেও হতাশ করেছিল। কারণ, ওকে নিয়েই আমরা পরিকল্পনা করেছিলাম।’
রোনাল্দোকে নিয়ে তাঁর প্রত্যাশা শুধু প্রতিপক্ষকে দৌড়ে চাপে ফেলা ছিল না বলেও জানিয়েছেন টেন হ্যাগ। তাঁর বক্তব্য, গোল করার মতো জায়গায় পৌঁছনোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এবং শারীরিক সক্ষমতা দেখাতে পারেননি রোনাল্দো। প্রাক্তন কোচ বলেন, ‘আমি ওকে বার বার বলতাম, রনি, তোমাকে সঠিক জায়গায় বল পৌঁছে দিতে সবাই পরিশ্রম করছে। কিন্তু তুমি যদি গোল করার জায়গায় পৌঁছতেই না পারো, তা হলে গোল করবে কী করে? ও সেটা করতে পারছিল না। আমি ওকে এমন দৌড় করাতে চাইছিলাম না, যাতে ও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আসল সমস্যা ছিল, বল পায়ে থাকুক বা না থাকুক, ও দৌড়চ্ছিল না। কারণ, ও নিজেকে ঠিক ভাবে প্রস্তুত করছিল না।’
শুধু রোনাল্দোর ফিটনেস নিয়েই নয়, অনুশীলনের ধরন নিয়েও আপত্তি ছিল টেন হ্যাগের। তাঁর দাবি, সতীর্থদের অনুশীলনে বেশি শক্তি খরচ না করার পরামর্শ দিতেন রোনাল্দো। টেন হ্যাগ বলেন, ‘ও সতীর্থদের বলত, অনুশীলনে বেশি দৌড়ে পা ক্লান্ত কোরো না। একজন ফুটবলার পুরোপুরি ফিট থাকলে অনুশীলনে কিছুটা শক্তি বাঁচিয়ে রাখার কথা ভাবতে পারে। কিন্তু তার আগে তো নিজের ফিটনেস ঠিক জায়গায় নিয়ে যেতে হবে।’
তাঁর মতে, দলের সেরা ফুটবলারকে ঘিরে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। তবে তার মানে এই নয় যে, সেই ফুটবলার দলের জন্য নিজের দায়িত্ব পালন করবেন না। টেন হ্যাগের দাবি, ‘প্রতিটি বড় দলকেই তার সেরা খেলোয়াড়কে গুরুত্ব দিতে হয়। কিন্তু সেই খেলোয়াড়কেও দলের জন্য কাজ করতে হবে।’
টটেনহ্যামের বিরুদ্ধে পরিবর্ত হিসেবে নামতে না চাওয়াতেই প্রকাশ্যে সংঘাত
২০২২ সালের অক্টোবর মাসে টেন হ্যাগ ও রোনাল্দোর সম্পর্কের অবনতির বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসে। টটেনহ্যামের বিরুদ্ধে ২-০ গোলে জেতা ম্যাচে পরিবর্ত হিসেবে মাঠে নামতে চাননি রোনাল্দো। এর পর চেলসির বিরুদ্ধে ম্যাচের দল থেকে তাঁকে বাদ দেন টেন হ্যাগ। প্রথম দলের ফুটবলারদের সঙ্গে অনুশীলনও করতে দেওয়া হয়নি তাঁকে। এর পর পিয়ার্স মর্গ্যানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন রোনাল্দো। তাঁর দাবি ছিল, ক্লাব তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং টেন হ্যাগের প্রতি তাঁর আর কোনও সম্মান নেই।
রোনাল্দো বলেছিলেন, ‘ও আমাকে সম্মান করে না, তাই আমিও ওকে সম্মান করি না। শুধু কোচ নয়, ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত আরও দু’-তিন জনের প্রতিও আমার একই মনোভাব।’ সেই সাক্ষাৎকারে আরও বিস্ফোরক অভিযোগ করেছিলেন পর্তুগিজ তারকা। তাঁর দাবি ছিল, ‘আমার মনে হয়েছিল, আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। এটা নিয়ে আমার কোনও পরোয়া নেই। মানুষের সত্যিটা শোনা উচিত। হ্যাঁ, আমার মনে হয়েছিল, আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। আমার মনে হয়, ক্লাবের কিছু লোক আমাকে এখানে চাইছিল না। শুধু এ বার নয়, গত মরশুমেও।’
তবে ক্লাবের প্রতি টান যে তখনও রয়ে গিয়েছিল, সেটাও স্পষ্ট করেছিলেন রোনাল্দো। তিনি বলেছিলেন, ‘এখানে থাকতে পেরে আমি আগে খুশি ছিলাম, এখনও খুশি। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ম্যাচ জেতা, কোনও ট্রফি বা প্রতিযোগিতার শিরোপা জেতা। আমি বিশ্বাস করি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড আবার নিজেদের প্রাপ্য জায়গায় ফিরবে। সময় লাগতে পারে, কিন্তু আমার বিশ্বাস রয়েছে।’ ২০২২ সালের শেষ দিকে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড ছেড়ে সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসরে যোগ দেন রোনাল্দো। তাঁর দ্বিতীয় দফার ইউনাইটেড-যাত্রার ইতি ঘটে এ ভাবেই।