ঢাকা,১৪ অক্টোবর- আগামী বছরের ২৭ মের মধ্যে পাঁচ ধাপে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রথম ধাপে আগামী ২১ জানুয়ারি প্রায় ৮০০টি ইউনিয়ন পরিষদে ভোটগ্রহণ হবে।
তবে নির্বাচনে কেউ প্রভাব বিস্তার, পেশিশক্তির ব্যবহার বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তাৎক্ষণিক শাস্তির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের বিষয়েও কঠোর অবস্থানে থাকবে কমিশন। নির্বাচনি পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করা হলে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে জুডিসিয়াল ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। কোনো প্রার্থী নির্বাচনি বিধিমালা ভঙ্গ করলে তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করার বিধানও রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ ধাপে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন আয়োজনের পাশাপাশি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ভোট নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে ধাপে ধাপে নির্বাচনি এলাকা নির্ধারণ করা হবে। প্রথমে জেলা সদরসংলগ্ন এবং পরে উপজেলা সদরের কাছাকাছি ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো সহজ হবে। প্রয়োজন হলে পাশের জেলা থেকেও অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা যাবে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে মানদণ্ড, সেই আলোকে অবশ্যই ভালো নির্বাচন করার জন্য আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে। আমাদের নিজস্ব কোনো মোটিভ নেই। আমরা ভালো নির্বাচন করার জন্যই দায়িত্ব নিয়েছি। ভালো নির্বাচন করার জন্য যা যা প্রয়োজন, সবই আমরা করব। আইন অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা থাকবে।’
তিনি বলেন, নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হবে। একটি সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করতে সবাই যেন একসঙ্গে কাজ করতে পারে, সে জন্য দলগুলোর সহযোগিতা চাওয়া হবে।
ইউপি নির্বাচনে যেকোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে কমিশনের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, নির্বাচনে জুডিসিয়াল ও এক্সিকিউটিভ—দুই ধরনের ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। কেউ নির্বাচনি পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করলে বিধি অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো পক্ষকে বিশেষ সুবিধা না দিয়ে অপরাধে জড়িত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে মারামারি, বিশৃঙ্খলা কিংবা পেশিশক্তির ব্যবহার কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। কোনো প্রার্থী এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে আইন অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রার্থিতা বাতিলও করা হতে পারে।
তবে কমিশনের লক্ষ্য শুধু শাস্তি দেওয়া বা নির্বাচন বন্ধ করা নয় বলে জানান এই নির্বাচন কমিশনার। তিনি বলেন, মানুষ যাতে অপরাধ করা থেকে বিরত থাকে এবং আইন মেনে চলে, সেই পরিবেশ তৈরি করাই কমিশনের উদ্দেশ্য।
গত সোমবার কমিশনের সভা শেষে পাঁচ ধাপে ইউপি নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।
ইসির ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২১ জানুয়ারি প্রথম ধাপে, ৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় ধাপে, ২৯ এপ্রিল তৃতীয় ধাপে, ১৩ মে চতুর্থ ধাপে এবং ২৭ মে পঞ্চম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, আনুমানিক ৪ হাজার ৩০০টি ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হয়েছে। আইন অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২৭ মের মধ্যে এসব ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন শেষ করা হবে। সংশ্লিষ্ট জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবেন। সাধারণত ভোটগ্রহণের প্রায় ৪২ থেকে ৪৫ দিন আগে তফসিল ঘোষণা করা হবে।
নির্বাচনি অপরাধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অনিয়ম, ভয়ভীতি দেখানো, বলপ্রয়োগ এবং ভোটারদের বাধা দেওয়ার মতো অপরাধ ঠেকাতে সংশোধিত নির্বাচনি বিধিমালায় শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) সংশোধিত নির্বাচন বিধিমালার ৮০(ক) বিধি অনুযায়ী, নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা কোনো ব্যক্তিকে হুমকি দেওয়া, ভয়ভীতি দেখানো, আঘাত করা কিংবা বলপ্রয়োগ করে তাঁর কাজে বাধা দেওয়া বা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা অপরাধ। একইভাবে কমিশনের অনুমোদিত গণমাধ্যম প্রতিনিধি বা পর্যবেক্ষকের কাজে বাধা দেওয়া, তাঁদের শারীরিক ক্ষতি করা কিংবা দায়িত্ব পালনে ব্যবহৃত সরঞ্জাম নষ্ট করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ ছাড়া কোনো ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া বা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা, কোনো প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া থেকে বিরত রাখা কিংবা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে বাধ্য করার মতো কাজও এই বিধির আওতায় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এসব অপরাধে দোষী প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা দুই ধরনের শাস্তিই দেওয়া যেতে পারে।
সংশোধিত বিধিমালায় প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও স্পষ্ট করা হয়েছে। কোনো উৎস থেকে পাওয়া রেকর্ড বা লিখিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কমিশনের কাছে যদি মনে হয় যে চেয়ারম্যান বা সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কোনো প্রার্থী কিংবা তাঁর নির্বাচনি এজেন্ট বিধিমালা ভঙ্গ করেছেন বা ভঙ্গ করার চেষ্টা করেছেন, তাহলে কমিশন সঙ্গে সঙ্গে তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবে।
তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর কমিশন যদি নিশ্চিত হয় যে কোনো প্রার্থী, তাঁর নির্বাচনি এজেন্ট অথবা তাঁর নির্দেশে কিংবা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্মতিতে অন্য কেউ বিধিমালা ভঙ্গ করেছেন, তাহলে লিখিত আদেশের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে।
অনিয়ম হলে ফল স্থগিত, আবার ভোট নেওয়ার সুযোগ
নির্বাচনি অনিয়মের কারণে কোনো ভোটকেন্দ্রের ফলাফল গুরুতরভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হলে তা স্থগিত করার ক্ষমতাও কমিশনের রয়েছে। সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, বলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি দেখানো, কারসাজি কিংবা অন্য কোনো অনিয়মের মাধ্যমে কোনো ভোটকেন্দ্র বা একাধিক কেন্দ্রের ফলাফল প্রভাবিত হয়েছে বলে কমিশনের কাছে মনে হলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোর ফলাফল স্থগিত করা যাবে।
এ ক্ষেত্রে কমিশন প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান চালিয়ে ফলাফল প্রকাশের নির্দেশ দিতে পারবে। আর অনুসন্ধানের পর ন্যায়সংগত মনে হলে সংশ্লিষ্ট ভোটকেন্দ্রের নির্বাচন বাতিল করে সেখানে আবার ভোটগ্রহণের নির্দেশও দিতে পারবে।
নির্বাচনি অপরাধ এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করতে মনিটরিং কমিটি গঠনের ব্যবস্থাও রয়েছে সংশোধিত নির্বাচনি বিধিমালায়। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর কমিশন নির্ধারিত সংখ্যক উপযুক্ত কর্মকর্তাকে নিয়ে প্রয়োজনীয়সংখ্যক মনিটরিং কমিটি গঠন করতে পারবে। এসব কমিটি নির্বাচনি অপরাধ ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করবে।
সব মিলিয়ে, পাঁচ ধাপে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন আয়োজনের পাশাপাশি নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে কমিশন। নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার ও পেশিশক্তির ব্যবহার ঠেকাতে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ, অপরাধের তাৎক্ষণিক বিচার, প্রার্থিতা বাতিল এবং অনিয়ম হওয়া কেন্দ্রে আবার ভোটগ্রহণের বিধান কার্যকরভাবে প্রয়োগের ওপরই সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার বিষয়টি নির্ভর করবে।
এস এম/ ১৪ অক্টোবর ২০২৬
