স্মৃতিতে ছোটবেলার কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা
তুষার কান্তি সাহাপ্রকাশ:
দুর্গাপূজার রেশ কাটতে না কাটতেই এক সপ্তাহের ব্যবধানে আসে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ধন-সম্পদ ও সমৃদ্ধির দেবী মা লক্ষ্মীর আরাধনায় গৃহে আসে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি, দূর হয় অভাব-অনটন। ছোটবেলার সেই লক্ষ্মীপূজার স্মৃতিগুলো আজও মনের গভীরে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
আমাদের গ্রামের বাড়িটি বাজারের পাশেই। সেখানে প্রতি রবি ও বুধবার হাট বসত। এ ছাড়া প্রতিদিন সকাল-বিকেল নিয়মিত বাজার তো ছিলই। লক্ষ্মীপূজার আগে হাটে পালমশাইরা নিয়ে আসতেন মাটির তৈরি নানা রঙের লক্ষ্মীপ্রতিমা। সারি সারি সাজানো সেই প্রতিমাগুলোর মধ্যে ছিল কত রকমের রূপ আর বৈচিত্র্য! পাশেই ফুলের মালা ও পূজার অন্যান্য উপকরণ নিয়ে বসতেন বিক্রেতারা। বাবা বাজার ঘুরে দেখে-শুনে পছন্দমতো লক্ষ্মীঠাকুর কিনে বাড়ি ফিরতেন। প্রতিমা বাড়িতে আনার পর মা, বৌদি কিংবা দিদিরা উলুধ্বনি দিয়ে দেবীকে বরণ করে নিতেন। সেই উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে যেন আমাদের বাড়িতেও নেমে আসত উৎসবের পবিত্র আবহ।
পূজার দিন সকাল থেকেই বাড়িতে পড়ে যেত সাজ সাজ রব। বাড়ির মহিলারা ব্যস্ত হয়ে উঠতেন নানা রকমের নাড়ু, মোয়া, হাতে তৈরি নারকেলের সাজ আর ক্ষীরের সাজ বানাতে। বিশেষ করে তিলের নাড়ু তৈরির ধুম পড়ে যেত। কী যে মজার ছিল সেই আয়োজন! লুচি, সুজি আর নানা রকমের উপকরণ দিয়ে সাজানো হতো মা লক্ষ্মীর নৈবেদ্য। লক্ষ্মীপূজায় বাড়ির মহিলারা সাধারণত উপবাস থাকতেন। তাঁদের ব্যস্ততা, আন্তরিকতা আর ভক্তিভরে পূজার আয়োজন- সব মিলিয়ে বাড়িটা যেন এক অন্য রূপ ধারণ করত।
সন্ধ্যা নামলেই বাবা হ্যাজাক লাইট পরিষ্কার করে নতুন ম্যান্টেল লাগিয়ে আলো জ্বালাতেন। সেই হ্যাজাকের উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হয়ে উঠত বাড়ির উঠোন, আর আমাদের ছোট্ট মনও আনন্দে ভরে যেত। আজকের বৈদ্যুতিক আলোর ঝলমলে আয়োজনের মধ্যে দাঁড়িয়েও সেই হ্যাজাকের আলো যেন আমার স্মৃতিতে এক বিশেষ জায়গা দখল করে আছে।
বৌদি কিংবা দিদিরা চালের গুঁড়া বা চকগুঁড়া জলে গুলে বাড়ির বাইরে থেকে ঘরের ভেতর পর্যন্ত এঁকে দিতেন মা লক্ষ্মীর ছোট ছোট পায়ের ছাপ। সেই ছাপ ধরে মা লক্ষ্মী ঘরে প্রবেশ করবেন—এমনই ছিল আমাদের বিশ্বাস। পায়ের ছাপগুলো কখনো চালের হাঁড়ির দিকে, কখনো টাকা-পয়সা রাখা আলমারির দিকে এগিয়ে যেত। ছোটবেলায় এসব দৃশ্য দেখতাম গভীর বিস্ময় আর আনন্দ নিয়ে। মনে হতো, সত্যিই যেন মা লক্ষ্মী আমাদের বাড়িতে আসছেন, সংসারে সুখ-সমৃদ্ধি আর প্রাচুর্যের আশীর্বাদ নিয়ে।
আমাদের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলা শহর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে। পুরোহিতমশাই জেলা শহরের সব পূজা শেষ করে কখনো মধ্যরাতে, কখনো বা শেষরাতে আমাদের বাড়িতে পূজা করতে আসতেন। আমরা ছোটরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম কখন পূজা শুরু হবে, কখন দেখতে পাব মা লক্ষ্মীর আরাধনা। কিন্তু অপেক্ষা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়তাম, টেরই পেতাম না। সকালে ঘুম থেকে উঠে যখন শুনতাম পূজা হয়ে গেছে, তখন মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যেত। মনে হতো, আহা! এত রাত জেগে অপেক্ষা করেও মায়ের পূজাটা আর দেখা হলো না!
তবে সেই মন খারাপ বেশিক্ষণ স্থায়ী হতো না। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে পূজার প্রসাদ খাওয়ার আনন্দে মন আবার ভরে উঠত। মায়ের হাতের তৈরি সেই প্রসাদের স্বাদ আজও যেন জিভে লেগে আছে।
সময়ের স্রোতে কত কিছু বদলে গেছে, শৈশবের সেই দিনগুলোও হারিয়ে গেছে বহুদূরে। কিন্তু মাটির লক্ষ্মীপ্রতিমা, ফুলের মালা, উলুধ্বনি, হ্যাজাকের আলো, চালের গুঁড়ায় আঁকা দেবীর পায়ের ছাপ, গভীর রাতে পুরোহিতমশাইয়ের আগমনের অপেক্ষা আর মায়ের হাতের প্রসাদ- সবকিছু আজও স্মৃতির পাতায় অমলিন।
আজ বুঝি, সেই পূজা শুধু দেবী আরাধনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল পরিবারের ভালোবাসা, গ্রামের সহজ-সরল জীবন, মা-বৌদি-দিদিদের স্নেহমাখা ব্যস্ততা আর একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার অপার সুখ।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
