সোশ্যাল মিডিয়া খুললে শুধুই হাহাকারের ছবি। Facebook
Published on
:
3 min read
অমিত চক্রবর্তী
উৎসবে মেতে ওঠার আনন্দ আর স্বজন হারানোর হাহাকার— এই দুইয়ের দূরত্ব যে এতটা কম, শনিবার প্রথম সপ্তমীর সন্ধে তা দেখিয়ে দিল! আনন্দ যেখানে বাঁধভাঙা জনজোয়ারের রূপ নেয়, সেখানে প্রশাসনের হাতে কড়া রাশ না থাকলে কী ভাবে তা আনন্দে মাতোয়ারা পরিবেশকে আস্ত মৃত্যুকূপে পরিণত করতে পারে, তার সাক্ষী থাকল উৎসবের বাংলা। অথচ এই আশঙ্কা তো এই প্রথমবার নয়। বিপদের আঁচ তো আগেই পাওয়া গিয়েছিল। এক দশক আগের ঘটনা। সে সময়ে প্রশাসনকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল বিচারব্যবস্থা। কিন্তু অতীত থেকে কোনও শিক্ষাই কি নেওয়া হয়নি?
মনে আছে ২০১৫-র কথা?
ফিরে যাওয়া যাক ২০১৫ সালের দুর্গাপুজোয়। কলকাতা হাইকোর্টের বেঁধে দেওয়া সুস্পষ্ট নিয়ম অনুযায়ী যেখানে মণ্ডপের সর্বোচ্চ উচ্চতা ৪০ ফুট হওয়ার কথা, সেই আইনকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দক্ষিণ কলকাতার দেশপ্রিয় পার্কে তৈরি হয়েছিল প্রায় ৮৮ ফুট উঁচু সুবিশাল প্রতিমা। সেই সময়ে কলকাতা হাইকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি (বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে কর্মরত) দীপঙ্কর দত্ত এই মেগা-আয়োজন নিয়ে কলকাতা পুরসভা ও পুলিশের ভূমিকায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।
কড়া নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট
২০১৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরের এক মামলার শুনানিতে বিচারপতি অত্যন্ত কড়া নির্দেশ ও হুঁশিয়ারি দেন, যাতে এই অতি-উচ্চতার আয়োজনের জেরে পার্কের পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তায় বিন্দুমাত্র আঁচ না পড়ে। কিন্তু আদালত সতর্ক করলেও টনক নড়েনি উদ্যোক্তাদের । ফলে বিচারপতির সেই আশঙ্কাই নির্মম সত্যে পরিণত হয়েছিল ওই বছরের পঞ্চমী ও মহাষষ্ঠীর দিন।
দেশপ্রিয় পার্কের সেই পুজো
সে বছর ১৮ অক্টোবর প্রবল ভিড়ের চাপে দেশপ্রিয় পার্কে পদপিষ্ট হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়, রক্তাক্ত হন অন্তত ১৫ জন দর্শনার্থী। রাজপথে পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল যে পুলিশের গাড়ি পর্যন্ত এগোতে পারেনি। তৎকালীন পুলিশ কমিশনার সুরজিত কর পুরকায়স্থকে লালবাজার থেকে মেট্রো চেপে কালীঘাট পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নামতে হয়েছিল।
তড়িঘড়ি বন্ধ হয়েছিল পুজো মণ্ডপ
সে বছর আর কোনও ঝুঁকি না নিয়ে জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ তড়িঘড়ি মণ্ডপটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছিল। প্রশাসনের সেই চরম পদক্ষেপের কারণে সে যাত্রায় হয়তো মৃত্যুর মুখ দেখতে হয়নি দুর্গোৎসবকে।
২০১৫ কি কিছুই শেখাতে পারল না?
তবে এক দশক পেরিয়ে ২০২৬ সালে পুজোর কলকাতায় যে ঘটনা ঘটল, এতগুলো মানুষকে প্রাণ দিয়ে যে চরম মূল্য চোকাতে হলো, তার পরে প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ— ২০১৫ সালের সেই শিক্ষা কি মনে ছিল পুলিশ-প্রশাসনের? কেন চোরবাজারে এমন বিপর্যয় ঘটল, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কার দোষ, কারা দায়ী, সে সব নিয়ে ময়নাতদন্ত হবে। তবে কোনও যুক্তিতেই লঘু হবে না একগুলো প্রাণের দাম। কেন এই চরম মূল্য দিতে হলো নিরপরাধ সাধারণ মানুষকে?
বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো
বাংলায় সব থেকে বড় উৎসব দুর্গোৎসব। লক্ষ লক্ষ মানুষ পথে নামেন। বাস, মেট্রো, ট্রেন, শুধুই মানুষের ঠেলাঠেলি। এ রকম একটা ইভেন্টে, ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট কতটা সফল ভাবে হয়েছে বা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন রাজ্যের মানুষই। তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন, অতীতের সেই সতর্কবার্তা ও ট্র্যাজেডির ইতিহাসকে সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে ভিড় টানার অন্ধ অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমেই কি উত্তর কলকাতার চোরবাগান পুজো কমিটি এমন বিপদ ডাকল?
চোরবাগানে কোথায় অব্যবস্থা?
ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে সরু গলির ভিতর তৈরি করা হয়েছিল আলো-আঁধারি পরিবেশের এক গোলকধাঁধা মণ্ডপ। অভিযোগ, সেখানে ছিল না পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক, ছিল না কোনও আপৎকালীন বহির্গমন পথ। তার উপরে সন্ধেয় হঠাৎ বৃষ্টি আগুনে ঘি ঢালে। মাথার উপরে ছাদ খোঁজা আর প্রতিমা দর্শনে মরিয়া হুড়োহুড়িতে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে গোটা ব্যবস্থা। চূড়ান্ত অব্যবস্থা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার বলি হয়ে পদপিষ্টের ঘটনা।
পুজোর আনন্দ গড়াল বিষাদে
পুজোর আনন্দে বাড়ি থেকে বেরিয়ে একসঙ্গে এত মানুষের শবদেহ হয়ে ফেরার ঘটনা বাংলার ইতিহাসে কার্যত নজিরবিহীন। ঘটনার পর পরই তদন্তের আশ্বাস, আর্থিক ক্ষতিপূরণ ঘোষণার চেনা ছবি দেখা গিয়েছে। কিন্তু এত বড় বিপর্যয়ের দায় কার বা কাদের? সে প্রশ্নের জবাবও চাইছে মানুষ।
নিয়ম ভাঙার অসুস্থ উন্মাদনা
একই সঙ্গে প্রশ্ন থেকেই গেল— আদালতের পুরোনো নির্দেশিকা ও অতীত শিক্ষা থাকা সত্ত্বেও কেন এমন মারণফাঁদ তৈরি করতে দেওয়া হলো? যে পরিবারগুলোর উৎসবের আলো চিরতরে নিভে গেল, তাঁদের সেই হাহাকার কি কোনও ক্ষতিপূরণে মিটবে? নিয়ম ভাঙার এই অসুস্থ উন্মাদনা আর যাদের এই বিষয়গুলি দেখার কথা, সেই আয়োজকদের নির্লজ্জ উদাসীনতার বলি কেন হতে হবে সাধারণ মানুষকে? —আজ স্তব্ধ হয়ে এই নির্মম প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছে গোটা বাংলা।
এখনও পর্যন্ত কারা গ্রেপ্তার?
এই ঘটনায় চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতির সেক্রেটারি রাজকুমার সেওদা, ভাইস প্রেসিডেন্ট শান্তনু দুবে, প্যান্ডেলে বাঁশের কাঠামো তৈরিতে যুক্ত ছিলেন যিনি, সেই বিপ্লব মুখোপাধ্যায়, ক্রাউড কন্ট্রোল ও ভিআইপি পাস চেকের দায়িত্বে ছিলেন যিনি, সেই কৌশিক সাহা, ক্রাউড কন্ট্রোলে থাকা পিন্টু দে, প্রাইভেট সিকিউরিটি ইনচার্জ সুমন চক্রবর্তী ও রাজেশ পালকে ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।