রাজধানীর ধানমন্ডিতে ফুটপাতে এক ব্যক্তিকে মারধর ও কান ধরে ওঠবস করানোর ঘটনায় খালিদ হাসান (৩৫) নামের এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ। একই ঘটনায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগে ধানমন্ডি থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আবদুল হাইকে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
বুধবার (১৫ অক্টোবর) দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ধানমন্ডির মীনা বাজার এলাকা থেকে খালিদকে আটক করা হয়। পরে তাঁকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা জোনের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব এ তথ্য জানিয়েছেন।
পুলিশ জানায়, সোমবার (১২ অক্টোবর) দুপুরে ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডে বাংলাদেশ আই হসপিটালের বিপরীতে শহীদ আবদুল্লাহ আল মাসুদ ওরফে মাসুদ রানা (৪৮) নামের এক ব্যক্তিকে মারধর ও কান ধরে ওঠবস করানোর অভিযোগ ওঠে খালিদের বিরুদ্ধে। পুলিশ জানিয়েছে, শহীদ আবদুল্লাহ মানসিক রোগে আক্রান্ত।
ঘটনার দিন এক তরুণীকে (২৩) শ্লীলতাহানির অভিযোগ ওঠে শহীদ আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে। ওই অভিযোগের জেরে খালিদ তাঁকে চড়-থাপ্পড় ও লাথি মারেন এবং কান ধরে ওঠবস করান বলে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। একপর্যায়ে মারধরের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক খালিদ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গ্রাফিকস ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন।
অভিযোগকারী তরুণী জানান, শহীদ আবদুল্লাহ তাঁকে ‘ব্যাড টাচ’ করেন। এ সময় ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ সদস্যরা তাঁকে আটক করতে অনীহা প্রকাশ করেন বলে তাঁর অভিযোগ। পরে তিনি মুঠোফোনে এক স্বজনকে ডেকে আনেন। ওই স্বজন ঘটনাস্থলে এসে শহীদ আবদুল্লাহকে মারধর করেন।
তরুণীর দাবি, এখন তাঁর স্বজনকে আটক করে আদালতে পাঠানো হয়েছে, অথচ শ্লীলতাহানির অভিযোগের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা নীরব ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
তরুণী আরও বলেন, স্বজনকে আটকের খবর পেয়ে বুধবার সকালে তিনি ধানমন্ডি থানায় যান। সেখানে তাঁকে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ভাইরাল না হলে এমন ঘটনা ঘটত না। যে আইডি থেকে ভিডিওটি ছড়ানো হয়েছে, সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করার কথাও তাঁকে জানানো হয়। একই সঙ্গে স্বজনের মুক্তি দাবি করেন ওই তরুণী।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে ওসি মুহাম্মদ ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব বলেন, এএসআই আবদুল হাইকে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে তাঁর দায়িত্ব ছিল। তবে সেখানে উপস্থিত অন্য দুই পুলিশ সদস্য পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টের (দাঙ্গা দমন বিভাগ) সদস্য হওয়ায় তাঁদের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ২ মিনিট ১২ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, এক যুবক ক্ষুব্ধ হয়ে গালাগাল করতে করতে ওই ব্যক্তিকে থাপ্পড় ও লাথি মারছেন। এ সময় ঘটনাস্থলে পথচারীদের ভিড় জমে। তাঁদের কেউ কেউ দাঁড়িয়ে ঘটনা দেখছিলেন, আবার কেউ মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন।
ভিডিওতে পথচারীদের কথোপকথনের কিছু অংশও শোনা যায়। তাঁদের কাউকে বলতে শোনা যায়, ‘মেয়ের গায়ে হাত দিয়েছে’, ‘ক্যানটিনে এই ঘটনা ঘটে’ এবং ‘মা-বোন নাই’।
একপর্যায়ে এক পথচারী মারধরের শিকার ব্যক্তিকে সেখানে উপস্থিত দুই পুলিশ সদস্যের হাতে তুলে দিতে বলেন। পরে ওই ব্যক্তিকে বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াতে দেখা যায়। তাঁর মুঠোফোন নিয়ে এক পথচারী ও মারধরকারী যুবক তাঁকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
এ সময় উত্তেজিত যুবককে বলতে শোনা যায়, ‘কিসের সরি, সরি বললেই সব শেষ হয়ে যায়?’ এরপর তিনি ওই ব্যক্তিকে আবারও থাপ্পড় মারেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, মারধরের পুরো ঘটনা চলার সময় কয়েক হাত দূরে পুলিশের দুই সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তাঁদেরও ঘটনাটি দাঁড়িয়ে দেখতে দেখা যায়।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর ফেসবুকে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। পুলিশের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে একজন ব্যক্তিকে মারধরের ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি—এমন অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা করছেন অনেকে।
