সময় যেন এক অনন্ত নদী, যা তার আপন গতিতে বয়ে চলে। কিন্তু কিছু সুর, কিছু কণ্ঠ আর কিছু মানুষ সময়ের সেই প্রবল স্রোতকেও থামিয়ে দিতে পারে। বাংলা ব্যান্ড সংগীতের আকাশকে যিনি একাই আলোড়িত করেছিলেন তার গিটারের জাদুকরি টানে, সেই কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু (এবি) আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন দেখতে দেখতে আটটি বছর পেরিয়ে গেল। ২০১৮ সালের আজকের দিনে অগণিত ভক্তকে কাঁদিয়ে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই গিটার মায়েস্ত্রো। তবে তার প্রয়াণ কেবলই এক নশ্বর দেহের প্রস্থান; তিনি আজও বেঁচে আছেন কোটি শ্রোতার হৃদয়ে, গিটারের প্রতিটি তারের ঝংকারে।
আইয়ুব বাচ্চু তার একটি গানে লিখেছিলেন, ‘এই রুপালি গিটার ফেলে একদিন চলে যাবো দূরে, বহুদূরে...’। গানটির সেই বিষাদময় বাণীই সত্যি হয়েছিল এক শরৎকালে। মাত্র ৫৬ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিরবিদায় নেন এলআরবির এই প্রতিষ্ঠাতা। ক্ষণজন্মা এই শিল্পীর আকস্মিক চলে যাওয়ার সংবাদে সেদিন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরো বাংলাদেশ; বিশেষ করে তার প্রিয় শহর চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষ হারিয়েছিল তাদের এক অতি আপনজনকে, যার শেষ জানাজায় লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত উপস্থিতি প্রমাণ করেছিল তার প্রতি মানুষের ভালোবাসার গভীরতা।
১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া এই রকস্টার কৈশোরেই সুরের মায়ায় জড়িয়ে পড়েন। ‘ফিলিংস’ ও পরবর্তী সময়ে কিংবদন্তি ব্যান্ড ‘সোলস’-এর লিড গিটারিস্ট হিসেবে দীর্ঘ এক দশক যুক্ত থাকার পর, ১৯৯১ সালে তিনি গড়ে তোলেন নিজের ব্যান্ড ‘এলআরবি’। এলআরবির হাত ধরে বাংলা সংগীতে এক নতুন ধারার সূচনা হয়। প্রথম ডাবল অ্যালবাম প্রকাশ থেকে শুরু করে দেশের গ-ি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে হাজার হাজার কনসার্ট মাতানোÑ সবখানেই আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন অনন্য ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সংগীতে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মৃত্যুর পর চলতি বছর তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘একুশে পদক’ (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়।
‘চলো বদলে যাই’, ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো’, ‘এখন অনেক রাত’, ‘কষ্ট’, ‘ফেরারি মন’, ‘সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে’Ñ তার এমন শত শত কালজয়ী গান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রেমিক হৃদয়ের আকুলতা কিংবা জীবনের চরম একাকিত্ব, আইয়ুব বাচ্চুর কণ্ঠ ও গিটারের রিফ যেন সব আবেগের এক পরম আশ্রয়। শুধু রক মিউজিকই নয়, প্লেব্যাক কিংবা ‘সাউন্ড অব সাইলেন্স’-এর মতো দুর্দান্ত ইনস্ট্রুমেন্টাল অ্যালবামেও তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতি বছরই আইয়ুব বাচ্চু ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন স্মরণ সভা, দোয়া মাহফিল ও নানা উদ্যোগ নিয়ে থাকে। তার স্মৃতিকে অম্লান রাখতে কাজ করে যাচ্ছে তার পরিবার ও ভক্তরা।
মানুষের জীবন একসময় থমকে যায়, কিন্তু খাঁটি শিল্পের কোনো মরণ নেই। আইয়ুব বাচ্চু চোখের আড়ালে চলে গেছেন ঠিকই, কিন্তু বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে তিনি রৌদ্রোজ্জ্বল এক নক্ষত্র হয়ে চিরকাল জাজ্বল্যমান থাকবেন।
