শুধু পাঠ্যবইতে নয়, বিজ্ঞান আছে সব খানে। আমাদের প্রতিদিনের জীবনে, প্রতিটি কাজের পেছনেই আছে বিজ্ঞান। তাই কিশোর-তরুণদের সবাই বিজ্ঞানী না হলেও বিজ্ঞানমনস্ক দেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া প্রয়োজন। সেই কাজটাই গত দশ বছর ধরে করে আসছে বিজ্ঞানবিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন বিজ্ঞানচিন্তা। বিজ্ঞানচিন্তার দশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে অতিথিরা এ কথা বলেন।
আজ ১৫ অক্টোবর, বুধবার কারওয়ান বাজারে বিজ্ঞানচিন্তা কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় ম্যাগাজিনটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন। এতে দেশের সেরা গবেষক, বিজ্ঞান লেখক, পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা, স্বেচ্ছাসেবী ও অতিথিসহ নানা বয়সের মানুষ উপস্থিত ছিলেন। বিকেল সাড়ে চারটায় অনুষ্ঠান শুরু হয়।
শুরুতেই শুভেচ্ছা জানিয়ে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। তিনি প্রথমেই বিজ্ঞানচিন্তার দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘বিজ্ঞানচিন্তা বাংলাদেশে, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানবিষয়ক একটি অসাধারণ ম্যাগাজিন। প্রতিবছর এর হাজার হাজার কপি বের হয় এবং দশ বছরের শিশু থেকে শুরু করে সত্তর-আশি বছরের বয়স্ক মানুষেরা পর্যন্ত এই ম্যাগাজিন পড়েন। এ ছাড়াও অনলাইনে বিজ্ঞানচিন্তার ওয়েবসাইটে প্রতিদিন হাজারো পাঠক বিজ্ঞানবিষয়ক নানা রকম লেখা পড়েন। এই পাঠকেরা নিজেদের আগ্রহ থেকেই বিজ্ঞান পড়েন, কোনো বিজ্ঞাপন থেকে তারা ওয়েবসাইটে আসেন না। এটা সত্যিই বড় ব্যাপার। এ জন্য আমি বিজ্ঞানচিন্তার সঙ্গে যুক্ত সবাইকে ধন্যবাদ এবং অভিনন্দন জানাই।’
এরপর শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বিজ্ঞানচিন্তার সম্পাদক আবদুল কাইয়ুম। তিনি বিজ্ঞানচিন্তার এই দশ বছরের সফল পথচলার কথা উপস্থিত সবার সামনে তুলে ধরেন। সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একটি বিজ্ঞানবিষয়ক ম্যাগাজিন ১০ বছর পূর্ণ করবে, সম্পাদক হয়েও এ কথা আমার আগে বিশ্বাস হয়নি। আমরা শুধু ম্যাগাজিন প্রকাশ করি না, সারা বছর বিজ্ঞান প্রসারে আরও বিভিন্ন ধরনের আয়োজন করি। বিজ্ঞান উৎসব, বিজ্ঞান বক্তৃতাসহ আরও যেসব আয়োজন আমরা করি, প্রতিটিতেই আমরা আগ্রহী পাঠকদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাই। এ জন্য আমাদের পাঠকদের আন্তরিক ধন্যবাদ।’
এরপর বক্তব্য রাখেন বিজ্ঞানচিন্তার নির্বাহী সম্পাদক আবুল বাসার। তিনি বিজ্ঞানচিন্তার বছরব্যাপী কার্যক্রম এবং ওয়েবসাইটে নিয়মিত লেখা প্রকাশ ও বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘আজ বিজ্ঞানচিন্তা এক দশক পূর্ণ করল। আজকের এই অনুষ্ঠানে যারা এসেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। আমরা যখন ২০১৬ সালে বিজ্ঞানচিন্তা শুরু করি, তখন লক্ষ্য ছিল বিজ্ঞানচিন্তার মাধ্যমে বিজ্ঞানকে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া। এই ১০ বছরের পথচলায় আমাদের মূল জ্বালানি হলো পাঠক। আপনারা সঙ্গে ছিলেন বলেই এই সবকিছু সম্ভব হয়েছে।’
চিকিৎসক ও লেখক তানজিনা হোসেন তাঁর বক্তব্যে আগের বছরের কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘বিজ্ঞানচিন্তার প্রতিপাদ্যের সঙ্গে মিলিয়ে বলতে চাই, সবাই বিজ্ঞানী না হলেও প্রত্যেককেই বিজ্ঞানমনস্ক হতে হবে।’
বিজ্ঞানবক্তা আসিফ বিজ্ঞানচিন্তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘আমি নিজে আগে একটি বিজ্ঞান পত্রিকা প্রকাশ করতাম সায়েন্স ওয়ার্ল্ড নামে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বিজ্ঞানচিন্তা পাঠকদের মধ্যে যে ভারসাম্য তৈরি করেছে, সব বিষয়ে এটি যেভাবে লেখা প্রকাশ করে, তা সত্যিই অসাধারণ।’
শিক্ষাবিষয়ক গবেষক ফারহানা মান্নান বলেন, ‘প্রিন্টে যা পড়তে হয়, সে জন্য মনযোগ দিতে হয় আলাদা করে। অনলাইনে সেটা হয় না, মানুষ স্ক্রল করে চলে যান। বিজ্ঞানের ইন্টারেস্টিং অনেক বিষয় আমি প্রিন্ট সংস্করণে পড়ি। সে জন্য আমি বুঝি, এটা শিক্ষার্থীদের কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দেয়, এবং তাদেরকে মননশীল করে তোলে। ১০ বছর ধরে বিজ্ঞানচিন্তা এ কাজ করে আসছে, এ জন্য আমি তাদের আবারও ধন্যবাদ জানাতে চাই।’
কার্টুনিস্ট নাসরিন সুলতানা মিতু রসিকতা করে বলেন, ‘প্রতি বছর আমি ভাবি, আগামী বছরই হয়তো বিজ্ঞানচিন্তা বন্ধ হয়ে যাবে! কিন্তু এই ম্যাগাজিনটা এত পাঠক আগ্রহ নিয়ে পড়েন, এটা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।’
বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাদুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি আমি কিছু সুপারিশ বা পরামর্শ দিতে চাই। আমি মনে করি, বাংলাদেশের একমাত্র বড় পরিসরের বিজ্ঞান ম্যাগাজিন হিসেবে বিজ্ঞানচিন্তাকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আরও কাজ করতে হবে, শিক্ষকদের সঙ্গে কাজ করতে হবে। তারা যেন সহজে লেখা পাঠাতে পারে, তাদের কাজগুলো নিয়ে যেন বিজ্ঞানচিন্তা আরও লেখা প্রকাশ করে, সে লক্ষ্যে ম্যাগাজিনটির আরও বড় পরিসরে উদ্যোগ নেওয়া উচিৎ। প্রয়োজনে স্কুল ক্যাম্পেইন চালানো যেতে পারে।’
বিজ্ঞান লেখক আব্দুল গাফফার শুরু থেকে বিজ্ঞানচিন্তার সঙ্গে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘বিজ্ঞান নিয়ে অনেকেই বললেন, আমি আরেকটা জিনিস বলতে চাই। দেশের বিভিন্ন বিজ্ঞানবিষয়ক উদ্যোগকে বিজ্ঞানচিন্তা যেভাবে এক ছাদের নিচে নিয়ে এসেছে, এক সুতায় সবাইকে গেঁথেছে, এটা সত্যিই প্রশংসনীয়।’
এ ছাড়াও অনুষ্ঠানে পাঠকেরা নিজেদের মতামত ব্যক্ত করেন। কেউ কেউ বিজ্ঞানচিন্তার দীর্ঘজীবন কামনা করেন, কেউ-বা বলেন নিজেদের স্মৃতি কথা। ২০২৫ সালে বিকাশ-বিজ্ঞানচিন্তা বিজ্ঞান উৎসবের জাতীয় পর্বে প্রজেক্ট ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়নদের চ্যাম্পিয়ন আরীব বিন ফারুক ও সাইম ইবনে সারওয়ারও এ আয়োজনে এসেছিলেন। তারা বলেন, পাঠক হিসেবে নয়, বিজ্ঞানচিন্তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। কিন্তু এখন আমরা নিয়মিত পাঠক হয়ে গেছি। বিজ্ঞানচিন্তাকে অনেক ধন্যবাদ সে জন্য।
এরপর শুরু হয় গান। মাহবুবা সুলতানা ‘সুন্দর, সুবর্ন, তারুণ্য, লাবণ্য’ এবং অনিক সরকার ও মেঘা খেতান ‘পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে’ গেয়ে শোনান সবাইকে। উপস্থিত পাঠকও যোগ দেন তাদের সঙ্গে। এরপর আয়োজিত হয় কুইজ। বিজয়ীদের হাতে অতিথিরা পুরস্কার তুলে দেন। সব শেষে কেক কাটা ও ছবি তোলার মাধ্যমে শেষ হয় এই প্রাণবন্ত আয়োজন।
এ আয়োজনে গণিত ইশকুলের সৌজন্যে ছিল একটি ‘বুদ্ধির ব্যায়াম’। এতে বিজয়ী পাঁচ জনকে পুরস্কৃত করা হয়।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞানচিন্তার প্রদায়ক জান্নাতুল ফেরদৌস, সহসম্পাদক কাজী আকাশ, মুদ্রণ ব্যবস্থাপক শামসুল হকসহ আরও অনেকে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন রওনক জাহান রাকা ও উচ্ছ্বাস তৌসিফ। আর স্পন্সর হিসেবে এ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিল স্যাভয় ও ফ্রেশ।
আব্দুল কাইয়ুমের সম্পাদনায় ২০১৬ সালের অক্টোবরে আত্মপ্রকাশ করে বিজ্ঞানবিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন বিজ্ঞানচিন্তা। এ পর্যন্ত ম্যাগাজিনটির ১১১৮টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞানবিষয়ক লেখা প্রকাশের পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের কাছে বিজ্ঞানকে পৌঁছে দিতে বিজ্ঞানচিন্তা নিয়মিত আয়োজন করছে বিজ্ঞান উৎসব, বিজ্ঞান বক্তৃতা, বিজ্ঞান মেলাসহ আরও অনেক কিছু।