ফুটপাত দখলের প্রতিযোগিতায় সংকুচিত হচ্ছে নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। ফুটপাত দখলের কারণে বাধ্য হয়ে পথচারীদের সড়কের ওপর দিয়েই চলাচল করতে হয়। ফলে প্রতিদিন ছোটোখাটো দুর্ঘটনার ঘটে। নির্বিঘ্নে চলাচল ও দুর্ঘটনা এড়াতে ফুটপাত তৈরি করা হলেও এখন এটি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নগরের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের দু’পাশের অংশ হকারদের দখলে রয়েছে। তারা সেখানে ফলের দোকান, কাপড়ের দোকান, স্যান্ডেলের দোকান, ক্রোকারিজের দোকান, সাইকেল প্রদর্শনী, চুড়ি-ফিতা, বিভিন্ন প্রসাধনীসহ নানা ধরনের পসরা নিয়ে বসেছে।
নগরীর ডাকবাংলা মোড় থেকে ক্লে রোড, কেডি ঘোষ রোড, হেলাতলা রোড, কালিবাড়ি রোড, পাওয়ার হাউজ মোড়, স্টেশন রোড়ের ফুটপাতগুলো রয়েছে হকারদের দখলে। এছাড়া, নগরের খানজাহান আলী সড়কের ফুটপাতগুলোতে মোটরসাইকেল গ্যারেজ এবং রাস্তার ওপর ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপ নিয়ে বসা অবৈধ দখলদারদের কারণে দু’পাশে ফুটপাত থাকলেও তা পথচারীদের চলাচলের সুযোগ কমে গেছে। ফলে ওই সমস্ত জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কের তীব্র যানজটে নগরবাসীর ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। অনেকের অভিযোগ, ফুটপাতকে পথচারীদের হাঁটার উপযোগী করে তুলতে সিটি কর্পোরেশনের কারও কোনো মাথা ব্যথা নেই।
কেডি ঘোষ সড়কের ওপর ভ্যান নিয়ে থাকা কয়েকজন ফলের ব্যবসায়ীর সাথে কথা হলে তারা বলেন, ৫ আগস্টের আগে আমরা প্রতিদিন পুলিশ ও সিটি কর্পোরেশন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দৈনিক ৫০ টাকা চাঁদা দিতাম। কিন্তু ৫ আগস্টের পর চাঁদার বিষয়টি বন্ধ হয়ে যায়। সম্প্রতি খুলনা মহানগর হকার্স ইউনিয়নের উন্নয়ন তহবিলে ২০ টাকা করে প্রতিদিন চাঁদা দিতে হয়। বিষয়টি দু একজন বললেও অনেকেই চাঁদার বিষয়টি এড়িয়ে যান।
বানিয়াখামার এলাকার সাকিব শেখ বলেন, ডাকবাংলো মোড় থেকে বড় বাজারের দূরত্ব ৫ মিনিটের কিন্তু এখান থেকে যেতে প্রায় ২০ মিনিট সময় লাগে। তাছাড়া এ রাস্তা দিয়ে মহিলাদের হেঁটে যাওয়া খুব কষ্টকর।
টুটপাড়া কবরখানা এলাকার সোহাগ শেখ বলেন, ফুটপাতগুলো মানুষের হাঁটার জন্য তৈরি করা হলেও সেগুলো দখল রেখেছে অবৈধ দখলদার ও হকাররা। অনেক সময় তাদের পসরা সাজিয়ে রাখার কারণে সেখান থেকে হাঁটা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।
বড়বাজারের পথচারী হাসানুজ্জামান বলেন, দেখুন এই মার্কেটের সবকিছু এক জায়গায় থাকায় এখানে মানুষের চলাচল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। গরমে যাতায়াত করা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এখানে যে যানজট হয় তাতে চলাচল করা সত্যিই খুব অশান্তির। ফুটপাত দখলে তো আছেই, সঙ্গে রাস্তাও অনেকটা দখল হয়ে গেছে। একমাত্র সরকারের সচেতন ও সাবক্ষণিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই এর থেকে উত্তরণের কোনো উপায় আমি দেখতে পাচ্ছি।
স্যার ইকবাল রোডের ব্যবসায়ী তৌহিদুল শিকদার বলেন, পথচারীদের জন্য চাই উন্মুক্ত ফুটপাত। নিরাপদভাবে চলতে চাই।
পথচারী রুহুল আমিন বলেন, দখলদারদের কারণে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলো সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে যানজটের মতো সমস্যা লেগে থাকে। ফুটপাত দিয়ে চলাচল করতে না পেরে মাঝে মাঝে সাধারণ নাগরিক রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব এ্যাড. বাবুল হাওলাদার বলেন, ফুটপাত দখলের প্রবণতা অনেক পুরাতন। মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে খুলনার সড়ক, ড্রেন সংস্কার এবং সেই সাথে ফুটপাত নির্মাণ করা হয়েছে। যদিও সেই ফুটপাতের মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। তারপরও ফুটপাথ নির্মাণ হয়েছে, সেটা আশীর্বাদ নগরের সাধারণ মানুষের জন্য। দু:খ জনক হলেও সত্য, ফুটপাত মানুষের হাঁটার কাজে আসছে না। বাজার এলাকাগুলো বিশেষ করে শপিং মহলগুলোর সামনে, সেখানে হকাররা ফুটপাত ছাপিয়ে রাস্তায় চলে আসে। তারা পসরা সাজিয়ে বসেন। এতে রাস্তা সংকুচিত হয়ে যায়। ফলে মানুষের চলাচলে বিঘ্ন হচ্ছে। এর কারণে অনেক সময় ছোটোখাটো দুর্ঘটনাও ঘটছে। কোনো সভ্য দেশে এমনটি কল্পনা করা কঠিন। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে দ্রুত কেসিসি এবং কেএমপিকে সমন্বয় করে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে হবে।
কেএমপি ট্রাফিক বিভাগের প্রধান উপ-পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, নগরীর ফুটপাত ও সড়কের ওপর অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে অভিযান চলমান কার্যক্রম। উচ্ছেদ কার্যক্রম সম্পন্ন করার কিছুক্ষণ পরই আবার একই চিত্র দেখা যায়। তিনি ঢাকার উদাহরণ দিয়ে বলেন, এ ব্যাপারে যদি কেসিসি’র প্রশাসক উদ্যোগ নেন তাহলে একটি ফলপ্রসূ ফলাফল নগরবাসী দেখতে পাবেন।
কেসিসি’র সম্পত্তি শাখার কর্মকর্তা গাজী সালাউদ্দিন বলেন, ফুটপাত উচ্ছেদ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রায় উচ্ছেদ করা হয়। পূর্বেও আমরা করেছি। ফুটপাত দখলমুক্ত করতে আলোচনা চলছে। সিদ্ধান্ত আসলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, নগরীর যানজট নিরাসন ও পথচারীদের স্বাভাবিক চলাচলের জন্য ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করার জন্য বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামি ১৩ অক্টোবর সাধারণ সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
খুলনা গেজেট/এনএম
