কালবেলা · সাধারণ
ধলাই নদীতে পলো বাওয়া উৎসব, মাছ ধরতে মানুষের ঢল
২৫/১০/২০২৬

কালের বিবর্তনে গ্রামবাংলার চিরচেনা নদ-নদী আর লোকজ ঐতিহ্যগুলো যখন হারিয়ে যেতে বসেছে, ঠিক তখনই শতবর্ষের সেই পুরোনো ধারা টিকিয়ে রেখেছেন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মানুষ। ধলাই নদীকে কেন্দ্র করে আয়োজিত হলো ঐতিহ্যবাহী ও শতবর্ষী ‘পলো বাওয়া’ উৎসব।
রোববার (২৫ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নে ধলাই নদীতে মাছ শিকারের এ উৎসব পালন করা হয়। এতে উপজেলার রহিমপুর, ধর্মপুর, রামচন্দ্রপুর, সিদ্ধেশ্বরপুর, দেবীপুর, চৈত্রঘাট, বড়চেগসহ বিভিন্ন গ্রামের সৌখিন মৎস্য শিকারিরা অংশ নেন। উৎসবকে ঘিরে নদীর পাড়ে উৎসুক মানুষের ভিড় জমে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পলো বাওয়া হলো বাঁশ দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি পলো নামের মাছ ধরার উপকরণ নিয়ে দলবদ্ধভাবে মাছ শিকারের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি। শুষ্ক মৌসুম পুরোপুরি শুরু না হলেও ধলাই নদীসহ উপজেলার বিভিন্ন ছোট ছড়া, বিল ও জলাশয়ে কমতে থাকা পানিতে মাছ ধরার এ আয়োজন শুরু হয়েছে। উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের ধলাই নদীর মির্তিঙ্গা ব্রিজ থেকে প্রতি বছর এই সময়ে পলো বাওয়া উৎসবের আয়োজন করা হয়। এই মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে কয়েকটি গ্রামজুড়ে মৎস্য শিকারিদের মাঝে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। ধরা পড়ে ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের মাছ।
পলো বাওয়ায় অংশ নিতে শনিবার স্থানীয় মুন্সীবাজারে ঢোল পিটিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়। সকাল থেকে মাছশিকারিরা নদীর পাড়ে এসে জমায়েত হতে থাকেন। পূর্বনির্ধারিত সময় বেলা ১১টার দিকে সবাই একসঙ্গে বিলে নেমে শুরু করেন পলো বাওয়া।
আয়োজকরা জানান, এখানে মূলত আমরা একদিন নদীতে নেমে পলো বাওয়া উৎসবে মেতে উঠি। শত বছর ধরে বছরের এই সময়ে পলো বাওয়া হয়। সব বয়সের মানুষ উৎসবে অংশগ্রহণ করেন। ভাগ্য সহায় হলে কেউ একাধিক মাছ পান আবার কেউ খালি হাতে ফিরেন। তবে আমার মাছ নয় উৎসব করাটাই আমাদের উদ্দেশ্য।
উৎসবে অংশ নেওয়া লোকজন পলো ছাড়াও উড়াল জাল ও অন্যান্য মাছ ধরার উপকরণ ব্যবহার করেন। নদীর স্বল্প পানিতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে একদল মাছ শিকারি জাল নিয়ে অপেক্ষা করেন। অপরদিক থেকে আরেক দল পলো চাপিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যান। এ সময় দেশীয় প্রজাতির পুঁটি, টেংরা, শোল, রিটা ও বোয়ালসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরার চেষ্টা করেন তারা।
বড়দের পাশাপাশি শিশু-কিশোররাও মাছ ধরায় সহযোগিতা করে। মাথা ও কোমরে গামছা বেঁধে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মাছ ধরেন অংশগ্রহণকারীরা। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দর্শনার্থীরা হাততালি ও উল্লাসের মাধ্যমে তাদের উৎসাহ দেন। সব মিলিয়ে ধলাই নদীর পাড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
তবে এবার বিষ প্রয়োগ করে মাছ নিধনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন উৎসবে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা। তাদের অভিযোগ, বিষ দিয়ে মাছ নিধনের কারণে নদীতে মাছের প্রাপ্যতা কমছে। এতে ঐতিহ্যবাহী পলো বাওয়া উৎসবেও অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমে এসেছে। বিষ প্রয়োগ করে মাছ নিধনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
ধর্মপুর গ্রাম থেকে উৎসবে অংশ নিতে আসা ইমাম হোসেন বলেন, বছরের এই দিনটার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি। তবে বিষ দিয়ে মাছ নিধন করায় এবার পলো বাওয়ায় মানুষের উপস্থিতি কম ছিল।
তিনি আরও বলেন, প্রাচীন এ উৎসব টিকিয়ে রাখতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
এলাকার বাসিন্দা সংবাদকর্মী আব্দুল বাছিত খান জানান, গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ পলো বাওয়া উৎসব শুধু মাছ ধরার আয়োজন নয়, এটি গ্রামীণ মানুষের মিলনমেলা। নদী-জলাশয় রক্ষা, বিষ প্রয়োগে মাছ নিধন বন্ধ এবং দেশীয় মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার নিশ্চিত করা গেলে এ ঐতিহ্য আগামী প্রজন্মের কাছেও বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।
উৎসব দেখতে আসা সাদিকুল ইসলাম বলেন, শনিবার বাজারে শুনে আজ পলো বাওয়া দেখতে আসলাম। গ্রাম বাংলার চমৎকার দৃশ্য। সব বয়সী মানুষেরা মাছ শিকার করতে পলো নিয়ে নেমেছেন। যাদের পলো নেই তারাও মাছ ধরার জাল নিয়ে নেমেছেন বিলে।
পলো উৎসবে অংশ নেওয়া জসিম আহমেদ বলেন, শতাধিক লোক পলো বাওয়া উৎসবে অংশগ্রহণ করেন। এখানে সবাই মাছ শিকার করবেন এ জন্য আসেননি। অনেক উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য এসেছেন। কেউ মাছ পাবে আবার কেউ খালি হাতে যাবে এটা বড় বিষয় নয়। শতবছর ধরে আমাদের এখানে এই উৎসব পালন করে আসা হচ্ছে।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗