নির্বাচনের আগে ৩১৫৯টি ইউনিয়ন পরিষদের জন্য ৫১ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ
আগামী ইউপি নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃনমুলে শক্তি বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু করেছে সরকারি দল বিএনপি। ইউপি নির্বাচনের যাতে দলীয় প্রার্থী নির্বাচিত হতে পারেন সে জন্য নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দলীয় প্রাথীদের জিতানোর জন্য স্থানীয় এমপিদের এসাইনমেন্ট দেয়ার খবর পাওয়া গেছে।
- দলীয় প্রার্থী না জিতলে উন্নয়ন নয় : চিফ হুইপ
- দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গেলে ব্যবস্থা : আইনমন্ত্রী
আগামী ইউপি নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃনমুলে শক্তি বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু করেছে সরকারি দল বিএনপি। ইউপি নির্বাচনের যাতে দলীয় প্রার্থী নির্বাচিত হতে পারেন সে জন্য নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দলীয় প্রাথীদের জিতানোর জন্য স্থানীয় এমপিদের এসাইনমেন্ট দেয়ার খবর পাওয়া গেছে।
দলের হাইকমান্ড থেকে পাওয়া এমন নির্দেশনার পর সরকার দলীয় এমপিরা নিজ নিজ এলাকায় দলীয় প্রার্থী যাতে ইউপি নির্বাচনের বিজয়ী হতে পারে সেজন্য নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইউপি নির্বাচনকে ঘিরে বাড়ানো হয়েছে বিএনপির দলীয় এমপিদের বিশেষ বরাদ্দ । অনেক স্থানে বিএনপির দলীয় প্রার্থীরা বিজয়ী না হলে উয়ন্নয়ন না করার হুংকারও দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বিএনপির দলীয় প্রার্থীদের বিশেষ বরাদ্দ নিয়ে সমালোচনা করেছেন বিরোধী দল।
সরকারি এবং বিরোধী দলের সংসদ সদস্যের (এমপি) নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বিএনপির সংসদ সদস্যরা কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ পাচ্ছেন। এ নিয়ে বিরোধী দল কথা বললে অন্য খাত থেকে সামান্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। বিরোধী দলকে চকলেট দিয়ে খুশি করে, আর তারা বিরিয়ানি খায়।
এদিকে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং দলীয় সমর্থিত একক প্রার্থী বাছাই দুই দিক থেকেই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে বিএনপি। সরকার হিসেবে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং দল হিসেবে ভালো ফল অর্জনের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কোন্দল, মনোনয়নপ্রত্যাশীদের প্রতিযোগিতা ও প্রভাবশালী নেতাদের হস্তক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে দলটিকে। এ পরিস্থিতিতে তৃণমূলের বিরোধ মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) গত ১২ অক্টোবর ইউপি নির্বাচনের পাঁচ ধাপের সময়সূচি ঘোষণা করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি থেকে ২৭ মে পর্যন্ত পাঁচ ধাপে দেশের প্রায় ৪ হাজার ৩০০ ইউনিয়ন পরিষদে ভোট গ্রহণের কথা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানান, আগামী ২১ জানুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২৯ এপ্রিল, ১৩ মে ও ২৭ মে পাঁচ ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার পর থেকেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো ও স্থানীয় পর্যায়ে সমর্থন সংগঠিত করার মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচনে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, সরকার ও প্রশাসন বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপ করবে না। সব প্রার্থীর সমান অধিকার নিশ্চিত করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে সরকার কোনো কলঙ্ক নিতে রাজি নয়।
বিএনপির নেতারা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সামনে দ্বিমুখী দায়িত্ব রয়েছে। সরকারপ্রধান হিসেবে তাকে নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে দলীয় প্রধান হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী নেতাদের হস্তক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করে যোগ্য প্রার্থী বাছাই এবং দলীয় ঐক্য বজায় রাখতে হবে। নির্বাচনে কোনো পক্ষ প্রভাব বিস্তার করলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার দলীয় সমর্থিত প্রার্থীদের ভালো ফল অর্জনও বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
দলের শীর্ষ নেতৃত্ব শুরু থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একক প্রার্থী দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। ১১ অক্টোবর রোববার রাতে বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকের পর সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানান, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি একক প্রার্থী দেবে। প্রধানমন্ত্রী সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন এবং স্থানীয় পর্যায়ে সঠিক নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
তবে মাঠপর্যায়ে একক প্রার্থী নির্ধারণ সহজ হবে না বলে মনে করছেন দলটির নেতারা। অনেক ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে একাধিক নেতা প্রার্থী হতে আগ্রহী। কোনো কোনো ইউনিয়নে ১০ থেকে ১২ জন পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম আলোচনায় রয়েছে। সাধারণ ও সংরক্ষিত সদস্য পদেও একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকায় বিরোধ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রার্থী বাছাইয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য বা প্রভাবশালী নেতারা নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিলে যোগ্য ও জনপ্রিয় নেতারা বাদ পড়তে পারেন। এতে মনোনয়নবঞ্চিতদের অসন্তোষ থেকে নতুন করে দলীয় কোন্দল তৈরি হতে পারে।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, প্রার্থী বাছাইয়ে ত্যাগী, যোগ্য, জনপ্রিয় ও সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় নেতাদের অগ্রাধিকার দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী বাছাইয়ের দায়িত্ব উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের দেয়া হচ্ছে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই করবেন জেলা পর্যায়ের নেতারা। মতবিরোধ দেখা দিলে বিভাগীয় সাংগঠনিক নেতারা সমন্বয় করবেন। প্রয়োজনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।
নির্বাচন ঘিরে সহিংসতার আশঙ্কাও রয়েছে। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ছয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে ১০১ জন নিহত হন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের সাত ধাপের নির্বাচনে নিহত হন ১১৩ জন এবং আহত হন ৭ হাজার ২০১ জন। অতীতের এসব অভিজ্ঞতার কারণে দলীয় কোন্দল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তাই ইউপি নির্বাচন বিএনপির জন্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের পাশাপাশি সরকারের নিরপেক্ষতা ও দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রমাণের পরীক্ষা। যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাই, স্থানীয় প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ এবং মনোনয়নবঞ্চিতদের অসন্তোষ সামাল দিয়ে তৃণমূলের ঐক্য ধরে রাখতে পারাই হবে দলটির প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এদিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পরিবহন উন্নয়ন সহায়তা খাতে সংসদ সদস্যদের মনোনীত প্রকল্প বাস্তবায়নে ৩২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। দেশের ৩ হাজার ২৫৩টি ইউনিয়ন পরিষদের অনুকূলে এ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের উপজেলা পরিষদ-২ শাখা থেকে গত ১৩ অক্টোবর জারি করা এক চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বরাদ্দ করা অর্থ ছাড় ও ব্যয়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় পরিবহন উন্নয়ন সহায়তা খাতে ইউনিয়ন পরিষদগুলোর অনুকূলে মোট ৩২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ অর্থ নির্ধারিত উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যয় করতে হবে।
বরাদ্দের অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতিস্বাক্ষরসহ বিল উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কাছে দাখিল করতে হবে। পরে প্রচলিত আর্থিক বিধিবিধান অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা যৌথভাবে এ অর্থ উত্তোলন ও ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করবেন।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সংসদ সদস্যদের মনোনীত প্রকল্প অনুযায়ী বরাদ্দের অর্থ ব্যয় ও প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদ উন্নয়ন সহায়তা ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা, ২০২১, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০০৮ এবং প্রযোজ্য আর্থিক বিধিবিধান অনুসরণ করতে হবে।
বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ে কোনো অনিয়ম হলে সংশ্লিষ্ট বিল পরিশোধকারী কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে দায়ী থাকবেন বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বরাদ্দের অব্যয়িত অর্থ আগামী ৩০ জুন ২০২৭ তারিখের মধ্যে সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে বরাদ্দের অর্থ ছাড় ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা ও উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব আতিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিটি অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে পাঠানো হয়েছে।
কোন প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে একক প্রার্থী
বিএনপির নেতারা বলছেন, দল দীর্ঘদিন দলীয়ভাবে ইউপি নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এ কারণে স্থানীয় নেতাদের মধ্যে এবার নির্বাচন নিয়ে বেশ আগ্রহ ও উৎসাহ তৈরি হয়েছে। তাই সবাই যে যার মতো করে তৎপরতা চালাচ্ছেন। এই আগ্রহকে দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যে রেখে একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে চায় দল। যদিও এ নিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যেও নানা সংশয় রয়েছে।
বিএনপির একজন র্শীষ নেতা বলেন, ‘‘বিএনপি একটি বড় দল। স্থানীয় নির্বাচনে অনেকেই প্রার্থী হতে আগ্রহী। তবে দল থেকে যোগ্য প্রার্থীদেরই মনোনয়ন দেওয়া হবে।’ তিনি জানান, এক্ষত্রে স্থানীয় নেতাদেরকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারাই চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করবেন। এক্ষেত্রে যোগ্য ও ক্লিন ইমেজধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কোনও বিতর্কিতদের সুযোগ দেওয়া হবে না। একক প্রার্থী নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে বিএনপি
দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গেলে ব্যবস্থা
এদিকে আগামী ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে বিএনপির দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীর পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ বিরোধী অবস্থান নিলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
গত মঙ্গলবার ঝিনাইদহের শৈলকুপায় উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে এক মতবিনিময়সভায় তিনি এসব কথা বলেন। শৈলকুপা উপজেলা বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে এ সভার আয়োজন করা হয়।
আইনমন্ত্রী বলেন, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কীভাবে কাজ করতে হবে, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী একটি ফর্মুলা দেবেন। দলের ভেতরে থেকে যারা দলীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন, তাদের বিষয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান কঠোর অবস্থান নেবেন।
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নের বিষয়ে তথ্য প্রধানমন্ত্রীর কম্পিউটার সিস্টেমে সংরক্ষিত থাকবে। আগামী স্থানীয় নির্বাচনে দল এমন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে চায়, যার নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। কানো বড় নেতা দলীয় মনোনয়ন পেলেও নির্বাচনে পরাজয়ের আশঙ্কা থাকলে শুধু তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বা পদমর্যাদার কারণে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, দলের নির্বাচনী বিজয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি ক্ষমতায় না এলে দলের বড় নেতা হওয়া কিংবা ব্যক্তিগতভাবে ভালো মানুষ হওয়া—কোনোটিই রাজনৈতিকভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল নিশ্চিত করতে পারত না। তিনি বলেন, দলীয় মনোনয়ন ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে নয়, বরং নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা বিবেচনায় দেওয়া হবে। কোনো নেতার পছন্দের প্রার্থী মনোনয়ন পেলেও তিনি নির্বাচনে জিততে না পারলে দলের লক্ষ্য পূরণ হবে না।
দলীয় প্রার্থী না জিতলে উন্নয়ন নয় :
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, দলীয় মনোনীত প্রার্থী নির্বাচনে জয়ী না হলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নে উন্নয়নকাজ করবেন না তিনি। তাঁর এমন বক্তব্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। গত ১৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় বামনা আসমাতুন্নেসা বালিকা বিদ্যালয় মাঠে উপজেলা বিএনপির কর্মিসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘দলীয় প্রার্থী নির্বাচনে জয়ী না হলে আপনাদের আলমারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। অন্য কেউ জয়ী হলে আমার কাছে আসতে পারবেন না, আমি কোনো কাজ দেব না। ওই ইউনিয়নের কপাল পুড়বে। দল যাঁকে মনোনয়ন দেবে, তিনি জয়ী না হলে ওই ইউনিয়নে কোনো কাজ হবে না। মনি আরও বলেন, ‘অনেক কাজ দিয়েছি। সেসব কাজ শুরু হবে। কিন্তু যদি দেখি দলীয় প্রার্থী জয়ী হননি, তাহলে ওই ইউনিয়নে সত্যিই আমি কাজ করব না।’
পানিসম্পদ মন্ত্রী ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হবে একটি বড় চ্যালেঞ্জের। দলীয় প্রতীক না থাকায় নির্বাচন আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। তাই চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে হলে তাকে অবশ্যই জনমানুষের হতে হবে। জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাদের সুখ-দুঃখে পাশে থাকা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, একাধিক প্রার্থী হলে ভোট বিভক্তির ঝুঁকি তৈরি হয়, যা দলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এ বিষয়েও সংশ্লিষ্ট সবাইকে এখন থেকেই সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।
লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেছেন যে, যাঁরা জিতে আসার মতো প্রার্থী, তাঁদেরই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হবে।
এদিকে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। মন্ত্রীর অভিপ্রায়ে ২০৩টি আসনে এমপিরা তাদের পছন্দের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারবেন। বিশেষ এই বরাদ্দের পরিমাণ ৫১ কোটি ১৮ লাখ টাকা। আগামী বছর ৩০ জুনের মধ্যে বরাদ্দের টাকা খরচ করতে হবে। এদিকে ইউনিয়ন পরিষদ উন্নয়ন সহায়তার অংশ হিসেবে ২০০৬ সাল থেকে সরাসরি ও শর্তহীন থোক বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এর ২৫ শতাংশ সব ইউনিয়নকে সমহারে দেওয়া হয়। বাকি বরাদ্দ দেওয়া হয় ইউনিয়ন পরিষদের কাজের দক্ষতার ভিত্তিতে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ইউনিয়ন পরিষদ উন্নয়ন সহায়তা খাতে এক হাজার ৮২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে বিশেষ অনুদান হিসেবে বরাদ্দ রয়েছে ২৭৯ কোটি টাকা। এই অর্থ থেকে ১৩ অক্টোবর ২০৩টি আসনের তিন হাজার ১৫৯টি ইউনিয়ন পরিষদের জন্য ৫১ কোটি ১৮ লাখ টাকা মঞ্জুর করা হয়। যদিও গত ১২ আগস্ট সারাদেশের চার হাজার ৫৮৮টি ইউনিয়ন পরিষদের জন্য ১৮০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। আগের বরাদ্দে এমপিদের অভিপ্রায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ ছিল না। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের জিও অনুযায়ী, প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য তিন থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
১৩ অক্টোবর মঞ্জুর করা বরাদ্দের আদেশে বলা হয়েছে, ‘স্থানীয় সংসদ সদস্যের অভিপ্রায় অনুযায়ী প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করতে হবে।’ প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য দেড় লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। এতে এমপিরা নিজেদের পছন্দের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য গড়ে ২৫ লাখ টাকা করে পাচ্ছেন। বরাদ্দ মঞ্জুরির চিঠিতে বলা হয়েছে, আগামী বছরের ৩০ জুনের মধ্যে টাকা খরচ করতে না পারলে তা সরকারি কোষাগারে ফেরত যাবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন , ‘বিষয়টিকে যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, এটা নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্যই করা হয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে শুধু সরকারি দলের এমপিদের এভাবে বরাদ্দ দেওয়া অগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমূলক।’ তিনি বলেন, ‘আগেও আমরা দেখেছি, সরকারি দলের এমপিদের এভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেই অর্থ ব্যবহারে দুর্নীতি হয়েছে; অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। সরকারি দল এবারও ক্ষমতার অপব্যবহার করে এটা করেছে।’
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ গনমাধ্যমকে বলেন, ‘বিষয়টি যদি সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অংশ হিসেবে নির্বাচিত কিছুসংখ্যক মানুষের জন্য বরাদ্দ হয়, তাহলে সেটি হবে সরকারি উন্নয়নমূলক কাজ। সেটিতে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার হবে না বলে নির্বাচন কমিশন মনে করে।’
তিনি বলেন, ‘এটি যদি বিশেষ উদ্দেশ্যে একটি ইউনিয়নের সব মানুষের জন্য বরাদ্দ হয়, তাহলে সেটাতে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকে বলে মনে করা হয়। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন অবশ্যই যথাযথ পদক্ষেপ নেবে এবং এই বরাদ্দ বন্ধ রাখতে বলবে।’ বিষয়টি তদন্ত করে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও আশ্বস্ত করেন এই নির্বাচন কমিশনার।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘এগুলো অনৈতিক কাজ। সংবিধান ও আদালতের রায় অনুযায়ী, স্থানীয় উন্নয়নে এমপিদের ভূমিকা থাকার কথা নয়। কিন্তু যখন শুধু সরকারি দলের এমপিদের বরাদ্দ দেওয়া হয় তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য, তখন তা আরও বৈষম্যমূলক হয়ে ওঠে। এর ফল মঙ্গলজনক হবে না।’
