চট্টগ্রামে এবার শারদীয় দুর্গাপূজায় নতুন প্রায় ৪০০টি পূজামণ্ডপ যুক্ত হয়েছে। উৎসবের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবেন ১২ হাজার আনসার ও পাঁচ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য। পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তার পাশাপাশি গুজব, অপপ্রচার ও সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে বিশেষ নজরদারি থাকবে। শুক্রবার থেকে কার্যকর হবে মণ্ডপকেন্দ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থা।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শনকালে এসব তথ্য জানান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।
এদিন বোয়ালখালীর বীণাপাণি পূজামণ্ডপে দেবী দুর্গাকে অন্নপূর্ণা রূপে উপস্থাপনের ব্যতিক্রমী আয়োজন দেখে মুগ্ধ হন জেলা প্রশাসক। মণ্ডপটির আলোকসজ্জা ও কারুকাজের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘অনেক মন্দির ও পূজামণ্ডপ দেখেছি। কিন্তু এখানকার ভাবনাটা খুবই আধুনিক ও ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে। এতে মেধার অসাধারণ বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।’
বীণাপাণি পূজামণ্ডপে এবার দেবী দুর্গাকে অন্নপূর্ণা রূপে উপস্থাপন করেছেন আয়োজকেরা। এর মধ্য দিয়ে মানুষের ক্ষুধা, অভাব-অনটন ও খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
পূজামণ্ডপের সভাপতি প্রবীর চৌধুরী বলেন, হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, অন্নপূর্ণা অন্ন ও প্রাচুর্যের দেবী। তিনি দেবী পার্বতীরই একটি রূপ। এখানে দুর্গাকে শুধু অসুরবিনাশিনী শক্তি হিসেবে নয়, মানুষের জীবনরক্ষা, মমতা ও কল্যাণের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রবীর চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের মূল বার্তা হলো, পৃথিবীতে কেউ যেন ক্ষুধার্ত না থাকে, প্রতিটি ঘরে যেন খাবার থাকে।’
আয়োজকদের ভাবনার প্রশংসা করে জেলা প্রশাসক বলেন, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অভাব-অনটন ও প্রত্যাশাকে উপজীব্য করে মণ্ডপটি সাজানো হয়েছে। দেবী দুর্গার আগমনে মানুষের অভাব দূর হবে—এমন ভাবনা ফুটিয়ে তুলেছেন আয়োজকেরা।
দর্শনার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন জেলা প্রশাসক। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মানুষ সেখানে আসেন। তাঁদের সুবিধার্থে পর্যাপ্ত শীতলীকরণব্যবস্থা রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আয়োজন যত সুন্দরই হোক, দর্শনার্থীরা যদি স্বাচ্ছন্দ্যে তা উপভোগ করতে না পারেন, তাহলে আয়োজনের সার্থকতা থাকে না।’
এর আগে বোয়ালখালীর মেধসমুনি আশ্রম পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক। প্রায় ২৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত আশ্রমটির পূজার প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা ঘুরে দেখেন তিনি।
চট্টগ্রামে নতুন প্রায় ৪০০ পূজামণ্ডপ
জেলা প্রশাসক জানান, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এবারই প্রথম শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। উৎসব ঘিরে মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সব ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চিত্র বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে চায় প্রশাসন।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবার দুর্গাপূজায় সরকারি সহায়তার পরিমাণ ও আওতা বাড়ানো হয়েছে। সারা দেশে গতবারের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৫০০টি সর্বজনীন পূজামণ্ডপ বেড়েছে। চট্টগ্রাম জেলাতেই নতুন মণ্ডপের সংখ্যা প্রায় ৪০০টি।
জাহিদুল ইসলাম বলেন, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নিয়ে জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করা হচ্ছে। প্রস্তুতি ও নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না, তা সরেজমিনে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
নিরাপত্তায় ১৭ হাজারের বেশি সদস্য
দুর্গোৎসব ঘিরে নিরাপত্তার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। তিনি বলেন, শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) থেকে জেলার সব পূজামণ্ডপে নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর হবে। এর পাশাপাশি পুলিশের ভ্রাম্যমাণ টহল, সাদাপোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও মণ্ডপের প্রবেশপথে নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকবে।
পুলিশ সুপার বলেন, ‘সবকিছু মিলিয়ে আমরা পূজামণ্ডপগুলোকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেব।’
পূজাকে কেন্দ্র করে গুজব, ভুয়া সংবাদ ও অপপ্রচার ছড়ানোর পাশাপাশি নাশকতার চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, ‘অনেকে নানা ধরনের গুজব বা ফেক নিউজ ছড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। নাশকতার চেষ্টাও হতে পারে। এসব বিষয়ে আমরা যথেষ্ট সজাগ ও সচেতন আছি।’
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পূজা উদ্যাপন পরিষদের নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছে পুলিশ। প্রতিটি মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা রাখা, স্বেচ্ছাসেবকদের সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন এবং প্রতিমা বিসর্জনের সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সুপার জানান, প্রতিমা বিসর্জন সূর্যাস্তের আগেই সম্পন্ন করতে আয়োজকদের অনুরোধ করা হয়েছে। প্রশাসন, পুলিশ ও পূজা উদ্যাপন পরিষদের সম্মিলিত সহযোগিতায় কোনো অপশক্তি উৎসবের পরিবেশ নষ্ট করার সুযোগ পাবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
২০ অক্টোবর চট্টগ্রামে আসছেন প্রধানমন্ত্রী
আগামী ২০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম সফর করবেন বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক। নগরের জেমসন হলে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গোৎসবের আয়োজনে তাঁর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি পাওয়ার কথা জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী দুর্গাপূজার প্রস্তুতি ও নিরাপত্তার বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছেন বলে জানান পুলিশ সুপার মাসুদ আলম। তিনি বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই প্রথম দুর্গাপূজা। উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থেকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সবার সহযোগিতায় এবারের দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও আনন্দঘন পরিবেশে সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার।
চট্টগ্রামনিউজ/ এসডি/
The post বোয়ালখালীতে অন্নপূর্ণা রূপে দুর্গার ব্যতিক্রমী উপস্থাপনা দেখে মুগ্ধ ডিসি জাহিদ appeared first on চট্টগ্রাম নিউজ.
