হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে সমঝোতা প্রক্রিয়া চারটি শর্তে আটকে আছে। অধিকাংশ বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্য হলেও গুরুত্বপূর্ণ এসব শর্তে দুই পক্ষের অবস্থান বিপরীতমুখী। বাংলাদেশ বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়ভার, আয়ের রাজস্ব ভাগাভাগি, আইনি সুরক্ষা এবং ত্রুটি সংশোধনের সময়সীমা নিয়ে মতবিরোধও কাটেনি। ফলে জাপানের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি এখন সরকারের উচ্চপর্যায়ের হাতে চলে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শর্তগুলো বাংলাদেশের জন্য স্পর্শকাতর।
বিকল্প পরিকল্পনা না রাখার সুযোগ নিচ্ছে জাপানি কনসোর্টিয়াম
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আলোচনায় অগ্রগতি হলেও চারটি বিষয়ে ছাড় দিতে রাজি নয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও জাপানি কনসোর্টিয়াম। বিমানবন্দরের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্তে অনড় রয়েছে জাপানি কনসোর্টিয়াম। অন্যদিকে, বেবিচকও এসব শর্তে সম্মতি দেয়নি। বিষয়গুলো স্থানীয় পর্যায়ে সমাধান না হওয়ায় আলোচনার অগ্রগতি ও অমীমাংসিত শর্তগুলো লিখিত আকারে
বিমান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে সিদ্ধান্ত দেওয়া হলেই চূড়ান্ত চুক্তি হবে থার্ড টার্মিনাল পরিচালনায়।
চার শর্ত : জাপানি কনসোর্টিয়ামের একটি শর্ত হলো— বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকেই গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সার্বিক দায়-দায়িত্ব ও ঝুঁকি বহন করতে হবে। অর্থাৎ বিমানবন্দর পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি অংশীদারদের হাতে থাকলেও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের দায়িত্ব ও সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি বহন করতে হবে বিমান সংস্থাকে। এক্ষেত্রেও তাদের আয়ের অংশ পাবে কিনা তার নিশ্চয়তা সরকারকে দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, রাজস্ব ভাগাভাগির বিষয়। পূর্বনির্ধারিত চুক্তি অনুযায়ী, বিদেশি পক্ষ ২৭ শতাংশ রাজস্ব বাংলাদেশকে দেওয়ার চূড়ান্ত ছিল। কিন্তু অপারেশনাল প্রস্তুতি পর্বের নির্দিষ্ট মেয়াদে, অর্থাৎ ওপিসিটি চলাকালীন আট মাসের জন্য, তারা মাত্র সাড়ে ১৩ শতাংশ রাজস্ব পরিশোধের প্রস্তাব দিয়েছে। এতে নির্ধারিত হারের তুলনায় ১৪ শতাংশ কম রাজস্ব দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
তৃতীয়ত, আইনি সুরক্ষা ও দেশের আইন প্রয়োগের বিষয়েও দুই পক্ষের অবস্থান ভিন্ন। জাপানি পক্ষ এ ক্ষেত্রে বিশেষ আইনি সুবিধা ও দায়মুক্তি চেয়েছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ জানিয়েছে, সরকার যদি দেশের সব বিদেশি বিনিয়োগকারী বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সাধারণ কোনো আইন প্রণয়ন করে কিংবা বিদ্যমান আইন পরিবর্তন করে, তাহলে সেই আইন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ দেশের আইন ও সাধারণ আইনি পরিবর্তনের বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে সরকার একমত নয়।
জাপানি পক্ষের অবস্থান হলো দেশের সাধারণ কোনো আইনি পরিবর্তন তাদের ওপর প্রয়োগ করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ আইনি সুরক্ষা, দায়মুক্তি বা ছাড় দিতে হবে।
চতুর্থত, থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের ত্রুটি সংশোধন বা ত্রুটি শনাক্তের পর তা জানানোর নির্ধারিত সময়সীমা ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড (ডিএলপি) নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশ এ মেয়াদ নয় মাস নির্ধারণের পক্ষে মত দিয়েছে। তবে জাপান এ সময়সীমা বাড়িয়ে ১২ মাস করার দাবিতে অনড় রয়েছে।
যে কারণে অনড় বেবিচক : সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এটি শুধু পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তরের বিষয় নয়। চুক্তির শর্তগুলোর সঙ্গে সরকারের সম্ভাব্য আয়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কার্যক্রম, প্রকল্পের দায়বদ্ধতা এবং দেশের প্রচলিত আইনের প্রয়োগ জড়িত। তাই দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চারটি বিষয়ে নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান সিভিল এভিয়েশনের পক্ষে ছাড় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আলোচনায় অগ্রগতি হলেও অমীমাংসিত বিষয়গুলো চূড়ান্ত চুক্তির পথে বাধা হয়ে রয়েছে। ফলে এখন এসব শর্তে কী ধরনের সমন্বয় করা হবে, তা সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব) এম মফিদুর রহমান বলেন, শর্তগুলো খুবই স্পর্শকাতর। দেশের স্বার্থে এসব পর্যালোচনা করা দরকার। আগে দেশের স্বার্থ ও আর্থিক বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা দরকার। বিশাল আয়ের অংশ যদি বিদেশি প্রতিষ্ঠান নিয়ে যায় তাহলে খরচের সমন্বয় হবে কীভাবে। এ বিষয়ে সরকারকে অবশ্যই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এম মফিদুর রহমান বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে বেবিচকের দর-কষাকষি দুর্বল হয়েছে। শুরু থেকেই বিকল্প ব্যবস্থা না রাখায় একটি পক্ষের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। ফলে তারা একের পর এক শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। অগ্রিম অর্থ পরিশোধ, আইনি সুরক্ষা, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের অর্থ পরিশোধ এবং যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে দায়দায়িত্বের বিষয়েও নতুন শর্ত তোলা হচ্ছে। আগে যন্ত্রাংশের দায়দায়িত্বের মেয়াদ ছয় মাসের কথা থাকলেও এখন ১২ মাস পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, একটি পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বিকল্প পরিকল্পনা না রাখায় বেবিচক দুর্বল অবস্থানে পড়েছে। এখন তাদের শর্ত মেনে নেওয়া হলে ভবিষ্যতেও নতুন দাবি তোলার আশঙ্কা রয়েছে। তাই দেশের স্বার্থ রক্ষায় সরকারের উচিত চুক্তির শর্তগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা এবং বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
এ বিষয়ে বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) আবু সাঈদ মেহবুব খান আমাদের সময়কে বলেন, আমরা জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে থার্ড টার্মিনাল পরিচালনার জন্য আলোচনা শেষ করেছি। এখানে চারটি নতুন শর্ত এসেছে। শর্তগুলো সিভিল এভিয়েশনের পক্ষে মানা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সরকারে সিদ্ধান্ত দরকার। আমরা বিষয়টি অবহিত করে বিমান মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি। সবুজ সংকেত পেলে চুক্তি চূড়ান্ত হবে। তিনি দাবি করেন, এ শর্ত চুক্তিতে তেমন প্রভাব পড়বে না। আশা করছি দ্রুতই চুক্তি সম্পন্ন হবে। সরকারের নির্দিষ্ট সময় ১৬ ডিসেম্বর থার্ড টার্মিনাল চালু হবে।
