দিল্লির মাটিতে গত দুই দিনের নজিরবিহীন পুলিশি দমনপীড়নের জবাব দিতে অবশেষে রাজপথে নেমেছে বিরোধী দলগুলো। রবিবার পর্যন্ত চলা ব্যাপক ধরপাকড়, মারধর ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোমবার (১২ অক্টোবর) মধ্য দিল্লির বারাকস্তম্ভ রোড থেকে সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে এক বিশাল ‘গণতন্ত্রের পদযাত্রা’ অনুষ্ঠিত হয়। বিরোধীদের এই মিছিলে অংশ নেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, যুব গোষ্ঠী এবং দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কারচুপি ও ভোট চুরির অভিযোগের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে ইন্ডিয়া জোটের শরিক দলের নেতারা এই মিছিলে নেতৃত্ব দেন।
দমনপীড়নের পরও পিছু হটেনি আন্দোলন
গত ১১ অক্টোবর (রবিবার) কনট প্লেস ও যন্তর মন্তর থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নেওয়া বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয়েছিল দিল্লি পুলিশ। অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থী, আইনজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ প্রতিবাদকারীদের জোরপূর্বক আটক করে সেন্ট্রাল দিল্লি থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে পাণ্ড ওয়ালান খুরদের একটি বিচ্ছিন্ন কমিউনিটি সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আটক ব্যক্তিদের ওপর অকথ্যশারীরিক নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও আইনজীবীদের আটক কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
তবে এই কঠোর দমনপীড়ন ও ধরপাকড় আন্দোলন দমাতে পারেনি। উল্টো পুলিশের এমন স্বৈরাচারী আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে সোমবার আরও বড় পরিসরে রাজপথে নেমে আসে বিরোধী শিবির। বারাকস্তম্ভ রোড থেকে শুরু হওয়া এই পদযাত্রায় লাখো মানুষের ক্ষোভ ও প্রতিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সোমবারের এই মিছিলে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র, রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (আরজেডি) নেতা তেজস্বী যাদব, সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এবং বিশিষ্ট সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদবসহ বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ অংশ নেন।
পদযাত্রা চলাকালীন মল্লিকার্জুন খাড়গে ও রাহুল গান্ধীকে একটি বিশেষ বাসে দেখা যায়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কর্মকাণ্ড এবং ভোট চুরির অভিযোগের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে একটি আনুষ্ঠানিক রিট আবেদন বা পিটিশন দাখিল করতেই মূলত এই পদযাত্রার আয়োজন করা হয়। নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ফেরাতে এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথের আন্দোলনও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছেন বিরোধী নেতারা।
হাতে সংবিধানের বিশাল প্রতিলিপি ও স্লোগানে মুখরিত দিল্লি
মিছিলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল প্রতিবাদীদের হাতে থাকা ভারতের সংবিধানের একটি বিশাল আকারের প্রতিলিপি। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সংবিধানের মৌলিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষা করার গুরুত্ব তুলে ধরে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে মধ্য দিল্লি।
বিরোধী দলীয় নেতারা অভিযোগ করেছেন, দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের ভোট দেওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে নার্স, তরুণ সমাজ, শ্রমিক এবং বিভিন্ন বয়সের মানুষ এই পদযাত্রায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। মহিলা পুলিশকর্মীদেরও বিপুল সংখ্যক বিক্ষোভকারীকে ঘিরে রাখতে ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তৎপর দেখা যায়।
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের এই অনাস্থা এবং পরবর্তীতে পুলিশের কঠোর দমনপীড়ন ভারতেররাজনৈতিক অঙ্গনে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। গত দুই দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে আইনজীবীরাজানিয়েছেন, যেভাবে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ধরে নিয়ে গিয়ে হেনস্থা করা হয়েছে এবং মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তা মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।
সুপ্রিম কোর্টের দুয়ারে গিয়ে এই নজিরবিহীন ঘটনার বিচার দাবি করেছেন বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতারা। গণতন্ত্র ও স্বাধীন নির্বাচনী ব্যবস্থার সুরক্ষায় এই আন্দোলন আগামী দিনে আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রবিবারের রাতের সেই ‘হরর শো’ বা আতঙ্কের পর সোমবারের এই বিশাল জনস্রোত প্রমাণ করেছে যে, প্রশাসনিক দমনপীড়ন চালিয়ে জনগণের কণ্ঠস্বর রোধ করা যাবে না।
