তীব্র জনবলসংকট, দক্ষ কারিগরের অভাব ও যন্ত্রাংশের ঘাটতির মধ্যেও যাত্রীসেবার মানোন্নয়নে তিনটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নিয়েছে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা। গরমে যাত্রীদের স্বস্তি দিতে কোচের জানালা বড় করা, এসি কোচে লাগেজ রাখার র্যাক বাড়ানো এবং চীনা লাগেজ ভ্যানকে স্বল্প দূরত্বে যাত্রী পরিবহনের উপযোগী করে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি কারখানাটির মেরামতকাজের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে কোচের জানালার কাজের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন রেলপথ মন্ত্রী। কারখানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও দক্ষ শ্রমিক ও প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে কাজের মান বজায় রাখার চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করেছেন।
১৮৭০ সালে প্রায় ১১০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা বাংলাদেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের কোচ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে বর্তমানে অনুমোদিত জনবলের মাত্র ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ কর্মী দিয়ে চলছে এর কার্যক্রম।

কারখানাটিতে মঞ্জুরিকৃত ২ হাজার ৮৫৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৭৬৩ জন। শূন্য রয়েছে ২ হাজার ৯৬টি পদ, যা মোট পদের প্রায় ৭৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বছরে এক হাজার কোচ মেরামতের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বর্তমানে ৬০০ থেকে ৭০০টি কোচ মেরামতের সক্ষমতা রয়েছে কারখানাটির। দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি, অভিজ্ঞ কারিগরের অভাব এবং প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশের সংকটকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সীমিত জনবল ও উপকরণ নিয়ে কাজের চাপ সামলাতে গিয়ে মেরামতের কাঙ্ক্ষিত মান বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
সম্প্রতি সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে কোচের জানালার কাজের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন রেলপথ মন্ত্রী। এ বিষয়ে কারখানার ক্যারেজ শপের সিনিয়র ইনচার্জ প্রকৌশলী মো. মোমিনুল ইসলামও কিছু ক্ষেত্রে কাজের মান খারাপ হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন।
তিনি জানান, দক্ষ শ্রমিকের অভাব এবং প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ না পাওয়ায় মেরামতকাজে সমস্যা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্য কোচ থেকে যন্ত্রাংশ খুলে এনে মেরামতাধীন কোচে সংযুক্ত করতে হয়। আগের মতো অভিজ্ঞ স্থায়ী কারিগর না থাকায় নতুন অস্থায়ী শ্রমিকদের দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে হচ্ছে। এতে কাজের মান শতভাগ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
মোমিনুল ইসলাম বলেন, কারখানায় দক্ষ শ্রমিকের অভাব রয়েছে। অদক্ষ শ্রমিক দিয়ে কাজ করতে গিয়ে কাজের মান শতভাগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেও আমরা ডিএস স্যারের নির্দেশনায় কাজের মান উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।

কারখানার পরীক্ষামূলক উদ্যোগগুলোর একটি হলো ২০০৬ সালে ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা একটি কোচের জানালার নকশা পরিবর্তন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কোচটির পুরোনো জানালা সর্বোচ্চ প্রায় ৯ ইঞ্চি পর্যন্ত খোলা যেত। গরমে যাত্রীদের অস্বস্তি কমাতে এবং কোচের ভেতরে বাতাস চলাচল বাড়াতে জানালা বড় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কারখানার সংশ্লিষ্টদের দাবি, নতুন নকশায় জানালা খোলার পরিসর ৯ ইঞ্চি থেকে বাড়িয়ে ১৬ ইঞ্চি করা হয়েছে। তাঁদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, জানালা দিয়ে বাতাস চলাচলের মোট উন্মুক্ত ক্ষেত্রফল ৫৮ বর্গফুট থেকে বেড়ে ১১০ বর্গফুট হয়েছে। এতে কোচের ভেতরে স্বাভাবিক বাতাস চলাচল বাড়বে এবং গরমের অস্বস্তি কমবে বলে আশা করছেন তাঁরা।
দ্বিতীয় উদ্যোগটি এসি কোচে যাত্রীদের লাগেজ রাখার ব্যবস্থা সম্প্রসারণ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একটি এসি কোচে সাধারণত ৮০টি আসন থাকে। কিন্তু প্রচলিত ব্যবস্থায় প্রায় ৫০ জন যাত্রীর লাগেজ রাখার উপযোগী জায়গা থাকায় অতিরিক্ত লাগেজ নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়।
এ সমস্যা সমাধানে লাগেজ রাখার সক্ষমতা বাড়িয়ে ৮০ জন যাত্রীর লাগেজ রাখার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে কোচের এক পাশে নতুন করে লাগেজ রাখার র্যাক সংযোজন করা হচ্ছে।

কারখানার নিজস্ব কারিগরদের মাধ্যমে সীমিত খরচে পরীক্ষামূলকভাবে কাজটি করা হয়েছে। উদ্যোগটি কার্যকর প্রমাণিত হলে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়া গেলে অন্য কোচেও এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করা হবে। এতে যাত্রীদের লাগেজ ব্যবস্থাপনা সহজ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তৃতীয় উদ্যোগের আওতায় পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের বহরে থাকা ৩০টি চীনা লাগেজ ভ্যানের একটিকে পরীক্ষামূলকভাবে যাত্রীবাহী কোচে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। স্বল্প দূরত্বে, বিশেষ করে শহরকেন্দ্রিক যাত্রী পরিবহনের উপযোগী করে ভ্যানটির অভ্যন্তরীণ বিন্যাস পরিবর্তনের চিন্তা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত নকশায় কোচের দুই পাশে আসন, দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের জন্য ওপরের দিকে হাতল এবং সহজে ওঠানামার জন্য বড় দরজা রাখার কথা বলা হয়েছে। অনেকটা মেট্রোরেলের অভ্যন্তরীণ বিন্যাসের আদলে কোচটি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সুফি নূর মোহাম্মদ বার্তা২৪.কমকে বলেন, রেলপথ মন্ত্রীর মেরামতকাজের মান বৃদ্ধির তাগিদকে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। অদক্ষ শ্রমিক ও কারিগরদের দক্ষ করে তাঁদের কাজের মান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কার্যক্রম প্রতিটি সপে (উপকারখানায়) শুরু হয়েছে। আশা করছি, চলমান মেরামতকাজের ত্রুটি-বিচ্যুতি দ্রুতই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
