ঠাকুর দেখতে যাব, কিন্তু ভিড় হলে যদি আবার এমন হয়! শরীরে একাধিক ক্ষতের যন্ত্রণা নিয়েই বলছিল ছোট্ট মেয়েটি। এবারের জন্মদিন যেন দক্ষিণ কলকাতার জোকার বাসিন্দার কাছে পুনর্জন্ম! চোরবাগানে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে তার মা অনন্যা দাস, এবং সে নিজেও। বেশ কয়েকদিন ইএম বাইপাসের ধারের এক বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার পর হুগলির কোন্নগরে বাবার বাড়িতে ফিরেছেন ওঁরা। চোখে মুখে এখনও আতঙ্ক! এত মানুষের মৃত্যুর কঠিন সত্যি যাপন ওঁদের কাছে বিভীষিকার মতো।
পুজো দেখার দুর্বিষহ স্মৃতি নিয়েই খুদে বলছে, “সেদিন ভীষণ ভিড় ছিল। আমরা পড়ে গিয়েছিলাম। আমাকে একটা পুলিশ কাকু কোলে তুলে নেয়। সবাই খুব চিৎকার করছিল!” তারপর কী হয়েছে আর মনে নেই ছোট্ট মেয়েটির। তার শুধু মনে পড়ছে, ভয়ংকর সেই চিৎকার। বাঁচাও বাঁচাও আর্তনাদ। পরিবারের সঙ্গে জন্মদিন পালনেও তাড়া করছে সেদিনের স্মৃতি। ১৭ অক্টোবর কলকাতার চোরবাগানে বিপর্যয়ের সাক্ষী ছিল দাস পরিবার। অনন্যার বাবা অনিন্দ্য দাস, দুই মেয়ে, জামাই, নাতনিকে নিয়ে গিয়েছিলেন ঠাকুর দেখতে। কলকাতায় পুজো দেখার আনন্দে নামে বিপর্যয়। পদপিষ্ট হন তাঁর এক মেয়ে এবং নাতনি। স্থানীয়, পুলিশ উদ্ধার করে দুজনকেই। প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছেন দুজনেই। শরীরে রয়েছে আঘাতের চিহ্ন।
অনন্যা বলছেন, “আমরা ওই সময়ে মণ্ডপে পৌঁছই। যখন বেরোচ্ছি, গেটে হুড়োহুড়ি। পড়ে যাচ্ছেন অনেকেই। আমি যে পাশ থেকে বেরিয়ে আসব, সেটাও পারিনা। পড়ে যাই। মেয়েকে আঁকড়ে ছিলাম। যতটা পেরেছি বাঁচিয়েছি। মেয়ের উপর, আমার উপর লোকজন পড়ে যাচ্ছিল। মেয়ে কথা বলা বন্ধ করে দিচ্ছিল, নীল হয়ে যাচ্ছিল। আর কিছুক্ষণ থাকলে আমরাও বাঁচতাম না!”
১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় আঘাতপ্রাপ্ত ওঁরাও। বারবার ফিরছে সেদিনের কথা। হাসপাতাল থেকে ফিরেও উঠে আসছে অনেক কিছু! অনন্যার স্বামী দেবরাজ সরদার। সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তিনিও। দেবরাজ বলছেন, “আমরা কোনওরকমে বেরিয়ে আসতে পারলেও আমার মেয়ে, স্ত্রীকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পুলিশকে জিজ্ঞাসা করলাম। ভেতরে গিয়েও পাইনি। পরে মেয়েকে খুঁজে পাই। ততক্ষণে মেয়ে ভীষণ অসুস্থ। ওদের চিকিৎসার বন্দোবস্ত হয়।” ঠাকুর দেখার সময় এমন বিভীষিকা আসবে ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি কেউ। কিন্তু বাড়ি ফিরে সব ভুলে নতুন জন্মের উদযাপন করছেন ওঁরা। আর চাইছেন উপযুক্ত তদন্ত এবং দোষীদের শাস্তি।
