২০২৬ সালের ৯ অক্টোবর সকালে অসলোতে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি তাদের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দিল দক্ষিণ আফ্রিকার সেই আইনবিদকে, যিনি গাজায় ইসরায়েলের চালানো গণহত্যার বিষয়টি তদন্ত করা জাতিসংঘ কমিশনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
ওই দিন বিকেলের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে (আইসিসি) একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার ঘোষণা দেন। ২০২০ সালে ও ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটন যেভাবে কেবল আইসিসির কিছু কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, এবার তা না করে সরাসরি পুরো আদালতকেই নিষেধাজ্ঞা দিল- যে আদালতকে বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন ‘উচ্ছৃঙ্খল’ বলে ঘোষণা করেছে।
গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার তিন বছরের আইনি লড়াই, ফিলিস্তিনিদের সাক্ষ্যপ্রমাণ দাখিল, জাতিসংঘ কমিশনের শুনানি এবং সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবগুলোর ফলেই নাভি পিল্লাই এই গণহত্যার রায় ঘোষণা করেছিলেন। আর এই রায়ের পরই রুবিও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে প্রি-ট্রেয়াল চেম্বার থেকে পরোয়ানা জারির পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
আইনের আনুষ্ঠানিক পরিধি আর এর প্রতিষ্ঠাতারা যে দায়মুক্তির আশা করেছিলেন- এই দুয়ের মাঝখানে নিষেধাজ্ঞাগুলোই ছিল শেষ অস্ত্র।
৯ অক্টোবর যা একেবারে পরিষ্কার করে দিল, তা হলো আন্তর্জাতিক আইনের কোনো সংকট নয়, বরং এর মূল বাস্তবতা। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য তৈরি করা প্রতিষ্ঠানগুলোর সর্বজনীনতার দাবি সবসময়ই এই শর্তের ওপর নির্ভরশীল ছিল যে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো কখনোই তাদের সৃষ্টিকারী রাষ্ট্রগুলোর জন্য সত্যিকারের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে না।
এই দুই ঘটনার মধ্যকার দূরত্বই প্রমাণ করে যে, উপনিবেশের পর সর্বজনীন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য পশ্চিমারা যে প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি করেছিল, সেগুলোর নিজেদের বিরুদ্ধেই সেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কোনো পরিকল্পনা ছিল না।
যেসব কারণে আদালত তার সীমা অতিক্রম করে ফেলেছিল
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) দক্ষিণ আফ্রিকা যে গণহহত্যার আবেদন করে, তা ছিল এই বিচার ব্যবস্থার নিজস্ব নিয়মগুলোকে এমন এক জায়গায় প্রয়োগ করা, যেখানে এগুলো আগে কখনো একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়নি।
জেনোসাইড কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৯-এর সমঝোতামূলক ধারা প্রয়োগ করা হলো আইসিজেতে, রোম স্ট্যাটিউটের পরিপূরক কাঠামো গেল আইসিসিতে, আর সাধারণ পরিষদের ‘শান্তির জন্য ঐক্য’ প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হলো দুটোর ক্ষেত্রেই।
ফিলিস্তিনিদের আইনি দলগুলো দশকের পর দশক ধরে সাক্ষ্যপ্রমাণের রেকর্ড তৈরি করে আসছিল। কিন্তু আইসিজে-তে জোনোসাইড কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৯ ধারায় মামলা করার জন্য পূর্ণ মর্যাদাসম্পন্ন একটি রাষ্ট্রীয় পক্ষের প্রয়োজন ছিল, আর ফিলিস্তিনের সেই মর্যাদা ছিল না।
দক্ষিণ আফ্রিকা যা সরবরাহ করেছিল তা হলো সেই আইনি এখতিয়ারের চাবি, যার জন্য সাক্ষ্যপ্রমাণগুলো এতদিন অপেক্ষা করছিল।
চারটি পৃথক ম্যান্ডেট- যাদের প্রত্যেকের প্রত্যেকের কাজের ধরন ও প্রমাণ যাচাইয়ের পদ্ধতি আলাদা ছিল- সবাই একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাল।
আইসিজে ২০২৪ সালের জানুয়ারির অন্তর্বর্তীকালীন রায়ে জানাল যে, গণহত্যামূলক কাজ থেকে সুরক্ষার একটি যৌক্তিক অধিকার ফিলিস্তিনের রয়েছে। ২০২৪ সালের মার্চের বিশেষ প্রতিবেদনে ফ্রান্সেসকা আলবানিজও জানালেন যে, গাজায় গণহত্যার মতো অপরাধ ঘটার যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ রয়েছে।
পিল্লাইয়ের সভাপতিত্বে গঠিত স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন নির্দিষ্ট কিছু গণহত্যামূলক কাজের জন্য ইসরায়েলের শীর্ষ নেতৃত্বকে দায়ী করে এবং জানায় যে তারা জেনোসাইড কনভেনশনের ৩(গ) ধারা অনুযায়ী গণহত্যায় উসকানি দিয়েছে।
এরপর ২০২৪ সালের নভেম্বরে আইসিসির প্রি-ট্রেয়াল চেম্বার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
এই আদালত যে পশ্চিমা মিত্র কোনো সরকারের বিরুদ্ধে এমন একজোট হয়ে রায় দিতে পারে, তা এর প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রগুলো কখনো কল্পনাই করেনি। যখন সত্যি সত্যিই এমনটা ঘটে গেল, তখন সরাসরি আদালতটির ওপর চড়াও হওয়া ছাড়া তাদের কাছে আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
পিল্লাই এর আগে আইসিটিআর- এর ট্রায়াল চেম্বার ১-এ দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যা ১৯৯৮ সালে আকায়েসু মামলার রায় দিয়েছিল- যা ধর্ষণকে গণহত্যার একটি অন্যতম উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা প্রথম আন্তর্জাতিক রায় ছিল।
যে বিচারক বেঞ্চ থেকে সেই বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিলেন, তিনিই এখন গাজা শুনানিতে সবচেয়ে নিখুঁত গণহত্যার সংজ্ঞার রচয়িতা।
অসলো সেই ঐতিহ্যকে সম্মান জানাল। আর ওয়াশিংটন একই দিনে এটিকে প্রয়োগকারী আদালতের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিল।
২০২৪ সালের নভেম্বরে আইসিসির প্রি-ট্রেয়াল চেম্বার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এই আদালত যে পশ্চিমা মিত্র কোনো সরকারের বিরুদ্ধে এমন একজোট হয়ে রায় দিতে পারে, তা এর প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রগুলো কখনো কল্পনাই করেনি। যখন সত্যি সত্যিই এমনটা ঘটে গেল, তখন সরাসরি আদালতটির ওপর চড়াও হওয়া ছাড়া তাদের কাছে আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
যে সীমাটি কখনো স্পষ্ট করে বলা ছিল না
আইসিসির প্রি-ট্রেয়াল চেম্বার যখন কোনো দখলদার শক্তির রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে, তখন রোম স্ট্যাটিউটের কোনো নিয়মই তাদের তা করতে নিষেধ করেনি।
এই পরোয়ানাগুলো যা উন্মোচন করেছিল তা হলো- আইনের আনুষ্ঠানিক পরিধি এবং এর প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রগুলো আদালতের কখনোই না পৌঁছানোর যে বিচারিক সীমা অনুমান করেছিল, তার মধ্যকার দূরত্ব। এই সীমাটি বজায় রাখা হয়েছিল অনুচ্ছেদ ৯৮-এর দ্বিপক্ষীয় সমর্পণ-বিরোধী চুক্তি, অনুচ্ছেদ ১৬-এর অধীনে নিরাপত্তা পরিষদের স্থগিতাদেশের অধিকার এবং আদালতের বাজেটের অর্ধেকেরও বেশি অর্থায়নকারী রাষ্ট্রগুলোর আর্থিক শক্তির জোরে।
দুই দশক ধরে, কোনো বাধা ছাড়াই সেই কাঠামোটি অক্ষুণ্ণ ছিল এবং কোনো নিশ্চিত বিচারপ্রক্রিয়া পশ্চিমা মিত্র কোনো সরকারের রাজনৈতিক বা সামরিক নেতৃত্বের কাছাকাছিও পৌঁছায়নি।
আফ্রিকান ইউনিয়ন ২০১৭ সালে আদালত থেকে গণপদত্যাগের আনুষ্ঠানিক হুমকি দিয়েছিল এই অভিযোগ তুলে যে- আদালত কেবল আফ্রিকান নেতাদের ওপরই তার ক্ষমতা প্রয়োগ করছে, অথচ অন্যান্য জায়গার তদন্তগুলো ওয়াশিংটনের অংশীদার হিসেবে বিবেচিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিশ্চিত অভিযোগ আনার আগেই থেমে যাচ্ছে।
প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রগুলো সেই অভিযোগকে পাত্তাই দেয়নি, কারণ প্রি-ট্রেয়াল চেম্বারের পরোয়ানাগুলো তখনো তাদের এমন কঠিন পরিস্থিতির মুখে ফেলেনি। ।
কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার আবেদন এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করল, যা বন্ধ করার কোনো পথ বিদ্যমান আইনে ছিল না। অনুচ্ছেদ ৯৮-এর দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী তৃতীয় কোনো দেশ মার্কিন নাগরিকদের আইসিসির কাছে তুলে দিতে বাধ্য নয়।
তবে আইসিজে-তে জেনোসাইড কনভেনশন নিয়ে করা মামলার ওপর সেই চুক্তির কোনো হাত ছিল না, কারণ আইসিজে সম্পূর্ণ আলাদা নিয়মে চলে।
দ্বিপক্ষীয় সমর্পণ-বিরোধী চুক্তিগুলো আইসিজে’র জেনোসাইড কনভেনশনের মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল না।
আর অনুচ্ছেদ ১৬-এর মাধ্যমে কোনো তদন্ত স্থগিত করতে হলে নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব পাস করাতে হতো, যেখানে রাশিয়া ও চীন নিশ্চিতভাবেই ভেটো দিত। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তা বছর ধরে কাজ করে; কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া তো কয়েক মাসের মধ্যেই এগিয়ে গিয়েছিল।
দুই দশক ধরে বিচারিক পরিধি কেবল একমুখীভাবে পরিচালিত হয়েছে- এ কারণে নয় যে প্রতিষ্ঠাতা দলিলপত্রগুলো তা বাধ্যতামূলক করেছিল, বরং এই কারণে যে এই কাঠামোটি তৈরি করা রাষ্ট্রগুলোর কাছে কেউ সেই সীমা অতিক্রম করার আগে তা প্রয়োগ করার কোনো কারণই ছিল না।
রোমে নিজেদের পছন্দমতো নিয়ম বসাতে না পেরে ২০০২ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র স্বাক্ষর তুলে নেয় এবং পরবর্তী দুই দশক ধরে নানাভাবে বাধা দিতে থাকে। যেমন- আফগানিস্তান যুদ্ধের তদন্ত বানচালের চেষ্টা করা, ২০২০ সালে প্রসিকিউটর ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া এবং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালতের কর্মীদের বিরুদ্ধে আরও কড়াকড়ি আরোপ করা। আগে যুক্তরাষ্ট্রের সব পদক্ষেপে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে টার্গেট করা হতো। কিন্তু এবার তারা সরাসরি আদালতকেই নিষিদ্ধ করে বসল, যা এর আগে কখনো করেনি।
কেবল নিজেদের বাঁচানোর জন্য তৈরি নিয়ম
১৯৯৮ সালে রোমে যখন আলোচনা চলছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্র এই স্ট্যাটিউটের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল। তারা চেয়েছিল কাদের বিচার হবে বা কে মামলা করবে সেটার ওপর যেন নিরাপত্তা পরিষদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে, আদালতের স্বয়ংক্রিয় ক্ষমতা যেন না থাকে, আর সদস্য নয় এমন দেশের নাগরিকরা যেন সবসময় সুরক্ষা পায়।
কিন্তু কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার নেতৃত্বে ‘সমমনস্ক’ দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের এই তিনটি দাবিই নাকচ করে দেয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটা আইন নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসে যা তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। এরপর তারা বাইরে থেকে এই আদালতকে বেঁধে রাখার জন্য বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করে।
মার্কো রুবিও যখন ঘোষণা দিলেন- যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে না তো চায় আর না তাদের কোনো প্রয়োজন আছে, তখন বোঝা যায় আদালতটি ঠিক সেভাবেই কাজ করছে যেভাবে এর খসড়াপ্রণেতারা চেয়েছিল।
রোমে নিজেদের পছন্দমতো নিয়ম বসাতে না পেরে ২০০২ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র স্বাক্ষর তুলে নেয় এবং পরবর্তী দুই দশক ধরে নানাভাবে বাধা দিতে থাকে। যেমন- আফগানিস্তান যুদ্ধের তদন্ত বানচালের চেষ্টা করা, ২০২০ সালে প্রসিকিউটর ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া এবং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালতের কর্মীদের বিরুদ্ধে আরও কড়াকড়ি আরোপ করা।
আগে যুক্তরাষ্ট্রের সব পদক্ষেপে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে টার্গেট করা হতো। কিন্তু এবার তারা সরাসরি আদালতকেই নিষিদ্ধ করে বসল, যা এর আগে কখনো করেনি।
আলোচনার ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র রোম স্ট্যাটিউটকে মূলত তিনটি স্তরে ভাগ করে ফেলেছিল।
অনুচ্ছেদ ৯৮-এর আওতায় ১০০টির বেশি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করে যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করেছে যে তাদের নাগরিকদের যেন কেউ আইসিসির হাতে তুলে না দেয়। আবার অনুচ্ছেদ ১৬-এর মাধ্যমে নিরাপত্তা পরিষদে এমন একটা সুবিধা রেখেছে, যাতে চাইলে যেকোনো তদন্ত এক বছরের জন্য ঝুলিয়ে রাখা যায়।
এমনকি ‘আমেরিকান সার্ভিস-মেম্বারস প্রোটেকশন অ্যাক্ট (২০০২)’ অনুযায়ী, আদালত যদি কখনো কোনো আমেরিকানকে ধরে ফেলে, তবে তাকে ছাড়িয়ে আনতে প্রেসিডেন্ট চাইলে সামরিক শক্তিও ব্যবহার করতে পারবেন।
৯ অক্টোবরের নির্বাহী আদেশে আমেরিকান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হলো তারা যেন আইসিসিকে কোনো ধরনের সেবা না দেয়। এর মাধ্যমে আদালতের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন বাণিজ্যিক পরিকাঠামোকেই নিষেধাজ্ঞার হাতিয়ার বানিয়ে ফেলা হলো।
যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য এই স্থগিতকরণের অস্ত্রটি শুরুতেই একবার পরীক্ষা করে দেখেছিল। ২০০২ সালে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে থাকা অ-সদস্য দেশের নাগরিকদের সাধারণ ছাড় দেওয়ার জন্য নিরাপত্তা পরিষদে রেজোলিউশন ১৪২২ পাস করানো হয়েছিল- যা কোনো নির্দিষ্ট মামলার স্থগিতাদেশ ছিল না, বরং আইনবহির্ভূত একটা সাধারণ সুরক্ষা ছিল।
আইনজীবীরা ও বিভিন্ন দেশ তখন এর তীব্র সমালোচনা করে জানিয়েছিল যে, এটি অনুচ্ছেদ ১৬-এর নিয়মের বাইরের বিষয়। ফলে ২০০৩ সালের পর সেই প্রস্তাব আর টিকতে পারেনি।
দেখা গেল, যুক্তরাষ্ট্র নিজের সুবিধার জন্য যে অস্ত্রটি তৈরি করেছিল, তা যখন সত্যি সত্যিই কাজে লাগানোর সময় এল, তখন দেখা গেল সেটি আইনগতভাবে টেকে না।
এরপর ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই নিরাপত্তা পরিষদে মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে আইসিসির হাতে সঁপে দেওয়ার জন্য ১৩(বি) অনুচ্ছেদে ভোট দেয়। অর্থাৎ, নিজে আদালতের বাইরে থেকেও তারা অন্য একটি দেশের নেতৃত্বকে আইসিসির জালে ফেলে দেয়।
নিরাপত্তা পরিষদের ঠিক যে বিধানটিকে তারা নিজেদের সুরক্ষার অস্ত্র বানাতে চেয়েছিল, সেটাই আবার অন্য দেশের সরকারকে হটানোর কাজে আক্রমণাত্মকভাবে ব্যবহার করল।
একই আইনের মধ্যে একদিকে ছিল বাঁচার রাস্তা, অন্যদিকে ছিল অন্যকে ফাঁসানোর অস্ত্র- আর যুক্তরাষ্ট্র যখন যেভাবে চেয়েছে, সেটাই ব্যবহার করেছে।
দুই দশক ধরে এই দ্বিমুখী নীতি এ কারণে টিকে ছিল, কারণ প্রি-ট্রেয়াল চেম্বারের পরোয়ানাগুলো কখনো এমন কোনো সরকারের দরজায় কড়া নাড়েনি যাকে রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই কোমর বেঁধে নেমেছিল।
অবশেষে এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হলো, যা তাদের তৈরি করা কোনো কৌশল দিয়েই আটকানো গেল না। আর তাই বাধ্য হয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আদালতটার ওপরেই নিষেধাজ্ঞা দিল।
এখন এই পুরো লড়াইয়ের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো- যে ১২৪টি দেশ প্রমাণ জোগাড় করে, নানা আবেদন করে এই রায়গুলো ডেকে এনেছে, তারা কি এই চাপের মুখে আদালতকে টিকিয়ে রাখতে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করতে পারবে?
১৯৪৫ সালে রবার্ট জ্যাকসন যখন নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের নিয়ম লিখছিলেন, তখন তিনি লিখেছিলেন যে কোনো পদের আড়ালেই কেউ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করে পার পেতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে তিনি সেই নিয়ম কেবল পরাজিতদের জন্যই প্রযোজ্য করেছিলেন এবং বিজয়ী দেশগুলোর অপরাধকে বিচারের বাইরে রেখেই তথাকথিত সর্বজনীন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
সেই ত্রুটিপূর্ণ ও পক্ষপাতদুষ্ট ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকেই এবার অ-পশ্চিমী স্বাধীন দেশগুলো তাদের আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে এমন এক সীমানায় নিয়ে গেছে, যা এর প্রতিষ্ঠাতারা কখনো কল্পনাও করেননি।
আজ যে আদালত সেই সীমা পার করে ফেলল, তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া- আসলে তাদের নিজেদের তৈরি করা নিয়মেরই এক অনিবার্য পরিণতি।
লেখক: নাসির কাদরি হলেন তুরস্কের কোক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও গবেষক।
অনুবাদ: মনিরুল হক ফিরোজ
