ফ্রান্সে সহিংস বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় সেনাবাহিনীর সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার। আগামী শনিবারের সম্ভাব্য বিক্ষোভ সামনে রেখে পুলিশ ও জেন্ডার্মেরির পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে।
মঙ্গলবার জাতীয় পরিষদে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনিয়েজ জানান, সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর ‘সেন্তিনেল’ ইউনিটের সদস্যদের মোতায়েন করা হবে। এতে পুলিশ ও জেন্ডার্মেরির সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন।
শনিবারের কর্মসূচি ঘিরে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছেন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকোর্নু। তাঁর অভিযোগ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও শিক্ষাব্যবস্থার বিশৃঙ্খলার প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে কট্টর বামপন্থি গোষ্ঠীগুলো সহিংসতা উসকে দিয়েছে। এসব গোষ্ঠীকে প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ও প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের দিকে মিছিল করতে দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এর আগে সোমবার রাজধানী প্যারিসের কেন্দ্রীয় অংশ, মার্সেইয়ের কয়েকটি এলাকা এবং অন্যান্য শহরে কারফিউ ও বিক্ষোভ-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে মার্সেইয়ের কিছু এলাকায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও কারফিউ কার্যকর করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
মার্সেইয়ে এ পর্যন্ত ১০১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক। গত শনিবারের সহিংসতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর একটি মার্সেই। স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের হিসাবে, সেখানে পাঁচ শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশজুড়ে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১১৮ জন পুলিশ কর্মকর্তা।
পুলিশ ইউনিয়নের কর্মকর্তা আর্নড ব্লেস পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বিক্ষোভকে যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কট্টর বামপন্থি ‘ব্ল্যাক ব্লক’ গোষ্ঠীর সদস্যরা বিক্ষোভে উসকানি দিয়েছেন। পরে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ লুটপাটে জড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে প্রায় চার হাজার টিয়ার গ্যাসের শেল ছুড়তে হয়। একপর্যায়ে গোলাবারুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় পুলিশকে পিছু হটতে হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনা করেছেন মার্সেইয়ের মেয়র বেনোয়া পায়ান। সোমবার শহরটি সফরকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তিনি সরকারের ব্যবস্থাপনাকে ব্যর্থ বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে পুলিশের সদস্যসংখ্যা ও মোতায়েনের কৌশল পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, শুধু শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হলে ভবিষ্যতেও লুটপাটের ঘটনা ঘটতে পারে।
এদিকে ফ্রান্সের চলমান অস্থিরতার মধ্যে অভিবাসন ইস্যুতে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার তিনি বলেন, প্যারিস শিগগিরই একটি ‘মুসলিম শহরে’ পরিণত হবে। একই সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁকে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের এ মন্তব্য ইউরোপের অভিবাসননীতি নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের সমালোচনার প্রতিফলন। ফ্রান্সের চলমান সহিংসতার প্রেক্ষাপটে তাঁর বক্তব্য দেশটির নিরাপত্তা, অভিবাসননীতি ও রাজনৈতিক বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে।
শনিবারের সম্ভাব্য বিক্ষোভ ঘিরে সেনাবাহিনীর সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে ফরাসি সরকার। তবে সহিংসতা কতটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে বিক্ষোভের গতিপ্রকৃতি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপের ওপর।
