রাজনীতির মাঠে কর্মীর আত্মত্যাগের কথা বলা হয়, তার নামে স্লোগান ওঠে, শোকসভা হয়, নেতাদের বক্তব্যে উঠে আসে তার অবদানের স্বীকৃতি। কিন্তু সেই কর্মী নিহত হলে, নিখোঁজ হলে কিংবা দীর্ঘদিন কারাগারে থাকলে, তার পরিবারের দায়িত্ব কে নেয়? স্ত্রী-সন্তানের জীবনে নেমে আসা অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার খবর কতটা রাখে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল? রাজনীতির প্রয়োজনে একজন কর্মীকে সামনে আনা হলেও তার বিপদের দিনে পরিবারকে একা ফেলে রাখার প্রবণতা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক নির্মম বাস্তবতা।
রাজনীতির নামে সহিংসতা, মামলা কিংবা কারাবরণের শিকার কর্মীদের পরিবারের সংকট শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নিহত বা কারাবন্দি হলে আয় বন্ধ হয়ে যায়, সন্তানদের পড়াশোনা ব্যাহত হয়, চিকিৎসা ও বাসস্থানের নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। আইনি লড়াইয়ের ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবার শেষ সম্বলটুকুও হারায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক অবহেলা, নিরাপত্তাহীনতা ও মানসিক চাপ। অথচ যে রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য পরিবারের মানুষটি নিজের জীবন, স্বাধীনতা কিংবা জীবিকার ঝুঁকি নিয়েছেন, সেই সংগঠনের কাছ থেকেই বিপদের সময়ে সবচেয়ে বেশি সহায়তা পাওয়ার কথা। বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার গুরুতর ঘাটতিকেই সামনে আনে।
সম্প্রতি কিশোর গ্যাং নিয়ে বেসরকারি সংস্থা হেল্ড ফর ইউর জরিপ এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে উঠে আসা অভিজ্ঞতাগুলো এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। রাজনৈতিক সহিংসতায় অভিভাবক হারানো কিংবা পরিবারের উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়া কিছু শিশুর শিক্ষাজীবন থেমে যাচ্ছে। এদের মধ্যে কেউ শিশুশ্রমে যুক্ত হচ্ছে, কেউ আবার অপরাধচক্রের প্রলোভন ও প্রভাবের ঝুঁকিতে পড়ছে।
এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কর্মীদের ত্যাগের স্বীকৃতি যদি কেবল বক্তৃতা, স্মরণসভা কিংবা দলীয় প্রচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেই স্বীকৃতির বাস্তব মূল্য কোথায়? একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংগঠন তার কর্মীদের বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়াবে, এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু সহায়তা যেন দলীয় আনুগত্যের পুরস্কার কিংবা নেতার ব্যক্তিগত অনুগ্রহে পরিণত না হয়। প্রয়োজন স্বচ্ছ নীতিমালার আওতায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক কল্যাণব্যবস্থা, যেখানে নিহত, নিখোঁজ বা দীর্ঘমেয়াদি কারাবন্দি কর্মীদের পরিবারের আর্থিক সহায়তা, আইনি পরামর্শ, চিকিৎসা এবং সন্তানদের শিক্ষার বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে। তহবিলের অর্থের উৎস, ব্যয়ের হিসাব ও উপকারভোগী নির্বাচনের পদ্ধতিও হতে হবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় প্রকৃত অসহায় পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে সহায়তা দেওয়া, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশুদের ফিরিয়ে আনা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং অপরাধচক্রের নিয়োগপ্রক্রিয়া ঠেকাতে স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কোনো পরিবার যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হয়, আবার দলীয় পরিচয়ের সুবাদে কেউ যেন অন্যায্য সুবিধাও না পায়Ñ এ ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
রাজনীতির উদ্দেশ্য মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা, মানুষকে ব্যবহার করে পরিত্যাগ নয়। একজন কর্মীর আত্মত্যাগের প্রকৃত মর্যাদা তার পরিবারের নিরাপত্তা, সন্তানের শিক্ষা এবং সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত। রাজনৈতিক দলগুলোকে তাই আবেগনির্ভর প্রতিশ্রুতির বদলে বাস্তব দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। কারণ আজ যে শিশু দারিদ্র্য, অবহেলা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠছে, তার ভবিষ্যৎ শুধু একটি পরিবারের বিষয় নয়, তা সমাজেরও ভবিষ্যৎ।