১৬ মিনিট আগে
সর্বশেষ আপডেট: ১৬ মিনিট আগে
স্পোর্টস ডেস্ক
একদিন বার্সেলোনার শিরোপা উৎসবে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘আজ, আগামীকাল এবং সব সময়, হৃদয়ে বার্সা।’ সেই জোসে মরিনহোই পরে কাতালান ক্লাবটির সবচেয়ে তিক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজন হয়ে উঠলেন। যে দলের জয় একসময় তাকে আনন্দ দিত, সেই দলকে হারানোই হয়ে গেল তার বড় চ্যালেঞ্জ। অথচ গল্পটা অন্য রকমও হতে পারত। প্রতিপক্ষের ডাগআউটে দাঁড়িয়ে বার্সাকে থামানোর ছক কষার বদলে ন্যু ক্যাম্পের প্রধান কোচের আসনেও দেখা যেতে পারত তাকে।
সেই সম্ভাবনা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছিল ২০০৮ সালে। তবে বার্সেলোনার সঙ্গে মরিনহোর সম্পর্কের শুরু আরও আগে। ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ক্লাবটির কোচিং স্টাফে কাজ করেছেন তিনি। প্রথমে ববি রবসনের সঙ্গে, পরে লুই ফন হালের অধীনে। কোচ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ চারটি বছর কেটেছিল সেখানেই।
রবসনের হাত ধরেই বার্সেলোনায় এসেছিলেন মরিনহো। এর আগে স্পোর্টিং লিসবন ও পোর্তোতেও ইংলিশ কোচের সঙ্গে কাজ করেছেন। ভাষার ব্যবধান ঘোচাতে রবসনকে সাহায্য করতেন বলে অনেকের চোখে তার পরিচয় ছিল শুধুই ‘দোভাষী’। কিন্তু দায়িত্বটা তার চেয়ে অনেক বড় ছিল। সংবাদ সম্মেলনে রবসনের কথা অনুবাদের পাশাপাশি মাঠের কাজেও ছিলেন তার সহকারী।
বার্সেলোনায় শুরুর সময়টা সহজ ছিল না। ইয়োহান ক্রুইফের বিদায়ের রেশ তখনো কাটেনি। তার জায়গায় আসা রবসনকে নিয়েও ক্লাবের ভেতরে সবার সমান আস্থা ছিল না। সেই পরিবেশে নতুন জায়গায় নিজের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে হয়েছে মরিনহোকে।
ধীরে ধীরে খেলোয়াড়দের চিনেছেন, কাজের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন। বার্সেলোনার কাছের শহর সিতজেসে গড়ে উঠেছে ব্যক্তিগত সম্পর্কও। রবসনের সঙ্গে শিরোপা জয়ের আনন্দ পেয়েছেন। কিন্তু এক মৌসুম পরই তার সামনে হাজির হয় নতুন পরিস্থিতি।
রবসনকে কোচের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ক্লাবের অন্য ভূমিকায় রাখা হয়। মরিনহো ভেবেছিলেন, অভিজ্ঞ কোচ অন্য কোথাও গেলে তিনিও সঙ্গী হবেন। এর মধ্যে নতুন কোচ ফন হাল তাকে নিজের সহকারী দলে থেকে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। পরে রবসন পিএসভিতে গেলেও মরিনহোকে সঙ্গে নেননি; বরং ফন হালের কাছে থেকে শেখার পরামর্শ দেন।
সিদ্ধান্তটি মরিনহোর কোচিং জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রতিপক্ষের খেলা বিশ্লেষণে তার দক্ষতা নজর কাড়ে ফন হালের। কোন দলের শক্তি কোথায়, দুর্বলতা কী, তাদের বিপক্ষে কীভাবে খেলা উচিত, এসব নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করতেন পর্তুগিজ কোচ। সময়ের সঙ্গে তার ওপর আস্থা ও দায়িত্ব দুটোই বাড়ে। শেষ দিকে কিছু ম্যাচে ডাগআউট সামলানোর সুযোগও পান।
এই চার বছরে বার্সেলোনা তার কাছে শুধু কাজের জায়গা হয়ে থাকেনি। ক্লাবটির প্রতি টান তৈরি হয়েছিল। তবে প্রধান কোচ হওয়ার পথ তখনো খোলেনি। ফন হালের বিদায়ের পর নতুন কোচ লরেন্স সের্রা ফেরেরের সহকারী দলে জায়গা হয়নি তার।
বার্সেলোনা ছেড়ে মরিনহো শুরু করেন নিজের কোচিং অধ্যায়। বেনফিকা ও উনিয়াও লেইরিয়া হয়ে পোর্তো। সেখানেই ইউরোপিয়ান ফুটবলে তার উত্থান। লিগ, উয়েফা কাপ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতে নিজেকে নিয়ে যান অন্য উচ্চতায়। এরপর চেলসিতে গিয়ে পরিচিত হন ‘স্পেশাল ওয়ান’ হিসেবে।
পুরোনো ক্লাবের সঙ্গে সম্পর্কের রংও বদলাতে থাকে এই সময়ে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে চেলসি ও বার্সেলোনার লড়াই মাঠ ছাড়িয়ে সংবাদ সম্মেলনেও ছড়িয়ে পড়ে। বার্সা সমর্থকদের ‘দোভাষী’ খোঁচার জবাবে মরিনহোও আক্রমণাত্মক হয়েছেন। লিওনেল মেসির বিরুদ্ধে অভিনয়ের অভিযোগ তুলে বাড়িয়েছেন উত্তাপ।
এত তিক্ততার পরও ২০০৮ সালে বার্সেলোনার কোচ হওয়ার আলোচনায় উঠে আসে তার নাম। ফ্রাঙ্ক রাইকার্ডের অধ্যায় শেষ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ক্লাব। নতুন কোচ নিয়ে ভাবনার মধ্যে মরিনহোর সঙ্গে বৈঠক করেন বার্সার কর্মকর্তারা। দল নিয়ে নিজের পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তিনি।
তবে সেই আলোচনার উদ্যোগ কে নিয়েছিল, তা নিয়ে পরে দুই পক্ষের বক্তব্যে অমিল দেখা যায়। বার্সার তৎকালীন সহসভাপতি মার্ক ইংলা বলেছিলেন, মরিনহো নিজের পরিকল্পনা জানাতে আগ্রহী ছিলেন। মরিনহো পাল্টা দাবি করেন, বার্সেলোনার কর্মকর্তারাই তাকে লিসবনে বৈঠকের জন্য ডেকেছিলেন। ফলে ঘটনাটিকে শুধু তার আবেদন ও বার্সার প্রত্যাখ্যানের সরল গল্পে বেঁধে ফেলা কঠিন।
শেষ পর্যন্ত সভাপতি হুয়ান লাপোর্তার বার্সেলোনা বেছে নেয় পেপ গার্দিওলাকে। মরিনহো যান ইন্টার মিলানে। একই সময়ে দুই কোচের সামনে খুলে যায় দুটি আলাদা পথ। পরে সেই পথ বারবার মুখোমুখি হয়েছে ইউরোপের বড় মঞ্চে।
