মোস্তাফিজুর রহমান:
সমবায় অধিদপ্তরের অতিরিক্ত নিবন্ধক (অডিট ও আইন) মো. নবীরুল ইসলামকে ঘিরে দুর্নীতি, জালিয়াতি, ঘুষ গ্রহণ, পদায়ন-বাণিজ্য, অবৈধ সমিতির নিবন্ধন, অর্থ আত্মসাৎ ও শারীরিক নির্যাতনের একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এসব অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও প্রভাব ও ক্ষমতার কারণে বারবার পার পেয়ে গেছেন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বিভাগীয় তদন্ত, কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং মামলা হওয়ার তথ্যও রয়েছে।
মাগুরা জেলার লক্ষীকোল গ্রামের বাসিন্দা ও মৃত মো. সহিদুল ইসলামের ছেলে নবীরুল ইসলাম ২০তম বিসিএসের মাধ্যমে সমবায় ক্যাডারে সহকারী নিবন্ধক হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, বাবার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নিয়েছিলেন তিনি। এ ছাড়া বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া, সনদ যাচাই এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ শুধু চাকরিতে প্রবেশের সময়েই সীমাবদ্ধ ছিল না। ঢাকা জেলা সমবায় কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন, সমিতির নিবন্ধন, ব্যাংকের অন্তর্বর্তী কমিটি গঠন, সমবায় প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি বিক্রি এবং বিভিন্ন পদে পদায়ন—এসব ক্ষেত্রেও তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
বিসিএসে জালিয়াতি ও মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে প্রশ্ন
২০তম বিসিএস পরীক্ষার আগে নবীরুল ইসলাম বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনে (বিপিএসসি) জুনিয়র গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সে সময় বিপিএসসির তৎকালীন সদস্য মাহফুজুর রহমানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিপিএসসির তৎকালীন ওই সদস্যকে বড় অঙ্কের ঘুষ দিয়ে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন নবীরুল ইসলাম। একই সঙ্গে তাঁর বাবার মুক্তিযোদ্ধা সনদ যাচাইয়ের সময় সনদটি সঠিক হিসেবে গ্রহণ করিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এ ঘটনায় ২০০১ সালের ১১ ডিসেম্বর ঢাকার কাফরুল থানায় ২৪ নম্বর মামলা দায়ের করা হয়। তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরো মামলাটি তদন্ত করছিল।
ব্যুরোর ইন্সপেক্টর এস এম আকতার হামিদ ভূঁঞা ২০০১ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেন। ২০০২ সালের ৫ জানুয়ারি জিজ্ঞাসাবাদ ও সাক্ষ্য প্রদানের জন্য তাঁকে ব্যুরোর প্রধান কার্যালয়ে হাজির হতে তলব করা হয়। তখন তিনি মাদারীপুরের জেলা সমবায় কর্মকর্তা ছিলেন।
তবে অভিযোগ রয়েছে, তদন্তকারী কর্মকর্তা ঘুষের বিনিময়ে নবীরুল ইসলামের পক্ষে মিথ্যা ও সাজানো প্রতিবেদন দেন। বিপিএসসিতে কর্মরত থাকাকালে বিসিএস পরীক্ষার্থীদের পাস করানোর নামে তিন লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। এ অভিযোগের তদন্তে ২০০২ সালের ২ জুলাই দুর্নীতি দমন ব্যুরোর তৎকালীন উপপরিচালক শামছুল নাহার তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেন।
মামলা প্রত্যাহার ও অব্যাহতি নিয়ে বিতর্ক
কাফরুল থানার মামলাটি পরবর্তী সময়ে ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে বিশেষ মামলা নম্বর ৬৯/২০০২ হিসেবে বিচারাধীন ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সচিব খন্দকার শহীদুল ইসলামের প্রভাবে এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক শফিউর রহমানের স্বাক্ষরিত একটি গোপন চিঠির মাধ্যমে রাষ্ট্রপক্ষকে মামলাটি প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের তৎকালীন বিচারক রেজাউল করিম খান (চুন্নু) নবীরুল ইসলামকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেন। অভিযোগকারীরা এ অব্যাহতির পেছনে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তবে মামলার প্রত্যাহার, আদালতের আদেশ ও অব্যাহতির প্রকৃত কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট বিচারিক নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন।
লাভজনক পদায়নে ঘুষ, সমিতি নিবন্ধনে বাণিজ্যের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা জেলা সমবায় কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন পেতে সমবায় মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মতিউর রহমানকে তিন লাখ টাকা ঘুষ দেন নবীরুল ইসলাম। অথচ ওই পদে যোগ্য প্রার্থী হিসেবে সাইফুল ইসলামের নাম উল্লেখ করে সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধক আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
ঢাকা জেলা সমবায় কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নবীরুল ইসলাম ঘুষ ও দুর্নীতির একটি চক্র গড়ে তোলেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি। প্রতিদিন সকালে মিরপুরের বাসা থেকে অফিসে যাওয়ার পথে মিরপুর ও আশপাশের এলাকার বিভিন্ন সমবায় সমিতি পরিদর্শন করতেন তিনি। তাঁর অধীনস্থ টেকনিক্যাল কো-অপারেশন অফিসার (টিসিও), সহকারী পরিদর্শক ও পরিদর্শকদের মাধ্যমে সমিতিগুলো থেকে ‘পরিদর্শন ফি’ নামে অবৈধ অর্থ আদায় করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, অফিসে এসে প্রতিদিন পরিকল্পিতভাবে ২০ থেকে ২৫টি সমিতির নিবন্ধন অনুমোদন করতেন তিনি। থানা ও মহানগরভিত্তিক সমিতির নিবন্ধনের বিনিময়ে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি সমিতিগুলোকে বেআইনিভাবে ক্ষুদ্রঋণের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ এবং নতুন শাখা খোলার অনুমতি দেওয়ার বিনিময়ে প্রতি শাখার জন্য লাখ টাকা করে আদায় করা হতো বলে দাবি করা হয়েছে।
৭–৮ মাসে কোটি টাকা আয়ের অভিযোগ
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, ঢাকা জেলা সমবায় কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মাত্র সাত থেকে আট মাসে প্রায় এক কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জন করেন নবীরুল ইসলাম।
এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি সমবায় সমিতির অবৈধ নিবন্ধনের মাধ্যমে ৪৫ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া মিরপুরের বহুমুখী ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বেআইনি অ্যাডহক কমিটি গঠনের উদ্দেশ্যে রব ও দেলোয়ার নামের দুই ব্যক্তির কাছ থেকে নর্দান রিয়েল এস্টেট কোম্পানির মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
সমবায় ব্যাংকের জমি বিক্রি, বিভাগীয় মামলা
২০১১ সালে সিরাজগঞ্জে উপনিবন্ধকের দায়িত্ব পালনকালে সিরাজগঞ্জ কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের ছয় শতক জমি অবৈধভাবে বিক্রির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, জমি বিক্রির অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে নবীরুল ইসলাম ও তৎকালীন আরেক কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। এ ঘটনায় তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও হয়।
তবে অভিযোগকারীদের দাবি, বিভাগীয় মামলার বিষয়টি গোপন রেখে নবীরুল ইসলাম পদোন্নতি নেন। এ অভিযোগের সত্যতা ও পদোন্নতির প্রক্রিয়া যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ৫৭ লাখ টাকা উত্তোলন ঘিরে অভিযোগ
‘দি ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ (ব্যাংক) লিমিটেড’-এর চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন (অব.) আবু জাফরের অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়া এবং তাঁর অবৈধ কমিটিকে সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে নবীরুল ইসলাম ২০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ট্রাস্ট ব্যাংকে পরিচালিত মার্কেন্টাইল ব্যাংকের হিসাব থেকে ৫৭ লাখ টাকা উত্তোলনের সুযোগ করে দিতে তিনি ১০ থেকে ১২ দিন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিলম্ব করেন। পরে একটি নামমাত্র অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, ওই বিলম্বের সুযোগে সাবেক চেয়ারম্যান আবু জাফর ব্যাংক থেকে ৫৭ লাখ টাকা উত্তোলন করেন এবং এর মধ্যে ২০ লাখ টাকা নবীরুল ইসলামকে ঘুষ দেন। বিষয়টি সমবায় অধিদপ্তরের যুগ্ম নিবন্ধক নজীর আহমেদের তদন্ত প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া মোহাম্মদপুর পি.সি. কালচার হাউজিং সোসাইটির ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনে হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে সাবেক চেয়ারম্যান কুদ্দুসের ছেলের কাছ থেকে নবীরুল ইসলাম তাঁর স্ত্রীর নামে তিন কাঠার একটি মূল্যবান প্লট নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
‘যুবক’-এর কার্যক্রম সচল রাখতে ভুয়া সমিতি নিবন্ধনের অভিযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত ‘যুবক’ নামের প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সচল রাখতে নবীরুল ইসলাম ভুয়া সমিতির নিবন্ধন দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিটি ভুয়া সমিতির বিপরীতে লাখ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে মাত্র তিন মাসে প্রায় ১৫০টি সমিতির নিবন্ধন দেওয়া হয়। এসব নিবন্ধনের মাধ্যমে ‘যুবক’ সাধারণ মানুষের সঙ্গে কোটি কোটি টাকার প্রতারণা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘প্রতি মাসে দুই লাখ টাকা খরচ করতে হয়’
নবীরুল ইসলামের সঙ্গে তৎকালীন সময়ে চাকরি করা একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, তিনি সচিবালয় থেকে ফিরে সহকর্মী ও সমবায়ীদের সামনে প্রকাশ্যেই নিজের অর্থ ব্যয়ের কথা বলতেন।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, নবীরুল ইসলাম বলতেন, ‘আর কত পারা যায়! প্রতি মাসে ২ লাখ টাকা খরচ করতে হয় এবং রেজিস্টার অফিসে ১ লাখ টাকা খরচ করতে হয়। আমাকে তো এই টাকা আয় করতেই হবে। তা ছাড়া নিজের চাকরি টিকিয়ে রাখা এবং লাভজনক পোস্টিং নেওয়ার খরচও তো তুলতে হবে।’
উদ্ধৃত বক্তব্যের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে অভিযোগকারীরা এটিকে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ ও পদায়ন-বাণিজ্যের অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দাবি করেছেন।
তদন্ত প্রতিবেদনেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ
নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে একাধিক কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তৎকালীন সচিবের সঙ্গে ভাগ-বাটোয়ারার সম্পর্কের কারণে অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেননি।
অভিযোগ অনুযায়ী, নবীরুল ইসলামের ইশারা ও সাবেক সচিবের নির্দেশে অধিদপ্তরের সৎ কর্মকর্তা ও যুগ্ম নিবন্ধক মো. আবুল হোসেনকে দায়িত্বপ্রাপ্ত শাখা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
সমবায় অধিদপ্তরের যুগ্ম নিবন্ধক নজীর আহমেদ এবং অতিরিক্ত নিবন্ধকের তদন্ত প্রতিবেদনে নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তবে এসব প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, প্রমাণের ধরন এবং পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ, প্রত্যাহারের সুপারিশ
অর্থনৈতিক দুর্নীতির পাশাপাশি নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতন ও অমানবিক আচরণের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৪টার মধ্যে সমবায় ভবনের প্রধান গেটের বাইরে উত্তর পাশের সীমানাপ্রাচীরের কাছে ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংকের একজন পরিচালককে নিজ হাতে ও সহযোগীদের নিয়ে মারধর করেন তিনি।
এ ঘটনায় সমবায় অধিদপ্তরের তৎকালীন অতিরিক্ত নিবন্ধক কায়সারুল আলমের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দেয়। স্মারক নম্বর ৫০/০৭ শি:/২৯২শি:, তারিখ ১৯ ডিসেম্বর ২০০৭-এর ওই প্রতিবেদনে নবীরুল ইসলাম, জেলা অডিটর নজিবুল ইসলাম, সহকারী পরিদর্শক নুরুল ইসলাম ভূঁইয়া ও গাড়িচালক হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে নবীরুল ইসলামকে ঢাকা জেলার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য অনুপযুক্ত, পক্ষপাতদুষ্ট, হিংস্র ও অমানবিক চরিত্রের অধিকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। তাঁকে অবিলম্বে পদ থেকে প্রত্যাহার, বিভাগীয় মামলা এবং কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছিল।
একইভাবে যুগ্ম নিবন্ধক নজীর আহমেদের তদন্ত প্রতিবেদনে মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংকের অন্তর্বর্তী কমিটি গঠনে বিলম্ব ও অদক্ষতার অভিযোগে নবীরুল ইসলাম এবং তাঁর সহযোগী কর্মকর্তা উপসহকারী নিবন্ধক সাদেকুর রহমান সরকার, পরিদর্শক নূর মোহাম্মদ খান ও রমনা থানা সমবায় কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার সুপারিশ ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিনেও এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি।
রাজশাহীতে বন্ধকী জমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ
২০১২ সালে রাজশাহীর বিভাগীয় দপ্তরে দায়িত্ব পালনকালে বন্ধকী জমির ওপর অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দিয়ে সরকার ও সমবায়ের বিপুল সম্পদ বেহাতের পথ তৈরি করেন নবীরুল ইসলাম বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, পরের বছর তৎকালীন বিভাগীয় যুগ্ম নিবন্ধক এ কাজে বাধা দিলে তাঁকেও নবীরুল ইসলাম লাঞ্ছিত করেন। এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি ও তদন্তের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
২০২৬ সালে সমবায় অধিদপ্তরে হামলার অভিযোগ
নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে নতুন করে গুরুতর অভিযোগ ওঠে ২০২৬ সালের ১৯ আগস্ট। অভিযোগ অনুযায়ী, আগারগাঁওয়ের সমবায় অধিদপ্তরের কার্যালয়ের রিসিপশন ও প্রবেশগেটের সামনে হামলার ঘটনা ঘটে।
দীর্ঘ ১৬ বছর কোনো সাধারণ সভা বা নির্বাচন না হওয়া ‘কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি অ্যাপার্টমেন্ট মালিক সমবায় সমিতি লিমিটেড’ (নিবন্ধন নম্বর ৩৪২/২০০০)-এর নবনির্বাচিত কমিটির সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম সজীব তাঁর কমিটির নথিপত্র জমা দিতে অধিদপ্তরে গেলে হামলার শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, অতিরিক্ত নিবন্ধক নবীরুল ইসলামের সরাসরি উসকানি ও নেতৃত্বে তাঁর সহযোগী ফাতেমা আমিন, আজিজুল হক জাকির এবং অধিদপ্তরের অফিস সহকারী সেলিমসহ ১৫ থেকে ২০ জন লাঠিসোঁটা ও রড নিয়ে সাইফুল ইসলাম সজীব ও তাঁর সহযোগীদের অবরুদ্ধ করে মারধর করেন। এতে তাঁরা গুরুতর আহত হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
হামলাকারীরা বাদীর পকেট থেকে নগদ অর্থ ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় সাইফুল ইসলাম সজীব বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। মামলায় অতিরিক্ত নিবন্ধক নবীরুল ইসলামকে এক নম্বর আসামি করা হয়েছে। ফাতেমা আমিন ও আজিজুল হক জাকিরসহ ১৪ জন নামীয় এবং ১০ থেকে ১২ জন অজ্ঞাতনামা সমবায় অধিদপ্তরের কর্মচারীকে আসামি করা হয়েছে।
মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮, ৩৪১, ৩৪২, ৩৫৭, ৩২৩, ৩৭৯, ৫০৬, ১১৪ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে বলে বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন বলে জানা গেছে।
তবে এ ঘটনায় তারিখ নিয়ে গুরুতর অসঙ্গতি রয়েছে। বর্ণনায় হামলার তারিখ ১৯ আগস্ট ২০২৬ বলা হলেও মামলা দায়েরের তারিখ হিসেবে ২৪ আগস্ট ২০২৩ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকাশের আগে এ বিষয়ে থানার মামলা-সংক্রান্ত নথি দেখে সঠিক সাল নিশ্চিত করা জরুরি।
রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
সংশ্লিষ্টদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে নবীরুল ইসলাম বদলি-বাণিজ্য, পদোন্নতি-বাণিজ্য, ঘুষ গ্রহণ ও লাইসেন্স সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান সরকারের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে অতিরিক্ত নিবন্ধক পদে পদোন্নতি নিয়েছেন তিনি। তবে তাঁর পদোন্নতির প্রক্রিয়া, সম্পদের পরিমাণ ও রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট নথি ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
একাধিক ভুক্তভোগীর প্রশ্ন, বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করলেও এত গুরুতর অভিযোগের মুখে নবীরুল ইসলাম কীভাবে এখনো স্বপদে বহাল রয়েছেন?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সমবায় অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, বিভাগীয় তদন্ত, মামলার নথি ও তদন্ত প্রতিবেদন নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে তাঁরা দাবি করেন।
নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সবকটি আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি, বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন, সনদ যাচাইয়ের তথ্য এবং সম্পদ-সংক্রান্ত দলিল পর্যালোচনা করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
