ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (BIGD), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং উইমেন লিভিং আন্ডার মুসলিম লজ (WLUML) যৌথভাবে ‘Women, Power, and Political Orders in Muslim Society Contexts’ শীর্ষক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয় রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে, যেখানে বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, পাকিস্তান, ফিলিস্তিন, ও সিরিয়ার শিক্ষাবিদ, অ্যাক্টিভিস্ট, আইনপ্রণেতা, আইনজীবী, ও নীতি বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
রাজনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়া, রূপান্তরকালীন ন্যায়বিচার, এবং রূপান্তর-পরবর্তী প্রতিষ্ঠান গঠনে নারীরা কীভাবে ভূমিকা রাখেন এবং কীভাবে সেই প্রক্রিয়াগুলো থেকে তাদের প্রায়ই দূরে রাখা হয় সে বিষয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
আরও পড়ুন
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও ন্যায়বিচারের আন্দোলনে নারীরা প্রায়ই সামনের সারিতে থাকেন। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরিবর্তনের সময়ে তাদের নেতৃত্ব খুব কমক্ষেত্রেই পরবর্তী সময়ে আলোচনার টেবিলে, সংবিধান প্রণয়নে, এবং নতুন প্রতিষ্ঠান গঠনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়। এই ব্যবধান কমাতে সুনির্দিষ্ট শিক্ষা ও কৌশল চিহ্নিত করাই ছিল সম্মেলনের অন্যতম লক্ষ্য।
রাজনৈতিক রূপান্তরের সময়ে নারীদের ভূমিকা প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে BIGD, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন বলেন, ‘রাজনৈতিক রূপান্তরের সময়ে নারীরা যেমন চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখেন, তেমনি নতুন শক্তির উত্থানের ফলে ক্ষতিগ্রস্তও হন। এই পরিসরকে আমরা যদি সুসংগঠিত করতে পারি, তাহলে নারীরা পরিবর্তনের শক্তিশালী কারিগর হয়ে উঠতে পারবেন।’
আরও পড়ুন
এ বিষয়ে কনকর্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত (Emerita) অধ্যাপক ও WLUML-এর নির্বাহী পর্ষদের সদস্য ড. হোমা হুদফার বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ে অর্জিত নারীর অধিকার প্রায়ই খর্ব হয়।
বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার তুলনা করে তিনি বলেন, ‘নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার নিয়মকানুন প্রণয়নের সময় নারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। সংবিধানে সমতার স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি তা কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলতে হবে।’
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক এবং WLUML-এর নির্বাহী পর্ষদের সদস্য ড. মোনা তাজালি বলেন, ‘একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে জেন্ডারসমতাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। এমন পরিবর্তনের সময়ে আমরা ক্ষমতায় কিছু নারীকে দেখতে পারি, কিন্তু তাঁদের এই অবস্থান সাময়িক এবং অত্যন্ত নাজুক।’
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (BLAST) অনোরারি নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন প্রশ্ন তোলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নারীদের অধিকার নিয়ে যে প্রাণবন্ত আলোচনা শুরু হয়েছিল, তা থেকে বাস্তবে কতটা পরিবর্তন এসেছে।
তিনি বলেন, ‘সমাজে নারীর অবস্থান নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে, নইলে একই পরিস্থিতি চলতেই থাকবে।’ তিনি নারী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন দলের সঙ্গে জোট ও সহযোগিতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
সারাদিন ব্যাপী সম্মেলনে বক্তারা আলোচনা করেন, কীভাবে নারীরা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের পাশাপাশি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। পাশাপাশি, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ে নারীদের অভিজ্ঞতা ও অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মারদিয়া মুমতাজ বলেন, ‘পেশিশক্তির (muscle power) ব্যবহার ছাড়াই নারীরা যাতে রাজনীতিতে অংশ নিতে পারেন, সে জন্য আরও স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান পথ তৈরি করতে হবে। আমরা চাই, নারী ও পুরুষ একসঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতা গড়ে তুলুক। শুধু জামায়াতে ইসলামীতে নয়, সব রাজনৈতিক দলেই আমরা এটি দেখতে চাই।’
ক্ষমতার কাঠামোতে নারীর অবস্থান নিয়ে বলতে গিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মারদিয়া মুমতাজ একটি ইসলামি রাজনৈতিক দলে নারীর ভূমিকা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণের জন্য আরও স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান সুযোগ তৈরি করতে হবে, যেখানে জোরজবরদস্তির কোনো স্থান থাকবে না। আমরা চাই, নারী ও পুরুষ একসঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতা গড়ে তোলায় ভূমিকা রাখুন। শুধু জামায়াতে ইসলামী নয়, সব রাজনৈতিক দলেই আমরা এমন অংশগ্রহণ দেখতে চাই।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, বাংলাদেশ-এর প্রসিকিউটর (সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল) ব্যারিস্টার শাইখ মাহদি গুমবিরোধী আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করেন।
তিনি বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের মা, মেয়ে, ও স্ত্রীরাই রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। নারীপক্ষের সাফিয়া আজিম বীরাঙ্গনাদের স্বীকৃতি এবং এখনো যেসব অধিকারের জন্য লড়াই চলছে, সেগুলো নিয়ে কথা বলেন।
সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব জেনারেল এডুকেশনের ডিন ড. সামিয়া হক মুসলিম সমাজে নারীর অগ্রগতির জন্য আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে সংহতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, ‘নারীদের ব্যক্তিসত্তার বৈচিত্র্যকে বিবেচনায় নিতে হবে এবং তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া রাজনৈতিক, সামাজিক, ও অর্থনৈতিক শক্তির প্রভাব কাটিয়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে। নারীদের নিজস্ব পছন্দ ও আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে কথা বলার সুযোগ দিলে মুসলিম সমাজে নারী ও পুরুষের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোও যথাযথভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।’
এই সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ও মানবিক বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. ফিরদৌস আজিম; BIGD-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ শাহান; BIGD-এর সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট তাহরিমা বিনতে তারিক; BIGD-এর প্রোগ্রাম অ্যাসিস্ট্যান্ট জিনাত খান মধ্যমা; বাংলাদেশের নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের BIGD-এর সিনিয়র ফেলো অব প্র্যাকটিস মাহীন সুলতান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য উমামা ফাতেমা, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ULAB) সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের পরিচালক অবন্তী হারুন; কনকর্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের অ্যাফিলিয়েট অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ড. আফরা জালালি (সিরিয়া); এশিয়ান মুসলিম অ্যাকশন নেটওয়ার্কের মহাসচিব রুবিয়ান্তি খলিফা (ইন্দোনেশিয়া); বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম; আফগানিস্তানের সাবেক ন্যায়পাল এবং সংবিধান বাস্তবায়ন তদারকির স্বাধীন কমিশনের সাবেক কমিশনার গিজাল হারেস; ইরানের অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ শিমা ইসমাইলিয়ান; অন্তর্বর্তী ফিলিস্তিনি সংবিধানের খসড়া প্রণয়ন কমিটির সদস্য ড. সানা আলসারঘালি; যুক্তরাষ্ট্রের কার্লেটন কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ড. সামার ফরেস্টার; পাকিস্তানের জাতীয় নারী মর্যাদা কমিশনের সাবেক সভাপতি খাওয়ার মমতাজ; এবং ইন্দোনেশিয়ার নারী ক্ষমতায়ন ও শিশু সুরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা আই.জি.এ. পুত্রি অ্যাস্ট্রিড কার্তিকা।
বিজ্ঞপ্তি/
