আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারত কোনও মার্কিন চাপে পড়ে নয়, বরং সম্পূর্ণ নিজেদের জাতীয় স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই অপরিশোধিত তেল আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনছে—এমনটাই স্পষ্ট করলেন মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও। তিন দিনের ভারত সফরে এসে ইন্ডিয়া টুডেকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, জ্বালানির জন্য কোনও একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা যেকোনও রাষ্ট্রের পক্ষেই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, কারণ এতে আকস্মিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা থাকে। আর সেই ঝুঁকি এড়াতেই ভারত অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে তাদের জ্বালানি পোর্টফোলিওকে আরও বিস্তৃত করেছে। কোনও হুমকি বা চাপের কারণে নয়, ভারতের এই পদক্ষেপ তাদের নিজস্ব অগ্রগতিরই প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রুবিওর এই বক্তব্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ রাশিয়া থেকে ভারতের সস্তায় অপরিশোধিত তেল কেনা নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটা কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছিল। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে পরিস্থিতি বেশ তিক্ত রূপ নেয়। মস্কো যাতে ইউক্রেন যুদ্ধের তহবিল জোগাড় করতে না পারে, সেই যুক্তি দেখিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন গত বছর ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দেয়, যার ফলে মোট শুল্ক গিয়ে ঠেকেছিল ৫০ শতাংশে। এমনকি ট্রাম্পের তৎকালীন উপদেষ্টা পিটার নাভারো ভারতকে ক্রেমলিনের জন্য ‘টাকা সাদা করার যন্ত্র’ বলেও কটাক্ষ করেছিলেন। যদিও এই বছরের শুরুর দিকেই সেই বাড়তি শুল্ক প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।
আমেরিকার সঙ্গে এই টানাপোড়েনের মধ্যেই ভারত নিঃশব্দে তাদের জ্বালানি কৌশলে রদবদল এনেছে। এখনো পর্যন্ত ভারতের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহকারী দেশ রাশিয়া হলেও সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে বড়সড় পরিবর্তনের ছবি স্পষ্ট। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের মোট তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশীদারিত্ব ৪৬.৬ শতাংশ থেকে কমে নেমে এসেছে ৩৩.৫ শতাংশে। বদলে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে তেল আমদানি। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী জানান, ভারত তাদের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনের ৮০ শতাংশেরও বেশি তেল বিদেশ থেকে আমদানি করে এবং সেই জোগান নিশ্চিত করতে সরবরাহকারী দেশের সংখ্যা ২৭ থেকে বাড়িয়ে ৪১-এ নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
নয়াদিল্লি শুরু থেকেই স্পষ্ট করে এসেছে যে, দেশের কোটি কোটি মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে ও নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বালানি পৌঁছে দেওয়াটাই ভারতের একমাত্র অগ্রাধিকার। আর মার্কো রুবিও-র সাম্প্রতিক মন্তব্যও যেন ভারতের সেই অবস্থানেরই প্রতিধ্বনি। তাঁর মতে, বিষয়টিকে কেবল ‘রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমানো’ হিসেবে দেখা ঠিক নয়; বরং আমেরিকা, ভেনেজুয়েলা কিংবা পশ্চিম গোলার্ধের অন্যান্য দেশ থেকে তেল কেনা ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থেই জরুরি। আর ভারত যাতে সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারে, ওয়াশিংটন তাতে পূর্ণ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও জানান মার্কিন বিদেশসচিব।
