কুরআন প্রতিযোগিতার গ্র্যান্ড ফাইনাল
রাজধানীর মিরপুরে ‘হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা ২০২৬’-এর গ্র্যান্ড ফাইনালে ডা. শফিকুর রহমান হাফেজদের কুরআনের শিক্ষা সমাজে বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন; পাঁচ মাসব্যাপী এ প্রতিযোগিতায় ৮০০টি মাদরাসার প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেন এবং বিজয়ীদের মধ্যে ওমরাহ, ল্যাপটপ, সাইকেল ও নগদ অর্থসহ বিভিন্ন পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
কুরআনের শিক্ষাকে সমাজে বাস্তবায়ন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর আলোকে সমাজ গঠনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এমপি। তিনি বলেছেন, যাঁরা পবিত্র কুরআন বুকে ধারণ করার শক্তি পেয়েছেন, তাঁরা যেন কুরআনের শিক্ষা সমাজে বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিতে পারেন। তাঁদের মেহরাব থেকে নেতৃত্বের আসনে দেখতে চান বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেল ৩টায় রাজধানীর মিরপুরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়ামে নগর উন্নয়ন ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত পাঁচ মাসব্যাপী ‘হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা ২০২৬’-এর গ্র্যান্ড ফাইনাল ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী ও নগর উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের পৃষ্ঠপোষকতায় এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের বিরল আয়োজন আগে কোথাও হয়নি। এ আয়োজন বাস্তবায়নে নগর উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান সেলিম উদ্দিনসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। ছোটখাটো মতভিন্নতা দূরে রেখে সবাইকে কুরআন ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর আলোকে সমাজ গঠনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রতিযোগিতার ১০ পারা বিভাগে প্রথম স্থান অর্জনকারী শিশু রিদওয়ান বিন আলীকে অভিনন্দন জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান ঘোষণা করেন, ‘তার বাবা, মা ও উস্তাদকে আমার পক্ষ থেকে ওমরাহ করানো হবে, ইনশাআল্লাহ।’
এ সময় ঢাকা মহানগরী উত্তরের জনপদের জন্য মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনকে আল্লাহ কবুল করুন এবং তাঁকে সেই তাওফিক দান করুন—এ দোয়াও করেন জামায়াতের আমির।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নগর উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।
সভাপতির বক্তব্যে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, তাঁরা শুধু পুরস্কার দেওয়া বা নেওয়ার জন্য এখানে আসেননি; বরং কুরআনের আলোয় সমাজকে আলোকিত করতে এবং সমাজে কুরআনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করতে এসেছেন।
তিনি বলেন, হাফেজে কুরআনরা কুরআন ধারণ করে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দাঈ ইলাল্লাহর দায়িত্ব পালন করবেন—এটাই তাঁদের প্রত্যাশা। মতামতের ক্ষেত্রে বিভেদ থাকলেও পবিত্র কুরআনের প্রশ্নে সবাই এক ও অভিন্ন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আল্লাহর জমিনে আল্লাহর কুরআন প্রতিষ্ঠার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
এর আগে স্বাগত বক্তব্যে সেলিম উদ্দিন পাঁচ মাসব্যাপী আয়োজন সফল করতে যাঁরা পরিশ্রম করেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তাঁদের প্রচেষ্টা মহান আল্লাহ কবুল করুন এবং উত্তম প্রতিদান দিন—এ দোয়াও করেন তিনি।
তিনি বলেন, এ অনুষ্ঠান শুধু পুরস্কার বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পবিত্র কুরআনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং এর শিক্ষা ও আদর্শ সমাজে প্রতিষ্ঠার একটি মহতী আয়োজন। পাঁচ মাসব্যাপী এ প্রতিযোগিতায় আট শতাধিক কওমি ও আলিয়া মাদরাসার লক্ষাধিক হাফেজ অংশ নিয়েছেন। মাদরাসার নেসাব বা পরিচয়ে ভিন্নতা থাকলেও পবিত্র কুরআনের প্রশ্নে সবাই ঐক্যবদ্ধ। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে কুরআনের শিক্ষা ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলাই তাঁদের লক্ষ্য।
নগর উন্নয়ন ফোরামের সদস্যসচিব ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম এবং হাফেজ খালিদ সাইফুল্লাহ বকসির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান এমপি, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ যায়নুল আবেদিন, হুফফাতুল কুরআন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান শায়েখ হাফেজ আব্দুল হক, ঢাকা মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমির আব্দুর রহমান মূসা, কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেন এমপি, বিশিষ্ট আলেম মুফতি আলী হাসান উসামা, ঢাকা মহানগরী জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, নাজিম উদ্দীন মোল্লা, ডা. ফখরুদ্দিন মানিক, ইয়াসিন আরাফাত প্রমুখ।
পাঁচ মাসের প্রতিযোগিতায় অংশ নেন ১ লাখ ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী
গত ১৬ জুলাই শুরু হওয়া এ প্রতিযোগিতায় ঢাকার ৮০০টি মাদরাসার প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেন। পবিত্র কুরআনের ১০, ২০ ও ৩০ পারা—এই তিনটি পৃথক বিভাগে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি বিভাগে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী তিনজন করে মোট নয়জনসহ সর্বমোট ২৪৩ জন প্রতিযোগীকে বিজয়ী নির্বাচিত করে পুরস্কার দেওয়া হয়।
প্রতিযোগিতার পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, বিজয়ীদের মধ্যে ওমরাহ পালনের সুযোগ, ল্যাপটপ, সাইকেল ও অর্ধকোটি টাকা নগদ অর্থসহ বিভিন্ন পুরস্কার বিতরণ করা হয়। পাঁচ মাসব্যাপী এ আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিল পবিত্র কুরআনের হিফজ চর্চায় উৎসাহ দেওয়া, হাফেজে কুরআনদের প্রতিভার বিকাশ ঘটানো এবং কুরআনের শিক্ষা ও আদর্শ সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের মধ্যে কুরআন মুখস্থ করা, শুদ্ধভাবে তিলাওয়াত করা এবং কুরআন শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কুরআনের আলোকে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান অতিথিদের
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, এ আয়োজনে অংশ নিতে পেরে তিনি আনন্দিত। পবিত্র আল-কুরআন সমগ্র মুসলিম জাতির জীবনবিধান উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজার হাজার হাফেজে কুরআন তৈরি হচ্ছেন।
ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, কুরআন সংরক্ষণকারীদের নিয়ে দীর্ঘ পাঁচ মাসব্যাপী প্রতিযোগিতার আয়োজন একটি স্মরণীয় ঘটনা। এ আয়োজন নতুন একটি সূচনা তৈরি করেছে। কিয়ামত পর্যন্ত কেউ আল-কুরআন মুছে ফেলতে পারবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি মহান আল্লাহর বাণী এবং তিনিই এর সংরক্ষক।
তিনি কুরআনের শিক্ষার আলোকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সমাজে কুরআনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠার জন্য হাফেজদের প্রস্তুত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আলেমরা রাষ্ট্রের নেতৃত্বে ভূমিকা রাখবেন। এ আয়োজনের বার্তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
নগর উন্নয়ন ফোরামের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান মূসা বলেন, এ কুরআনের সমাবেশ থেকে তাঁরা আগামী দিনে বাংলাদেশকে কুরআনের বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন। জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রে কুরআনের জীবনবিধান প্রতিষ্ঠার কথাও বলেন তিনি।
বিশেষ অতিথি মুফতি আলী হাসান উসামা বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এ আয়োজন যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দেশে হাফেজ ও আলেমদের কদর বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি আয়োজনের পৃষ্ঠপোষক নগর উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
তিনি আরও বলেন, এ আয়োজনের সার্থকতা তখনই আসবে, যখন ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব, জাতীয় মসজিদের নেতৃত্বসহ দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বে হাফেজ ও আলেমরা দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।
প্রতিযোগিতার প্রধান বিচারক ও হুফফাজুল কুরআন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান শায়েখ হাফেজ আব্দুল হক বলেন, বাংলাদেশে অনেক প্রতিযোগিতার আয়োজন হলেও নগর উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের উদ্যোগে পাঁচ মাসব্যাপী এ কুরআন প্রতিযোগিতা আয়োজনের জন্য তিনি মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেন।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ যায়নুল আবেদিন বলেন, যাঁরা কুরআন জানেন, মানেন এবং এর সব হুকুম-আহকাম মেনে চলেন, তাঁদের সম্মানিত করতে হবে। সমাজকে কুরআনের আলোয় আলোকিত করার আহ্বান জানান তিনি।
