মেগা সড়ক প্রকল্প সিংহভাগ সমাপ্ত
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রান্তিক জনপদ খুলনার পাইকগাছা ও কয়রাবাসীর জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে বেতগ্রাম-কয়রা সড়ক প্রশস্তকরণ ও বাঁক সরলীকরণ মেগা প্রকল্প।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রান্তিক জনপদ খুলনার পাইকগাছা ও কয়রাবাসীর জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে বেতগ্রাম-কয়রা সড়ক প্রশস্তকরণ ও বাঁক সরলীকরণ মেগা প্রকল্প। বছরের পর বছর ধরে ছোট-বড় অসংখ্য বিপজ্জনক বাঁক, বর্ষায় হাঁটু সমান কাদা আর গরমে ধুলোবালির অতল গহ্বরে যে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হতো, তা এখন শুধুই ইতিহাস। ৬ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা, প্রশাসনিক জটিলতা আর বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে অবশেষে আলোর মুখ দেখছে ৫৩৫ কোটি টাকার এই বিশাল সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প। মেগা প্রকল্পটির সিংহভাগ কাজ শেষ হওয়ায় খুলনা জেলা শহর থেকে সরাসরি সমুদ্র উপকূলীয় উপজেলা কয়রা পর্যন্ত চলাচলে যুক্ত হয়েছে এক নতুন গতি ও স্বস্তি।
খুলনা ও সাতক্ষীরার প্রান্তিক অঞ্চলের সাথে সংযোগকারী বেতগ্রাম থেকে কয়রা পর্যন্ত যোগাযোগের প্রধানতম মাধ্যম হলো এই সড়কটি। বর্ষাকালে খাদে পরিণত হওয়া রাস্তা আর অগণিত বিপজ্জনক বাঁকের কারণে এই পথে প্রতিনিয়ত ঘটতো মারাত্মক দুর্ঘটনা। যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল।
জনসাধারণের যাতায়াত নির্বিঘœ, দ্রুগামী ও ঝুঁকিমুক্ত করার লক্ষ্যে ২০২০ সালে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ হাতে নেয় ‘বাঁক সরলীকরণ ও সড়ক প্রশস্তকরণ’ প্রকল্প। একই প্রকল্পের আওতায় ১০০ মিটার নদী শাসনের কাজও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০২০ সালের ২১ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) তালা থেকে কয়রা পর্যন্ত প্রকল্পটির অনুমোদন মেলে।
প্রকল্পটির মূল ঠিকাদারি কাজ পায় মোজাহার এন্টারপ্রাইজ। শুরুতেই ৩৩৯ কোটি ৫৮ লাখ ৪৭ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০২২ সালের ৩০ জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে জমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতা, আইনি বাধা এবং মাঠপর্যায়ের নানা প্রতিকূলতায় প্রকল্পটির মেয়াদ এক বছর করে টানা চার দফা বাড়ানো হয়। নতুন মেয়াদ অনুযায়ী ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে সব কাজ সম্পন্ন করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়।
প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির পাশাপাশি স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায় এর বাজেট। চার দফায় প্রকল্পের সময় বাড়ায় ব্যয় বাড়ে ৪০ কোটি টাকা। পরবর্তীতে সড়কের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ তিন কিলোমিটার অংশের বিশেষ সংস্কার ও সুরক্ষার জন্য আলাদাভাবে যোগ করা হয় আরো ৫৫ কোটি টাকা। এর পাশাপাশি সর্বশেষ তালা থেকে পাইকগাছা পর্যন্ত ৬৫ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে অতিরিক্ত ৬ ফুট করে সড়ক প্রশস্ত করার জন্য সওজ আরো ১০০ কোটি টাকা নতুন করে বরাদ্দ দেয়। ফলে শুরুতে প্রায় ৩৪০ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি চার দফায় মোট ১৯৫ কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় সর্বমোট ৫৩৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকায়।
প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া। সড়কের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ হিসেবে চিহ্নিত ৩০টি মারাত্মক বাঁক সোজা করার জন্য ১১.২৪ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং এর জন্য ৭১ কোটি ৮২ লাখ টাকা নির্দিষ্ট করে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
তবে জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও স্বাক্ষর সংক্রান্ত ধীরগতির কারণে অর্থ ছাড়ে বেশ বিলম্ব ঘটে। এতে ভূমি মালিকদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। পরিস্থিতি এতটাই জটিল আকার ধারণ করে যে, গত বছরের ডিসেম্বরে ক্ষতিপূরণের চেক না পেয়ে ক্ষুব্ধ জমি মালিকরা সরাসরি সড়কের কাজ বন্ধ করে দেন।
বিশেষ করে কপিলমুনিতে ১টি, গোলাবাটিতে ১টি, গোপালপুরে ১টি, গজালিয়ায় ৩টি, মৌখালীতে ৩টি এবং মদিনাবাদে ১টিসহ মোট ১০টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ভূমি মালিকরা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে সঠিক সময়ে অধিগ্রহণের টাকা না পাওয়ায় প্রকল্পের নির্মাণকাজ থমকে যায়। পরবর্তীতে ভুক্তভোগীদের পাওনা অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত করে চলতি বছরের ৬ জুন থেকে পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি বাজারের আটকে থাকা বাঁক সরলীকরণের কাজ পুনরায় নতুন উদ্যোমে শুরু হয়।
বর্তমান চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রকল্পটির কাজ এখন একদম শেষ পর্যায়ে। খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের আঠারো মাইল (বেতগ্রাম) থেকে তালা উপজেলা পর্যন্ত অংশের সমস্ত কাজ ইতিমধ্যে শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে।
এ ছাড়া বেতগ্রাম থেকে পাইকগাছা শিবসা সেতুর দক্ষিণ পাশের সংযোগ সড়ক, কপিলমুনি বাজার, গদাইপুর, পাইকগাছা বাসস্ট্যান্ড, আলমতলা, গজালিয়া কালভার্ট এবং উপকূলীয় কয়রার হাতিয়ারডাঙ্গা ও আমাদি বাজার এলাকার প্রশস্তকরণ ও বাঁক সরলীকরণের কাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে।
সড়কটির পাইকগাছার গুরুত্বপূর্ণ কপিলমুনি ফকিরবাসা এবং গোলাবাটি মোড়ের বাঁক সোজা করে শুধু শেষ মুহূর্তের পিচঢালাইয়ের কাজটুকুই এখন বাকি। এ কাজটুকু শেষ হলেই সড়ক ব্যবস্থার ৯০ শতাংশের বেশি অগ্রগতি শতভাগে উন্নীত হবে এবং উন্মুক্ত হবে নির্বিঘœ যাতায়াতের নতুন দুয়ার।
সড়কের আমূল পরিবর্তন ও দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অবসানের খবরে খুলনা-পাইকগাছা-কয়রা অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের মনে বইছে আনন্দের জোয়ার।
স্থানীয় পথচারী মনিরুজ্জামান মনির আবেগের সাথে জানান, "দেরিতে হলেও কাজ শেষ হচ্ছেÑএতেই আমরা অনেক আনন্দিত। আমাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন আজ সত্যি হতে চলেছে। আগে বর্ষাকালে এ রাস্তায় বড় বড় গর্তে পানি জমে যে দুর্ভোগ হতো আর গরমে ধুলোবালির জন্য যেভাবে নাকানিচুবানি খেতে হতো, তা বলে বোঝানো যাবে না। এখন সেই নারকীয় যন্ত্রণার অবসান ঘটেছে।"
পাইকগাছা নাগরিক কমিটির সভাপতি মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর বলেন, "আগে সড়কের বাঁকে বাঁকে যানজট ও দুর্ঘটনার আতঙ্ক লেগেই থাকত। জমি অধিগ্রহণের আইনি জটিলতায় নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত যে দুর্ভোগ কেটেছেÑসেটাই স্বস্তির।"
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কয়রা উপজেলা শাখার সভাপতি মোস্তফাফিকুল ইসলাম তুলে ধরেন, "কয়রা উপজেলার মানুষ খুলনা জেলা শহরে যাতায়াত করার জন্য সম্পূর্ণভাবে এই একক সড়কটির ওপর নির্ভরশীল। সড়কটি উন্নত হওয়ায় উপকূলীয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও চিকিৎসা যোগাযোগে এক নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে।"
কাজের অগ্রগতি নিয়ে খুলনা সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তানিমুল হক জানান, ২০২০ সালে গৃহীত এই মেগা প্রকল্পটি নানা প্রতিকূলতায় কিছুটা বিলম্বিত হলেও কাজ এখন সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে। সাতক্ষীরার তালা অংশের কাজ অনেক আগেই শেষ হয়েছে এবং পাইকগাছা ও কয়রা অঞ্চলের বাঁক সরলীকরণের কাজ শেষের দিকে। ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণের চেক হস্তান্তরের পর থেকেই পুরো উদ্যোমে কাজ চলছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ হস্তান্তর করতে সওজ বদ্ধপরিকর।
