আজ পহেলা কার্তিক। হেমন্তের প্রথম দিন। বাংলাদেশের ঋতুপরিক্রমায় কার্তিক ও অগ্রহায়ণ এই দুই মাস হেমন্তকাল। মূলত হেমন্ত একটি সংযোজক ঋতু। তাই প্রাণ-প্রকৃতি ও নিসর্গে রূপবদলের চিত্র দারুণভাবে দৃশ্যমান হয়। ভাদ্রের তালপাকা ভ্যাপসা গরম থেকে কুয়াশা ঘেরা শীতের দৃশ্যান্তরের অমোঘ ছোঁয়ায় এক অলৌকিক আধ্যাত্মদর্শনের দরোজা খুলে দেয়।
এই দৃশ্যান্তের বদলকে সুফিয়া কামাল লিখেছেন- ‘সবুজ পাতার খামের ভেতর হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে, কোন্ পাথারের ওপার থেকে আনল ডেকে হেমন্তকে?’ দিনের দৃশ্যপটের পাশাপাশি বদলে যায় রাতের চাদরের রঙ-রেখা। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘হিমের রাতে ওই গগনের দীপগুলিরে,/হেমন্তিকা করল গোপন আঁচল ঘিরে।/ঘরে ঘরে ডাক পাঠালো ‘দীপালিকায় জ্বালাও আলো,/জ্বালাও আলো, আপন আলো, সাজাও আলোয় ধরিত্রীরে।’
অর্থাৎ হেমন্তের আগমনে প্রকৃতিতে পরিবর্তন এসেছে। রাতে তারার আলোয় হেমন্তের মৃদু কুয়াশায় আড়াল হয়ে গেছে। তবে ঘরে ঘরে আহ্বান এসেছে, আলো জ্বালানোর। সে আলো যেন আত্ম-উদ্বোধনের হয়। আত্ম-আবিষ্কৃত আলোয় পৃথিবীকেও সাজাতে হবে। কোনো ধার করা আলোয় নয়। আবার ‘নৈবেদ্য স্তব্ধতা’য় বলেছেন, ‘আজি হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত চরাচরে/জনশূন্য ক্ষেত্র মাঝে দীপ্ত দ্বিপ্রহরে/শব্দহীন গতিহীন স্তব্ধতা উদার/রয়েছে পড়িয়া শ্রান্ত দিগন্ত প্রসার/স্বর্ণশ্যাম ডানা মেলি।’
হেমন্তের আগমনীর প্রকৃতি ও স্বভাবের এক চঞ্চল রূপ এঁকেছেন কাজী নজরুল ইসলাম ‘অঘ্রাণের সওগাত’ কবিতায়। নজরুল ইসলাম এই কবিতায় কেবল হেমন্তের প্রকৃতির ছবিই আঁকেননি, একই সঙ্গে পারিবারিক সংস্কৃতির চিত্রও তুলে ধরেছেন। ফসল ঘরে তোলার সঙ্গে সঙ্গে কৃষাণ-কৃষাণীর মনে যে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়, তার বর্ণনা যেমন আছে, তেমনি আছে নবান্ন উপলক্ষে বাড়ির মেয়ে জামাইকে নিমন্ত্রণ করার চিরায়ত রূপটিও।
নজরুল হেমন্তের দিনের চেয়ে রাতের সৌন্দর্যে বেশি মোহিত। তাই তার পঙক্ততি-‘চাঁদের প্রদীপ জ্বালাইয়া নিশি জাগিছে একা নিশীথ/নতুন পথের চেয়ে চেয়ে হল হরিৎ পাতারা পীত।’ কবি চাঁদকে দেখেছেন প্রকৃতির আলোর উৎস হিসেবে। যেখানে চরাচরজুড়ে বসবাসরত মানুষেরা অপেক্ষা করে অপার সৌন্দর্য উপভোগের আশায়।
