গত সপ্তাহে টোকিওতে যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমারের সামরিক সমর্থিত সরকারের মধ্যে গোপন আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এক মাসের মধ্যে এটি তাদের দ্বিতীয় বৈঠক। ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর যে জেনারেলদের সাথে ওয়াশিংটন সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল, তাদের সাথে পুনরায় সম্পৃক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। বিষয়টির সাথে পরিচিত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে শুক্রবার রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
এর আগে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে অনুষ্ঠিত আলোচনায় একজন মার্কিন ব্যবসায়ীর মুক্তি নিশ্চিত করা এবং আমেরিকানদের লক্ষ্য করে গড়ে তোলা প্রতারণা কেন্দ্রগুলো বন্ধ করার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে রয়টার্সের পূর্ববর্তী প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই আলোচনা মিয়ানমারের বিরল মৃত্তিকা খনিজ সম্পদের মতো আরো বিস্তৃত আলোচনার পথ প্রশস্ত করতে পারে।
গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত আলোচনায় উভয় পক্ষ ঠিক কী বিষয়ে আলোচনা করেছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি।
তথ্যদাতাদের একজন জানিয়েছেন, টোকিওতে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশটির সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী (গোয়েন্দা ও গবেষণা বিষয়ক) মাইকেল ভ্যান্স। তার সঙ্গে আরো এক ডজনেরও বেশি মার্কিন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। তবে মিয়ানমারের পক্ষে কারা প্রতিনিধিত্ব করেছেন, তা রয়টার্স নিশ্চিত হতে পারেনি।
সর্বশেষ এই আলোচনার বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কোনো সাড়া দেয়নি। তবে তারা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে তারা মিয়ানমারের সব পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ বজায় রাখে। মিয়ানমারের সামরিক সমর্থিত সরকারের একজন মুখপাত্রও মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেননি।
আলোচনা আয়োজনে নিজেদের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে, জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইমেইলের মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা উভয় পক্ষের সাথেই ‘প্রয়োজন অনুযায়ী যোগাযোগ’ বজায় রেখেছে; তবে সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক আলোচনা বা আদান-প্রদান সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে তারা অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
এই আলোচনার বিষয়ে অবগত ব্যক্তিরা এর আগে রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, গত মাসে নেপিদোতে ভ্যান্স এবং মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের মধ্যকার বৈঠকটি আরো বিস্তৃত আলোচনার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল। টোকিওতে দ্রুত পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার ঘটনাটি ইঙ্গিত দেয় যে, উভয় পক্ষই সংলাপ চালিয়ে যেতে আগ্রহী।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রচেষ্টার একটি বড় লক্ষ্য হলো—মিয়ানমারে গড়ে ওঠা বিভিন্ন প্রতারণামূলক কেন্দ্র (স্ক্যাম হাব) বন্ধ করতে দেশটির সহায়তা নিশ্চিত করা। এসব কেন্দ্র থেকে প্রেমের ফাঁদসহ নানা ধরনের প্রতারণা চালানো হয়, যার মাধ্যমে আমেরিকানদের কাছ থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
গবেষকদের মতে, অনেক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডই সেনাবাহিনী সমর্থিত মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় পরিচালিত হয় এবং এর আয়ের একটি অংশ সামরিক বাহিনীর কাছে পৌঁছায়। ফলে, মিয়ানমারের নেতারা আইন প্রয়োগের বিষয়ে আদৌ আন্তরিক কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তবে মিয়ানমারের সামরিক সমর্থিত সরকার জানিয়েছে, তারা এই প্রতারণামূলক কেন্দ্রগুলো দমনের লক্ষ্যে একটি বহুজাতিক প্রচেষ্টায় অংশ নিচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা মিয়ানমারে থাকা ভারী বিরল মৃত্তিকা উপাদানের বিশাল মজুত ব্যবহারের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা করেছেন। বৈদ্যুতিক যানবাহন থেকে শুরু করে বায়ুকলের মতো বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে এই উপাদানগুলো ব্যবহৃত হয়। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, এক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধা রয়েছে। এই খনিজ মজুতগুলোর বেশিরভাগই এমন অঞ্চলে অবস্থিত, যা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইরত জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এছাড়া, মিয়ানমারের বিরল মৃত্তিকা উপাদানের প্রধান ক্রেতা চীন। তারাও হয়তো মিয়ানমারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকাকে ভালোভাবে নেবে না।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের এক ব্যবসায়ীর মেয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। ওই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে দেশটির সামরিক বাহিনীকে সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে। মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, এই পদক্ষেপটি মিয়ানমারের বিষয়ে তাদের নতুন কৌশলের অংশ।
নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, “এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে জড়িত সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার গুরুত্ব তুলে ধরা। একই সঙ্গে, দেশটিতে নিজেদের মূল স্বার্থ রক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে যেসব উপায় বা কৌশল ব্যবহার করে এসেছে, সেগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করার প্রতিশ্রুতিও এতে রয়েছে।”
