বাঁশের সাঁকো থেকে পরে নদীর স্রোতে ভেসে যায় কিশোরী আফিজা। পরে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রসব ব্যথায় কাতরানো প্রসূতি অন্তরাকেও ওই সাঁকো পার করা যায়নি। অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণে তিনিও মারা যান। পাবনা ও নাটোর জেলার মানুষের এমন অনেক হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী বড়াল নদীর জোনাইল বাজার ঘাট। সাক্ষী আছেন প্রবীণ কলিমুদ্দিন মিয়াও।
বড় আক্ষেপ নিয়ে সেসব গল্পই শুনাচ্ছিলেন কলিমুদ্দিন মিয়া। তিনি বলেন, বড়াল নদীর তীরেই তার বাড়ি। ছয় দশক আগেও বড়ালের স্রোত ছিল প্রলয়ঙ্কারী। সেই স্রোত ঠেলেই নৌকায় এপার ওপার পারাপার হতেন বহু মানুষ। ধীরে ধীরে নদীর স্রোতধারা কমে এলে বাঁশের সাঁকোই পারাপারের একমাত্র মাধ্যম হয়ে উঠে দুই উপজেলার মানুষের কাছে। সেই থেকে নদী পারাপারে দুর্ভোগ চলছেই। তবে দুর্ভোগ লাঘবে সেতু নির্মাণ হচ্ছে যেনে তারা আন্দিত-উচ্ছ্বসিত।
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্যমতে, প্রবাহমান বড়াল নদীটিই নাটোর ও পাবনা জেলা দুটিকে পৃথক করেছিল। তবে সব দুর্দশা ছাপিয়ে বড়াল নদীর জোনাইলের সেই ঘাটে সেতু নির্মাণ হচ্ছে। এরমধ্যে দিয়ে যোগাযোগে নতুন দিগন্ত তৈরি হচ্ছে নাটোর ও পাবনা জেলার মধ্যে।
পাবনার চাটমোহর ও নাটোরের বড়াইগ্রামের কয়েক লাখ মানুষের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে ৮ কোটি টাকার সেতুটির বরাদ্দ এনেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ। বুধবার সেতুটির নির্মাণ কাজের ভিত্তি প্রস্তরও স্থাপন করেছেন তিনি। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস।
নাটোর সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) তথ্য বলছে, ৮ কোটি ৪৯ লাখ ৫৮ হাজার ৬৩৮ টাকা বরাদ্দের সেতুটি জোনাইল-চাটমোহর আঞ্চলিক সড়ককে মিলিত করবে। এতে বড়াইগ্রাম ও চাটমোহর উপজেলার ৫ টি ইউনিয়নের মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন।
জোনাইল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রাসেদুল ইসলাম বলেন, বড়াল নদীর দক্ষিণে পাবনা জেলার চাটমোহর ও উত্তরে নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলা। নদীর এপার ওপারে স্থানীয় লোকজনের জমাজমি রয়েছে। বর্ষায় জমিতে চাষাবাদের জন্য বীজ সার-কীটনাশক ও উৎপাদিত ফসল পরিবহনে নৌকাই একমাত্র ভরসা হয়ে উঠে কয়েক হাজার কৃষকের। আবার গ্রীষ্ম মৌসুমে বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে ব্যয় বাড়লেও কাঙ্খিত মূল্য বঞ্চিত হন কৃষকেরা।
তিনি বলেন, যুগ যুগ ধরে কৃষকেরা এমন নিদারুণ সমস্যার সম্মুখীন হলেও বড় নদীর উপর সেতু নির্মাণ করা হয়নি। প্রতিনিধিরা কেবল আশ্বাসই দিয়েছেন, সেই আশ্বাস আর বাস্তবে রূপ নেয়নি। তবে স্থানীয় সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ সাদিয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন। বিশেষ বরাদ্দে সেতু নির্মাণের ব্যবস্থা করেছেন। সেতুটি নির্মাণ হলে কৃষকদের এই দুর্ভোগ চিরজীবনের জন্য লাঘব হবে। পাবনা জেলার সঙ্গে নাটোর জেলার সরাসরি যোগাযোগও তৈরি হবে।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, বড়াল নদীর চাটমোহর অংশে ডিবিগ্রাম ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের ধানবিলা, কামালপুর, দয়রামপুর, বামনগ্রাম, এবং কাঠালবাড়ীর লোকজন নদী পার হয়ে নাটোর জেলা সদর এবং রাজশাহী বিভাগীয় শহরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেন।
এছাড়া বড়াল নদীর একদম মূল তীরবর্তী এলাকা বড়াইগ্রাম অংশে বিখ্যাত জোনাইল বাজার অবস্থিত। চামটা, বোর্ণী, চরগোবিন্দপুর, পারবোর্ণী এবং সংগ্রামপুর গ্রামও রয়েছে। এই গ্রামটির পাশ দিয়েও নদীর প্রবাহ রয়েছে। রয়েছে জলাভূমিও। এসব এলাকার মানুষ নদী পার হয়ে চাটমোহর উপজেলা রেলওয়ে স্টেশন ও পাবনা মানসিক হাসপাতাল নিয়মিত যাতায়াত করেন। বড়ালের উপর সেতু না থাকায় এসব এলাকার বহু মানুষকে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ সয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
জোনাইল ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ বলেন, চাটমোহর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের শিক্ষার্থীরা জোনাইল সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং কলেজে ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করেন। সেতুটি নির্মাণ হলে দুই উপজেলার শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসা যাওয়া করতে পারবেন। সেতু নির্মাণ কাজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করায় তারা সংসদ সদস্যকে ধন্যবাদ জানান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, জোনাইল-চাটমোর আঞ্চলিক সড়কটি দুই পাশ থেকেই বড়ালে গিয়ে ঠেকেছে। সেতুটি নির্মাণ হলে জোনাইল ও চাটমোহর অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যেও ব্যপক প্রসার ঘটবে।
সেতুটির নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ বলেন, সেতুটির নির্মাণকাজে স্থানীয়দের সার্বিক সহযোগিতা দরকার।,কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলে প্রশাসনকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে নির্মাণকাজে কোনো ধরনের অনিয়ম করা যাবে না। বাধা দেওয়া যাবে না। সেতুটির নির্মাণ কাজ শেষ হলে চাটমোহর ও বড়াইগ্রাম উপজেলার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরক্ষভাবে উপকৃত হবেন।
