Published on
:
2 min read
মহম্মদ মহসিন জগৎবল্লভপুর
‘এক এক্কে এক, দুই এক্কে দুই, নামতা পড়ে ছেলেরা সব পাঠশালার ওই ঘরে, নন্দী বাড়ির আটচালাতে কুমোর ঠাকুর গড়ে’... শৈশবের পুজোর নস্টালজিয়া উস্কে দেওয়া সনৎ সিংহের সেই গান! বাস্তব হলো, একটা সময়ে জগৎবল্লভপুরের পণ্ডিত পল্লি, পরবর্তীকালে নবাসন নন্দী বাড়ির দুর্গাপুজো ঘিরেই লেখা এই কালজয়ী গান! এখনও রয়েছে নন্দী বাড়ির সেই আটচালা, ঠাকুর দালান। কুমোর এখনও আটচালায় বসে ঠাকুর গড়েন। তবে আটচালার সেই পাঠশালা আর নেই। সেটি সরে গিয়েছে নন্দী বাড়ির অনতিদূরে। পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে, সঙ্গীতশিল্পী সনৎ সিংহ কোনও এক সময়ে এই পুজো দেখতে এসে এই কালজয়ী গানের সৃষ্টি করেন। এ হেন নন্দী বাড়ির দুর্গাপুজো নয় নয় করে এবার ২৮৫ বছরে পদার্পণ করল।
প্রাচীন এই পারিবারিক পুজোর সঙ্গে একটি প্রাথমিক স্কুলের পড়ুয়াদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে ওই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র, বর্তমানের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক গোপীকান্ত মেথুর বলেন, ‘১৯৬৩ সালে জগৎবল্লভপুর থানার নবাসন প্রাথমিক বিদ্যালয় অনুমোদন পায়। অনুমোদন পেলেও, স্কুলের নিজস্ব কোনও ভবন না থাকায়, তখন বিশাল জায়গাজুড়ে নন্দী বাড়ির ঠাকুরদালানে এই স্কুল চলত। প্রায় পাঁচ বছর স্কুল চলার পরে সেটি নিজস্ব ভবনে চলে যায়। তবে যখন ঠাকুরদালানে স্কুল চলত, সেই সময়ে শরৎকালে নন্দী বাড়ির চাতালে দুর্গাপ্রতিমার কাঠামো তৈরি থেকে ঠাকুরগড়া পর্যন্ত সব কিছুই প্রত্যক্ষ করতেন তদানীন্তন কচিকাঁচা পড়ুয়ারা। তাদের মনের কথাই সনৎ সিংহের গানে অমরত্ব পেয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। হাওড়া গ্রামীণের প্রাচীন পারিবারিক দুর্গাপুজোগুলোর মধ্যে জগৎবল্লভপুরে মুন্সিরহাটের কাছে নবাসন গ্রামে নন্দী বাড়ির দুর্গাপুজো অন্যতম। গ্রামীণ পরিবেশে, দিঘির পাশে চারিদিকে পাঁচিল দিয়ে ঘেরা একটি স্থায়ী মন্দির। এই মন্দিরের মূল ফটকের দু’পাশের একদিকে বেলগাছ, অন্য পাশে বটগাছ। মন্দিরের ভিতরেই দুর্গাপ্রতিমা তৈরি এবং পুজো হয়। বাইরে প্রশস্ত দালান। নীচে বড় আটচালা, যেখানে একটি নির্দিষ্ট জায়গা করা আছে। পুজো কমিটির সহকারী সম্পাদিকা, ওই পরিবারের সদস্যা অপর্ণা নন্দী জানান, পুজোর দিনগুলোতে পুজো শুরুর আগে ঠাকুরমশাই দণ্ডি কেটে পুজো শুরু করেন। পরিবারের অন্য এক সদস্য অরূপ নন্দী জানান, নবাসনের নন্দী বাড়ির পারিবারিক দুর্গাপুজো শুরু হয় ১৭৪২ সালে। পরিবারের পূর্বপুরুষ তথা সেই তৎকালীন বর্ধমান মহারাজের দেওয়ান ছিলেন প্রয়াত সন্তোষনারায়ণ নন্দী। অপর্ণা নন্দী জানান, বর্ধমান মহারাজ সন্তোষনারায়ণ নন্দীকে এই এলাকায় প্রায় ১০০ বিঘে সম্পত্তি দান করেছিলেন। সেই জায়গায় সন্তোষনারায়ণ বিভিন্ন কাজে সহযোগিতার জন্য ব্রাহ্মণ, বর্গক্ষত্রিয়, দুলে, রজক, গোয়ালা, কুমোর, তাঁতি, মালাকার— এই আট ও নিজেরা (কায়স্থ), সব মিলিয়ে মোট ন’টি সম্প্রায়ভুক্ত জনগোষ্ঠীর জন্য নবরূপে আসন পাতেন। তাই ‘পণ্ডিত পল্লি’র নতুন নামকরণ হয় নবাসন।
অপর্ণা জানান, উল্টো রথের পরের দিন কাঠামো পুজো দিয়ে শুরু হয় এই দুর্গাপুজোর কাজ। প্রচলিত দুর্গামূর্তির থেকে এই মূর্তি কিঞ্চিৎ স্বতন্ত্র। দেবী দুর্গার দু’দিকে লক্ষ্মী, সরস্বতীর পরিবর্তে থাকে গণেশ ও কার্তিকের মূর্তি। অর্থাৎ দেবী দুর্গার ডানদিকে থাকে প্রথমে গণেশ, পরে লক্ষ্মী। আর বাম দিকে থাকে প্রথমে কার্তিক, পরে সরস্বতী। তার পরে থাকে দুর্গার দুই সখী, একদিকে জয়া, অন্য দিকে বিজয়ার মূর্তি। বৈষ্ণব মতে পূজার্চনা ও নিরামিষ বলিদান করা হয়। যেমন চালকুমড়া, আখ, বাতাবি লেবু, গোটা গাছ–সহ আদা, হলুদ ইত্যাদি। এই পুজোর বিশেষত্ব হলো, পুজোর দিনগুলোতে কোনও মাইক্রোফোন বাজে না। নন্দী পরিবারের লোকজন সবাই একত্রিত হন।
