বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কোতোয়ালি পানি উন্নয়ন শাখার উপসহকারী প্রকৌশলী খাদিজা আক্তারের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অন্যের লাইসেন্স ব্যবহার করে বেনামে ঠিকাদারি কার্যক্রম পরিচালনা এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি চাকরিতে বহাল থেকে স্বামীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ উঠলেও প্রকৌশলী খাদিজা আক্তার এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে দাবি করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, খাদিজা আক্তার ২০১৭ সালে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন এবং ২০২০ সাল থেকে বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডে কর্মরত রয়েছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, কর্মস্থলে যোগদানের পর থেকেই তিনি অন্যের লাইসেন্স ও বেনাম ব্যবহার করে ঠিকাদারি কাজ পরিচালনা করে আসছেন। এ ছাড়া তাঁর স্বামী সজল হাওলাদারের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ বিনিয়োগের অভিযোগও আনা হয়েছে। নিজের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা ও স্বার্থের সংঘাত আড়াল করতেই তিনি স্বামীর লাইসেন্স ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাঁকে কারণ দর্শানোর বা শোকজ নোটিশ দিয়েছিল বলেও সূত্রে জানা গেছে।
তবে এসব অভিযোগ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত প্রকৌশলী খাদিজা আক্তার। তাঁর দাবি, বেনামে ঠিকাদারি করার তথ্য সম্পূর্ণ ভুল। তাঁর স্বামী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ডিপিএইচই) ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, পানি উন্নয়ন বোর্ডে নয়। সেখানে ব্যবসা পরিচালনা করায় কোনো আইনি বাধা নেই বলে তিনি মনে করেন। এ ছাড়া কর্মকালের সময়কাল নিয়েও তিনি আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, তিনি একই কর্মস্থলে ছয় বছর নয়, বরং চার বছরের কিছু বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন এবং দপ্তরের পক্ষ থেকে তাঁকে কখনো কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ বা শোকজ করা হয়নি।
এদিকে সরকারি চাকুরিজীবী হিসেবে তাঁর মূল বেতন স্কেল ২২ হাজার টাকা হওয়ার পরও বিলাসী জীবনযাপন এবং নিয়মিত ঢাকা-বরিশাল রুটে বিমানে যাতায়াত নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। এই প্রশ্নের জবাবে খাদিজা আক্তার জানান, ২০১০ সালে তাঁর বিয়ে হয় এবং তিনি চাকরিতে প্রবেশ করেন ২০১৭ সালে। তাঁর স্বামীর দাবি অনুযায়ী তিনি চাকরিতে যোগদানের অনেক আগেই থেকেই প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। স্বামীর ইচ্ছাতেই তিনি বিমানে যাতায়াত করেছেন দাবি করে তিনি বলেন, ২০১০ সালে বিয়ের পর এবং ২০১৭ সালে চাকরিতে যোগদানের আগেও তিনি স্বামীর ইচ্ছায় দুই-তিনবার বিমানে ভ্রমণ করেছেন। এ ছাড়া চাকরিজীবনে বরিশাল-ঢাকা রুটে তিনি বড়জোর দুইবার বিমানে যাতায়াত করেছেন, যা কোনো নিয়মিত বিষয় নয়। তাঁর এই বক্তব্যের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, তাঁর বিলাসী জীবনযাপন বা যাতায়াতের ব্যয় সরকারি বেতনের অর্থে নয়, বরং তাঁর স্বামীর পারিবারিক ও ব্যবসায়িক আয়ের মাধ্যমেই নির্বাহ করা হয়েছে।
খাদিজা আক্তারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা ও বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। তাঁর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে বা বেনামে পরিচালিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স, সরকারি কার্যাদেশ বা ওয়ার্ক অর্ডার, দরপত্র প্রক্রিয়ার নথি, ব্যাংক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রশাসনিক রেকর্ড পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হতে পারে। পাশাপাশি, তাঁর বিরুদ্ধে দাপ্তরিকভাবে কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে তার প্রেক্ষাপট ও বিষয়বস্তু কী ছিল এবং এসংক্রান্ত কোনো অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল কি না—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
সার্বিক দিক বিবেচনায়, একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক নথিপত্র যাচাই এবং কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছ তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপযুক্ত প্রমাণ সাপেক্ষে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে যেমন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক, তেমনি অভিযোগের সপক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ না মিললে তা পরিষ্কারভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করাও ন্যায়পরায়ণতার দাবি রাখে।
