শাশুড়ির কাছে যা পারিবারিক রীতি, পুত্রবধূর কাছে তা মনে হতে পারে ব্যক্তিস্বাধীনতার পথে বাধা। অনেক সময় মতবিরোধের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে সেই মত প্রকাশের ধরন এবং পরস্পরের অবস্থান বোঝার অনীহা।
নারীদের আড্ডায় সংসার, সন্তান, স্বামী কিংবা আত্মীয়স্বজনের কথা বলতে বলতে একসময় চলে আসে শাশুড়ির প্রসঙ্গ। শাশুড়ি-পুত্রবধূর সম্পর্ক নিয়ে এমন আড্ডায় অভিজ্ঞতা, অভিযোগ আর হাসি-ঠাট্টার যেন শেষ নেই। বাংলাদেশের পারিবারিক জীবনে পরিচিত এ সম্পর্কের সমীকরণ তৈরি হয় বিয়ের পর নতুন পরিবারে মানিয়ে নেয়া, সংসারের নিয়মকানুন, সন্তান লালন-পালন ও পারিবারিক সিদ্ধান্ত ঘিরে। নাটক-সিনেমা থেকে শুরু করে লোকমুখের গল্পেও এ সম্পর্কের দ্বন্দ্বের চিত্র দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। তবে সময়ের সঙ্গে পরিবারের কাঠামো, নারীর ভূমিকা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণা বদলানোর পাশাপাশি শাশুড়ি-পুত্রবধূর সম্পর্কের সেই চেনা ছকও কি ভাঙছে?
আজকের ‘শাশুড়ি দিবস’ বা ‘মাদার্স-ইন-ল ডে’ এ সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবার উপলক্ষ হতে পারে। সময়ের সঙ্গে যৌথ পরিবারের কাঠামো, নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থান এবং ব্যক্তিগত পরিসরের গুরুত্বে পরিবর্তন এসেছে। এর প্রভাব পড়ছে পারিবারিক সম্পর্কের ধরনেও। তবে সব পরিবারে পরিবর্তনের চিত্র এক নয়। কোথাও শাশুড়ি ও পুত্রবধূ একে অন্যের সহযোগী হয়ে উঠছেন, আবার কোথাও পুরোনো প্রত্যাশা ও প্রজন্মগত পার্থক্য থেকে তৈরি হচ্ছে দূরত্ব।
একসময় অনেক পরিবারে নতুন বউকে শ্বশুরবাড়ির নিয়মকানুন ও প্রত্যাশার সঙ্গে মানিয়ে চলতে হতো। রান্নাবান্না, ঘরের কাজ থেকে শুরু করে পারিবারিক সিদ্ধান্ত—বিভিন্ন ক্ষেত্রে শাশুড়ির অভিজ্ঞতা ও মতামত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। সে অভিজ্ঞতা কখনো নতুন বউয়ের জন্য সহায়ক হতো, আবার কখনো তা হয়ে উঠত নিয়ন্ত্রণের উৎস। পুত্রবধূর নিজস্ব পছন্দ ও স্বাধীনতার সঙ্গে পারিবারিক প্রত্যাশার সংঘাতও তৈরি করত টানাপোড়েন।
বর্তমানে অনেক পরিবারে এ সমীকরণে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে কর্মজীবী নারীর জীবনে শাশুড়ির সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সন্তানের দেখাশোনা, জরুরি সময়ে পাশে থাকা কিংবা ঘরের কাজ ভাগ করে নেয়ার মধ্য দিয়ে শাশুড়ি হয়ে উঠছেন পরিবারের নির্ভরতার জায়গা। একইভাবে বয়সজনিত অসুস্থতা বা দৈনন্দিন প্রয়োজনে পুত্রবধূর যত্নও সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করে তুলতে পারে। পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে কোথাও কোথাও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছাড়িয়ে তৈরি হচ্ছে বন্ধুত্বের বন্ধন।
তবে পরিবর্তন মানেই দ্বন্দ্বের অবসান নয়। পোশাক, অতিথি আপ্যায়ন, সন্তান লালন-পালন কিংবা অর্থ ব্যয়ের মতো বিষয়ে দুই প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য রয়েই গেছে। শাশুড়ির কাছে যা পারিবারিক রীতি, পুত্রবধূর কাছে তা মনে হতে পারে ব্যক্তিস্বাধীনতার পথে বাধা। অনেক সময় মতবিরোধের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে সেই মত প্রকাশের ধরন এবং পরস্পরের অবস্থান বোঝার অনীহা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যোগাযোগের অভাব কিংবা মা ও স্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ সামলাতে ছেলের নিষ্ক্রিয় ভূমিকাও দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়।
শাশুড়ি-পুত্রবধূর সম্পর্কের পরিবর্তন মানেই সব দ্বন্দ্বের অবসান নয়। বরং মতের অমিলের মধ্যেও একে অন্যের অবস্থান বোঝা, ব্যক্তিগত পরিসরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নেয়ার সুযোগ তৈরি হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। একটি দিনের শুভেচ্ছা বা উপহার সম্পর্কের সব জটিলতা মিটিয়ে দিতে পারে না। তবে শাশুড়ি দিবস মনে করিয়ে দেয়, পারিবারিক সম্পর্কের দৃঢ়তা শুধু আত্মীয়তার পরিচয়ে নয়, পারস্পরিক সম্মান, বোঝাপড়া ও যত্নের মধ্য দিয়েও তৈরি হয়।
