গাইবান্ধা: যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর অববাহিকায় অবস্থিত উত্তরের জেলা গাইবান্ধা। নদীবিধৌত উর্বর পলিমাটি, বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল ও কৃষি উপযোগী পরিবেশের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই কৃষিশস্য, হাঁস-মুরগি, গবাদিপশু ও মাছ উৎপাদনে খ্যাতি রয়েছে এ জেলার। গাইবান্ধার অসংখ্য পরিবারের জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অথচ অনিশ্চিত আয়, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং সামাজিক অবমূল্যায়নের কারণে এ পেশার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। অনেক কৃষকও চান না, তাদের সন্তানদের একই অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে জীবন কাটাতে হোক। এতে গাইবান্ধার কৃষির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সামাজিক অবমূল্যায়নে কৃষিবিমুখ তরুণেরা
সমাজের একটি অংশ এখনো কৃষিকে তুলনামূলক কম মর্যাদার পেশা হিসেবে বিবেচনা করে। ‘চাষাভুষা’ শব্দটির ব্যবহারেও কৃষিশ্রমের প্রতি অবজ্ঞার মনোভাব প্রকাশ পায়। শিক্ষিত হওয়া কিংবা আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে কৃষিপেশা থেকে দূরে থাকার প্রবণতাকে অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ফলে কৃষির সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোর মধ্যেও সন্তানদের অন্য পেশায় প্রতিষ্ঠিত করার আকাঙ্ক্ষা বাড়ছে।
এই মনোভাবের প্রভাব পড়ছে তরুণদের পেশা নির্বাচনে। অনেকের কাছেই চাকরি, ব্যবসা কিংবা শহরকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান কৃষির চেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। কৃষিকাজে শারীরিক পরিশ্রম, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা, ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির আশঙ্কা তাদের অনাগ্রহ আরও বাড়িয়ে তুলছে। এর সঙ্গে সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন যুক্ত হওয়ায় কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার প্রবণতা কমছে।

উৎপাদন খরচ বেশি, আয়ের অনিশ্চয়তা
কৃষকের এই অনাগ্রহের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। জমি প্রস্তুত করা, বীজ ও সার সংগ্রহ, সেচের ব্যবস্থা, শ্রমিকের মজুরি এবং ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত নানা খাতে অর্থ ব্যয় করতে হয়। অথচ বাজারে ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেলে উৎপাদন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়ে। বন্যা, নদীভাঙন, খরা কিংবা অতিবৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হলে ক্ষতির বোঝাও বহন করতে হয় কৃষক পরিবারকে। এমন বাস্তবতায় অনেক কৃষকই চান, তাদের সন্তান অন্য পেশায় প্রতিষ্ঠিত হোক। তাদের কাছে এটি শুধু আর্থিক নিরাপত্তা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং নিজেদের জীবনে দেখা কষ্ট, অনিশ্চয়তা ও সামাজিক অবমূল্যায়ন থেকে সন্তানদের দূরে রাখার প্রচেষ্টাও।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, ‘ফসল ফলাতে সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের পেছনে অনেক টাকা খরচ হয়। কিন্তু ফসল বিক্রির সময় অনেক ক্ষেত্রে খরচের সঙ্গে দাম মেলে না। কৃষক লোকসান করলে সেই ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার কেউ থাকে না। তাই এখন ছেলেমেয়েরা কৃষিকাজ করতে চায় না, আমরাও চাই না তারা এই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ুক।’
একই গ্রামের কৃষক সিজু মিয়া বলেন, ‘সারা জীবন জমিতে কাজ করে সংসার চালিয়েছি। কখনো ফসল ভালো হয়েছে, কখনো রোগবালাইয়ের কারণে লোকসান গুনতে হয়েছে। অনেক কষ্ট করে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করাচ্ছি। চাই তারা চাকরি করুক, সম্মান নিয়ে বাঁচুক। আমার মতো রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাতে না হোক।’
চাকরির দিকে ঝুঁকছেন তরুণরা
কৃষকের সন্তানদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটলেও তাদের বড় একটি অংশ কৃষিতে ফিরে আসতে আগ্রহী নয়। নির্দিষ্ট বেতন, নিয়মিত আয় এবং তুলনামূলক স্থিতিশীল জীবনযাপনের প্রত্যাশায় তারা চাকরির প্রস্তুতি কিংবা অন্য পেশায় যুক্ত হওয়ার দিকে ঝুঁকছেন।
পলাশবাড়ী উপজেলার মনোহরপুর এলাকার অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রিফাত হাসান বলেন, ‘আমাদের এলাকায় অনেক পরিবার কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কৃষিকাজ করে কত টাকা আয় হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। পড়ালেখা করে যদি একটা চাকরি পাওয়া যায়, তাহলে মাস শেষে নির্দিষ্ট আয় থাকবে। তাই আমি কৃষিকাজের চেয়ে চাকরির প্রস্তুতিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।’
তরুণদের এই দৃষ্টিভঙ্গি কৃষির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। কৃষিতে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ কমে গেলে শুধু কৃষিশ্রমিকের সংকটই নয়, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল ও লাভজনক করে তোলার উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
কৃষিবিদ রাশেদুল ইসলাম বলেন, কৃষি থেকে তরুণদের দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদনের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। নতুন প্রজন্ম কৃষিতে যুক্ত না হলে ভবিষ্যতে দক্ষ কৃষিশ্রমিক ও উদ্যোক্তার সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তার মতে, প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার, মানসম্মত বীজ, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ানো গেলে কৃষিকে লাভজনক পেশায় রূপান্তর করা সম্ভব।
তিনি বলেন, গাইবান্ধার উর্বর জমি, বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল ও কৃষিভিত্তিক উৎপাদনব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে কৃষি উদ্যোক্তা, খামারি এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। এ জন্য সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য এবং কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
সিপিবি নেতা মিহির ঘোষ বলেন, কৃষক শুধু ফসল উৎপাদন করেন না, তারা দেশের মানুষের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করেন এবং অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী করেন। অথচ যাদের শ্রমে খাদ্য উৎপাদিত হয়, তাদের পেশাই যদি সামাজিকভাবে অবমূল্যায়িত হয়, তাহলে নতুন প্রজন্মকে কৃষিতে আগ্রহী করে তোলা কঠিন।
তিনি মনে করেন, গাইবান্ধার কৃষিসমৃদ্ধিকে টেকসই রাখতে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষকের মর্যাদা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও পেশাগত সম্ভাবনা নিশ্চিত করা জরুরি। কৃষিকে কেবল উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পেশা নয়, বরং সম্মানজনক ও সম্ভাবনাময় পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই তরুণ প্রজন্মের কাছে কৃষির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
গাইবান্ধা কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মুখ্য প্রশিক্ষক ড. মো. আবু সায়েম বলেন, কৃষি খাতের উন্নয়নে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে ৪ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্সের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কারিগরি প্রশিক্ষণ ও একাডেমিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তবে প্রশিক্ষণ শেষে এসব শিক্ষার্থীর অধিকাংশই সরকারি চাকরি না পেলে কৃষি খাতে যুক্ত না হয়ে বিকল্প পেশা বেছে নেন। ফলে কৃষিতে বিশেষায়িত জ্ঞান ও পেশাভিত্তিক দক্ষতা অর্জন করা বিপুলসংখ্যক তরুণের সক্ষমতাকে এ খাতে কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সব সময় শিক্ষার্থীদের কৃষিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে এবং আধুনিক কৃষির উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত করি। কিন্তু পারিবারিক প্রত্যাশা ও আর্থসামাজিক নানা চাপের কারণে তাদের অনেকেই কৃষি খাত থেকে সরে গিয়ে অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।’
