কোন দেশের অর্থনীতি যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিম্ন বিনিয়োগ-প্রবৃদ্ধির ফাঁদে পড়ে তখন দেশটির অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। অর্থনীতির পরিভাষায় এ অবস্থাকে ট্যাগফ্লেশন বলা হয়। এই অবস্থার সৃষ্টি হলে দেশের অর্থনীতির প্রতিটি সেক্টরই কম বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এবং বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই চেষ্টা করা হয় যেন এ অবস্থার সৃষ্টি না হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি ইতিপূর্বে আর কখনোই উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিম্ন বিনিয়োগ-প্রবৃদ্ধি ফাঁদে পড়ে পড়ে নি। তাই অভিজ্ঞতাটি আমাদের জন্য নতুন। তবে বর্তমানে দেশের অর্থনীতি যেভাবে চলছে তাতে মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, বাংলাদেশ আগামীতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিম্ন বিনিয়োগ-প্রবৃদ্ধি ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে। এই অবস্থা থেকে কিভাবে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব তা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে চিন্তা-ভাবনা করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। বর্তমান সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের জিডিপি অর্জনে অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য যে প্রস্তুতি এবং উপকরণ দরকার তা আমাদের নেই। ফলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।
২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট জিডিপি’র পরিমাণ ছিল ৫০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের জিডিপি অর্জন করতে হলে আগামী ৮ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি’র আকার দ্বিগুণ করতে হবে। প্রতি বছর ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমতুল্য স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আহরণ করতে হবে। এ বিনিয়োগ সরকারি খাতে হলে চলবে না। বিনিয়োগ হতে হবে ব্যক্তি খাতে। কারণ সরকারি খাতে যে বিনিয়োগ হয় তা মূলত অনুৎপাদনশীল বিনিয়োগ। সরকারি বিনিয়োগ দিয়ে রাস্তা-ঘাট,ব্রিজ-কার্লভার্ট, বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। এগুলো ব্যবহার করে ব্যক্তি খাত বিকশিত হয়। শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন অর্জিত হলেই ব্যক্তি খাত বিকশিত হয় না। ব্যক্তিখাত কাঙ্খিত মাত্রায় বিকশিত না হলে দেশে প্রবৃদ্ধির হার কমে যায়। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পথ সংকুচিত হয়ে পড়ে। দারিদ্র বিমোচন কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ে। বর্তমানে আমরা এমনই এক অবস্থার মুখে এসে দাঁড়িয়েছি।
সাধারণত কোন অর্থনীতিতে যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রবণতা দেখা দেয় তখন প্রবৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের হার বৃদ্ধি পায়। কারণ তখন কিছু মানুষের হাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ পুঞ্জিভুত হয়। সে অবস্থায় মানুষ বিনিয়োগে মনোযোগী হয়। এতে বিনিয়োগ এবং প্রবৃদ্ধি গতি লাভ করে। ফলে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রবণতা সৃষ্টি হয়। কিন্তু সব সময় যে অর্থনীতি একই গতিতে চলবে তা নাও হতে পারে। অনেক সময় উচ্চ মাত্রায় মূল্যস্ফীতির সময় ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ হ্রাস পায়। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে। মানুষের বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়। দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি স্থবির হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে মসে পথেই ধাবিত হচ্ছে বলে মনে আশঙ্কা করা যাচ্ছে। ‘ট্যাগফ্লেশনের সময় মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির স্মৃতি জাগ্রত হয়ে উঠে। মানুষ তাদের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। নতুন বিনিয়োগ কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়ে পড়ে। এটি অত্যন্ত জটিল একটি পরিস্থিতি।
কারণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য যে সব কার্যক্রম গ্রহণ করা হয় তা পরিস্থিতিকে আরো তা বিদ্যমান পরিস্থিতিকে আরো স্থবির করে তুলতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে সে পথেই ধাবিত হচ্ছে বলে মনে আশঙ্কা করা যাচ্ছে। কারণ বাংলাদেশ গত ৫ বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রবণতা মোকাবেলা করে চলেছে। এই পরিস্থিতি থেকে খুব সহসাই উত্তরণের কোন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্বব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রবণতা শুরু হয়। এ সময় বিশ্বব্যাপী খাদ্য ও অন্যান্য পণ্য উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলেও সাপ্লাই চেইন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার কারণে বিশ্বব্যাপী পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্থ হয়। রাশিয়া এবং ইউক্রেন মিলিতভাবে বিশ্বোর মোট দানাদার খাদ্যের ৩০ শতাংশ যোগান দিয়ে থাকে। সে সময় রাশিয়া এবং ইউক্রেনে খাদ্য উৎপাদন স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের খাদ্য পণ্য বন্দরে আটকে থাকে। তারা খাদ্য পণ্য রপ্তানি করতে পারেনি। ফলে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে চরম খাদ্যাভাব দেখা দেয়। বাজারে গিয়ে উচ্চ মূল্য দিয়েও খাদ্য পণ্য পাওয়া যাচ্ছিল না।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। সে সময় দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকা বারবার পলিসি রেট(সিডিউল ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ বা ধার গ্রহণের সময় যে সুদ প্রদান করে) বৃদ্ধি করে। পলিসি রেট বৃদ্ধি উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের একটি সাধারণ ও কার্যকর কৌশল। কারণ পলিসি রেট বৃদ্ধি করার কারণে সিডিউল ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হলে আগের বেশি হারে সুদ প্রদান করতে হয়। এতে ‘কস্ট অব ফান্ড’ বৃদ্ধি পায়। সিডিউল ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদে আনা ঋণের অর্থ উদ্যোক্তাদের নিকট ঋণদানকালে সুদের হার আগের তুলনায় বৃদ্ধি করে। এতে সাধারণ ঋণ গ্রহীতা ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন করে ঋণ গ্রহণের প্রবণতা কমে যায়। বাজারে অর্থ প্রবাহ কমে আসে। এভাবে ধীরে ধীরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিশ্বের অন্তত ৭৭টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট বৃদ্ধি করে। অধিকাংশ দেশই পলিসি রেট বৃদ্ধি এবং অন্যান্য উপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক পলিসি রেট ৫ শতাংশ থেকে পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করে ১০ শতাংশে উন্নীত করে। বর্তমানে তা সাড়ে ৯ শতাংশে নির্ধারিত আছে। পরিসি রেট বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাজার ভিত্তিক না করে সর্বোচ্চ সুদ হার ৯শতাংশে ফিক্সড করে রাখার ফলে মূল্যস্ফীতির বিবেচনায় ব্যাংক ঋণের সুদের সস্তা হয়ে যায়। সরকারের সমর্থক গোষ্ঠী এই সুযোগে বিস্তর ঋণ গ্রহণ করে তা অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করে। এ ঋণের অর্থ কোন না কোনভাবে বাজারে চলে আসে। ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি আরো উচ্চতর পর্যায়ে উপনীত হয়। সে সময় এক মুদ্রানীতিতে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। বাস্তবে অর্জিত হয়েছিল ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে একই সময়ে শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি কমেছিল ১৪ শতাংশ করে। ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি কমেছিল ব্যাপকভাবে। তার অর্থ হচ্ছে শিল্পকারখানা স্থাপনের নামে যে ঋণ নেয়া হয় তা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ এখন সে ভুল নীতির খেসারত দিচ্ছে।
বর্তমান মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। কারণ মূল্যস্ফীতি যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে মানুষের আয় বা মজুরি বাড়ছে তার চেয়ে অনেক ধীর গতিতে। বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রমকে মন্থর করে দেয়। রাজস্ব আহরণের পরিমাণ ক্রমশ করতে থাকে। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প এবং জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে দেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা স্থবির হয়ে পড়ে। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এমন পরিস্থিতি কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে ইরান-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ যুদ্ধের অংশ নয়। কিন্তু তারপরও যুদ্ধের প্রভাব আমাদের অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে আঘাত করছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করতে হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জনশক্তি রপ্তানি কার্যক্রম বিপন্ন হবার আশঙ্কা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যের কর্মক্ষেত্র ত্যাগ করে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। যারা আগে দেশে এসেছিলেন ছুটিতে তারা পুরনায় কর্মস্থলে ফিরে যেতে পারছেন না। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস হচ্ছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত রেমিট্যান্স। পরিস্থিতি যেভাবে অবনতি ঘটছে তাতে মনে হচ্ছে আগামীতে বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের জনশক্তির বাজার হারাতে পারে। বাংলাদেশ প্রতি বছর যে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ব্যবহার করে তার প্রায় পুরোটাই মাধ্যপ্রচ্যের দেশগুলো থেকে আমদানিকৃত। ইরার-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান দীর্ঘস্থায়ী হবার আশঙ্কা রয়েছে। যদি সত্যি তেমনটি ঘটে তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য।
ইন্টারন্যাশনাল মানিটারিং ফান্ড (আইএমএফ) বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে যে প্রাক্কলন প্রকাশ করেছে তাতে ট্যাগফ্লেশনের ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। সংস্থাটি বলেছে, চলতি অর্থবছরে (২০২৬-২০২৭) বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে যেতে পারে। পরবর্তী দু’বছর যথাক্রমে ২ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে। ২০২৯-২০৩০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হতে পারে ২ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০৩০-২০৩১ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়ে ৩ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। পরবর্তী বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়লেও তার গতি থাকবে খুবই মন্থর। গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিতক ১৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬শতাংশ। এটা অর্জিত হবার কোন সম্ভাবনা নেই। চলতি অর্থবছরের জন্য আইএমএফ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির যে প্রাক্কলন করেছে তা বিগত সাড়ে ৩ দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। সংস্থাটি একই সঙ্গে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা,নেপাল ভুটান, মালদ্বীপের প্রবৃদ্ধির বিষয়েও তথ্য দিয়েছে। তাদের মতে, চলতি অর্থবছরে ভারতের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে ৭ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতির হার থাকবে ৪দশমিক ৪ শতাংশ। পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে সাড়ে তিন শতাংশ। শ্রীলঙ্কার প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে ৩দশমিক ৭ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির হার থাকবে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। নেপালের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৮ শতাংশে সীমিত থাকবে। মালদ্বীপের প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি হতে পারে যথাক্রমে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ ও আড়াই শতাংশ। ভুটানের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি থাকবে সাড়ে ৬ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ দেশের প্রবৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির কাছাকাছি থাকবে। একমাত্র বাংলাদেশেই প্রবৃদ্ধি ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি অসহনীয় পর্যায়ে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আগামী বছরগুলোতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাবার তেমন কোন সম্ভাবনা নেই।
প্রবৃািদ্ধ হ্রাস, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাবার ফলে দেশে দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গত অর্থবছরে ১৯ লাখ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে গেছে। এ নিয়ে গত ৪ বছরে মোট ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে গেল। জাতীয় দারিদ্র্যের হার টানা চতুর্থ বছরের মতো বেড়েছে। ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭শতাংশ। গত অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠে আসে। চলতি অর্থবছরে তা ২২ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। আয় বৈষম্য প্রকটভাবে বাড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থার সৃষ্টি করেছে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে না বরং কমছে। ফলে সাধারণ নিম্ন আয়ের এবং নির্দিষ্ট আয়ের আনুষগুলো বড়ই অসহায় অবস্থার মধ্যে পাতিত হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম দুর্বল খাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে ব্যাংকিং খাতকে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ব্যাংকিং সেক্টরে যে দুরবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল তা উত্তরণের কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। এখন তা ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বিপুল পরিমাণ অবলোপনকৃত ঋণ, পুন:তফসিলকৃত ঋণ এবং মামলাধীন প্রকল্পগুলোর নিকট পাওনা ঋণের পরিমাণ যেপাগ করলে নন-পারফমির্ং লোনের পরিমাণ ১০ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি চলে যাবে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টর বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণগ্রস্থ খাত। ঋণ খেলাপি সমস্যার কারণে দেশের ব্যাংকিং সেক্টর উদ্যোক্তাদের চাহিদাকৃত ঋণের যোগান দিতে পারছে না। ব্যক্তি খাতে ব্যাংকিং সেক্টরের ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। গত অর্থবছরে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার ছিল জিডিপি’র ২২ দশমিক ৩ শতাংশ। এটা বিগত ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিদেশি গ্রিন ফিল্ড বিনিয়োগের হার এক বছরে কমেছে ১৫শতাংশ। যদিও পুনঃবিনিয়োগ বেড়েছে। জ্বালানি তেলের দুষ্প্রাপ্যতা, উৎপাদন উপকরণের উচ্চ মূল্যসহ নানা কারণে বিদ্যামন কারখানাগুলোতে উৎপাদন কমে গেছে। অনেক কারখানা তাদের কর্মী ছাঁটাই করেছে। কোন কোন প্রতিষ্ঠান কর্মঘন্টা কমিয়ে বা কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে ব্যয় সাশ্রয় করার চেষ্টা করছে।
বর্তমানে দেশের অর্থনীতি যেভাবে স্থবির হয়ে পড়ছে তা থেকে উত্তরণের জন্য আর্থিকখাতসহ রাজস্ব খাতে ব্যাপক সংস্কার সাধন করা প্রয়োজন। সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে সঠিক পথে নিয়ে আসা না গেলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগ মন্দা কমবে না। অর্থনৈতিক উত্তরণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এখনই কার্যকর সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে।
লেখক : সাবেক ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক।
