প্রতিবেদনটি লিখেছেন উজ্জ্বল চক্রবর্তী : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইতিহাসে অন্যতম চাঞ্চল্যকর ও রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড নিদারাবাদের সাত খুন। জমিজমা দখলের লোভে প্রথমে শশাঙ্ক দেবনাথকে হত্যা করা হয়। এর দুই বছর পর খুন করা হয় তাঁর স্ত্রী বিরজাবালা দেবনাথ ও পাঁচ সন্তানকে। হত্যার পর ছয়জনের লাশ টুকরো করে দুটি লোহার ড্রামে ভরে চুন ও লবণ দিয়ে ডুবিয়ে রাখা হয় ধুপাজুড়ি বিলে। একপর্যায়ে বিলের পানিতে ভেসে ওঠে দুর্গন্ধযুক্ত তেল। সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর। তবে শশাঙ্ক দেবনাথের লাশ আজও পাওয়া যায়নি।
১৯৮৭ সালের ১৬ অক্টোবর ওই পরিবারের কর্তা শশাঙ্ক দেবনাথকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়েছিল। এরপর ১৯৮৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তাঁর স্ত্রী-সন্তানসহ ছয়জনকে হত্যা করা হয়। নাসিরনগর উপজেলার হরষপুর ইউনিয়নের নিদারাবাদ গ্রামে সংঘটিত হয় এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি প্রায় চার দশক পরও স্থানীয় মানুষের মনে আতঙ্ক জাগায়। বর্তমানে গ্রামটি বিজয়নগর উপজেলার অন্তর্ভুক্ত।
এই হত্যাকাণ্ডে প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে উঠে আসে পাশের গ্রামের কসাই তাজুল ইসলামের নাম। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি শশাঙ্ককে হত্যা এবং তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বিবরণ দেন। মামলার বিচারে নয়জনের মৃত্যুদণ্ড হয়। তাঁদের মধ্যে তাজুল ইসলাম ও বাদশার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তাজুলের মৃত্যুর পর ক্ষুব্ধ মানুষ তাঁর লাশের দিকে জুতা ছুড়ে মেরেছিল, ছিটিয়েছিল থুতু। তাঁর ফাঁসি কার্যকরের পর বিভিন্ন বাড়িতে মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছিল বলেও জানান স্থানীয় লোকজন।
## প্রথমে নিখোঁজ শশাঙ্ক
নিদারাবাদ গ্রামের দরিদ্র সনাতন ধর্মাবলম্বী শশাঙ্ক দেবনাথ হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান। কোথায় গেছেন, কেন গেছেন—কেউই তা জানতেন না। পরিবারের সদস্যরাও তাঁর কোনো সন্ধান পাননি।
শশাঙ্কের জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ ছিল। তাজুল ইসলামসহ কয়েকজন দাবি করেন, শশাঙ্ক তাঁদের কাছে জমিজমা ও বাড়িঘর বিক্রি করে ভারতে চলে গেছেন। তাজুলের দাবি ছিল, শশাঙ্ক জমির মালিকানা বুঝিয়ে না দেওয়ায় ওই সম্পত্তির ওপর তাঁর অধিকার রয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে বিরোধও দেখা দেয়। শশাঙ্কের নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর স্ত্রী বিরজাবালা দেবনাথ স্বামীর সন্ধান ও জমি নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগে থানায় মামলা করেন। অভিযোগ ওঠে, মামলা তুলে নিতে তাঁকে বিভিন্ন সময় হুমকি দেওয়া হচ্ছিল।
## সীমান্তে নেওয়ার কথা বলে ডেকে নিয়ে হত্যা
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তাজুল ইসলাম শশাঙ্ককে হত্যার যে বিবরণ দেন, তা ছিল ভয়াবহ। তাজুলের জবানবন্দি অনুযায়ী, শশাঙ্ক হত্যার দুই বছর আগে এক শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে তিনি ও তাঁর জামাতা ইনু মিয়া শশাঙ্কের বাড়িতে যান। তাঁরা শশাঙ্ককে জানান, তাঁর মেয়ের জামাই মনা দেবনাথ ভারত সীমান্তে অপেক্ষা করছেন। এ কথা শুনে শশাঙ্ক জামাকাপড় পরে তাঁদের সঙ্গে বের হন।
পরে তাজুল ও ইনু শশাঙ্ককে নিয়ে মাধবপুরের নিজনগর গ্রামে আজিদ নামের এক ব্যক্তির বাড়িতে যান। সেখানে একটি ঘরে শশাঙ্ককে বসিয়ে রাখা হয়। আজিদ তাঁকে জানান, সীমান্তে বিশেষ বাহিনীর তৎপরতা থাকায় তখন সীমান্ত পার হওয়া সম্ভব নয়; মধ্যরাতে যেতে হবে।
জবানবন্দিতে তাজুল জানান, রাত আনুমানিক ১২টার দিকে ওই ঘরে তিনি, ইনু, আজিদ ও আরও দুজন মিলে গামছা দিয়ে শশাঙ্কের গলায় ফাঁস লাগিয়ে তাঁকে হত্যা করেন। এরপর আজিদ ও অপরিচিত দুই ব্যক্তি শশাঙ্কের মরদেহ কাঁধে করে ভারতের চেহরিয়া গ্রামে নিয়ে যান। সেখানে একটি পরিত্যক্ত শরণার্থীশিবিরের পাতকুয়ায় মরদেহটি ফেলে তাঁরা ফিরে আসেন।
শশাঙ্কের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি এভাবেই হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়। কিন্তু তাঁর সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের অবসান হয়নি। বরং স্ত্রী বিরজাবালা মামলা চালিয়ে যাওয়ায় তাঁর ও সন্তানদের জীবনও বিপন্ন হয়ে পড়ে।
## এক রাতে স্ত্রীসহ ছয়জনকে হত্যা
১৯৮৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাতে তাজুল ইসলাম ও তাঁর সহযোগীরা বিরজাবালার বাড়িতে ঢুকে তাঁকে এবং তাঁর পাঁচ সন্তানকে হত্যা করেন বলে মামলার বর্ণনায় উঠে আসে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন নিয়তিবালা দেবনাথ (১৭), সুভাস দেবনাথ (১৪), প্রণতিবালা দেবনাথ (১০), সুপ্রসন্ন দেবনাথ সুমন (৫) ও সুজন দেবনাথ (২)।
তাজুলের আদালতে দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পাঁচ-ছয় দিন আগে তিনি আবদুল হোসেন ও বাগদিয়া গ্রামের হাবিবকে নিয়ে পরিকল্পনা করেন। শশাঙ্কের সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে বিরজাবালা ও তাঁর সন্তানদের হত্যা করার কথা তাঁদের জানান। আবদুল হোসেনকে ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা হলেও প্রথমে ২০ হাজার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পরে বাগদিয়া গ্রামের মোমিনের কাছে টাকা জমা রাখা হয়।
জবানবন্দিতে তাজুল জানান, ৩ সেপ্টেম্বর আবদুল হোসেন তাঁকে বলেন, হত্যাকাণ্ডের জন্য লোকজন প্রস্তুত। এরপর তাজুল এক্তারপুরের সহিদ মাঝির ইঞ্জিনচালিত নৌকা ২০০ টাকায় ভাড়া করেন। মোমিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে দুটি লোহার ড্রাম, লবণ ও দুই মণ চুন কিনে রাখেন। ৫ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১০টার দিকে তাজুলের সহযোগীরা তাঁর বাড়িতে জড়ো হন। তাঁদের কারও হাতে ছিল রামদা, কারও হাতে লাঠি, বল্লম ও টর্চলাইট। পরে দুটি নৌকায় করে তাঁরা শশাঙ্কের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন।
তাজুলের জবানবন্দি অনুযায়ী, রাত আনুমানিক ১২টার দিকে তাঁরা শশাঙ্কের বাড়িতে পৌঁছান। সহযোগী ফিরোজ লোহার শাবল দিয়ে ঘরের পেছনের জানালার রড বাঁকিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং সামনের দরজা খুলে দেন। ঘরের পশ্চিম পাশের কক্ষে বিরজাবালা ও তাঁর সন্তানদের ঘুমন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। এরপর তাঁদের মুখ চেপে ধরে নৌকায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ধুপাজুড়ি বিলে।
জবানবন্দিতে তাজুল হত্যাকাণ্ডে নিজের ও সহযোগীদের ভূমিকার বিবরণ দেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, বিলে নিয়ে বিরজাবালা ও তাঁর সন্তানদের একে একে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহগুলো টুকরো টুকরো করে দুটি লোহার ড্রামে ভরা হয়। ড্রামে চুন ও লবণ দিয়ে ঢাকনা বন্ধ করে পানিতে ডুবিয়ে রশি দিয়ে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। এরপর রক্তমাখা নৌকাও ধুয়ে ফেলা হয়।
## যেভাবে বেরিয়ে আসে হত্যাকাণ্ডের রহস্য
বিরজাবালা ও তাঁর সন্তানদের নিখোঁজ হওয়ার চার দিন পর গ্রামের স্কুলশিক্ষক আবুল মোবারক একদিন বিকেলে স্কুল থেকে নৌকায় ধুপাজুড়ি বিল পেরিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে বিলের পানিতে দুর্গন্ধযুক্ত তেল ভাসতে দেখে তাঁর সন্দেহ হয়। তিনি মাঝিকে নৌকা ঘুরিয়ে নিতে বলেন। একপর্যায়ে নৌকার নিচে কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা লাগে। মাঝি বৈঠা দিয়ে পানির নিচে খোঁচাখুঁচি করে একটি লোহার ড্রাম তুলে আনেন। ড্রামটির মুখ বন্ধ ছিল। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল তীব্র দুর্গন্ধ।
বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় শিক্ষক আবুল মোবারক হরষপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য ও গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের খবর দেন। তাঁরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ড্রামের মুখ খুলতেই ভেতরে তিনটি মরদেহ দেখতে পান। এরপর বিলের পানিতে আরও তল্লাশি চালানো হয়। একপর্যায়ে পাওয়া যায় দ্বিতীয় একটি ড্রাম। সেটির ভেতরেও ছিল তিনটি মরদেহ। পরে শনাক্ত হয়, মরদেহগুলো নিখোঁজ বিরজাবালা ও তাঁর পাঁচ সন্তানের।
শশাঙ্কের একমাত্র মেয়ে সুনীতিবালা দেবনাথ তখন শ্বশুরবাড়িতে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। পরিবারের বাকি সদস্যদের হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় শোক, ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
## আদালতের রায়, নয়জনের মৃত্যুদণ্ড
হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, শশাঙ্কের সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যেই প্রথমে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। পরে তাঁর স্ত্রী মামলা চালিয়ে যাওয়ায় বিরজাবালা ও সন্তানদেরও হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। তদন্তে তাজুল ইসলামকে প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আদালতে তাঁর দেওয়া জবানবন্দিতেও হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বিবরণ উঠে আসে।
বিচারে জজ আদালত নয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তাঁদের মধ্যে তাজুল ইসলাম ও বাদশার ফাঁসি কার্যকর হয়। অন্য আসামিদের মধ্যে ২৭ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং দুজন খালাস পান।
তাজুলের ফাঁসি কার্যকরের পর তাঁর প্রতি মানুষের ক্ষোভ প্রকাশ পায় প্রকাশ্যেই। কারাগার থেকে তাঁর লাশ বের করার সময় ক্ষুব্ধ মানুষ থুতু ছিটায়, জুতা ছুড়ে মারে। তাঁর ফাঁসির পর বিভিন্ন বাড়িতে মিষ্টি বিতরণের কথাও জানান স্থানীয় লোকজন।
## সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আতঙ্ক দেখেছিলেন সাংবাদিকেরা
তৎকালীন সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কর্মরত সাংবাদিক এবং বর্তমানে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মোহাম্মদ আরজু, সৈয়দ মোহাম্মদ আকরাম ও দীপক চৌধুরী বাপ্পি ঘটনাটির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, সে সময় জেলা শহর থেকে নিদারাবাদ গ্রামে যাওয়া ছিল বেশ কষ্টসাধ্য। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে কখনো রিকশায়, কখনো পায়ে হেঁটে সেখানে যেতে হতো তাঁদের।
তাঁদের ভাষ্য, তখন সংবাদ সংগ্রহ ও পাঠানোর কাজে বর্তমান সময়ের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার ছিল না। ঘটনাস্থল থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে জেলা শহরে ফিরে টেলিগ্রাম কিংবা বাহকের মাধ্যমে ঢাকায় সংবাদপত্রের কার্যালয়ে খবর পাঠাতে হতো। ওই সাংবাদিকেরা জানান, সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁরা স্থানীয় মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক দেখেছেন।
## ‘কাঁদে নিদারাবাদ’ চলচ্চিত্রেও উঠে আসে হত্যাকাণ্ড
নিদারাবাদের এই হত্যাকাণ্ড সে সময় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। হত্যাকাণ্ডের বিচার ও আসামিদের শাস্তির দাবিতে মানুষ সোচ্চার হয়ে ওঠে। ঘটনাটি নিয়ে পরবর্তী সময়ে ‘কাঁদে নিদারাবাদ’ নামে একটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।
প্রায় চার দশক পেরিয়ে গেলেও নিদারাবাদের মানুষ সেই হত্যাকাণ্ডের কথা ভুলতে পারেননি। জমির লোভে একটি পরিবারের সাত সদস্যের প্রাণহানি, দুই বছরের শিশুসহ ছয়জনের মরদেহ ড্রামে ভরে বিলে ফেলে দেওয়া এবং প্রধান আসামির ফাঁসির পর জনরোষ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি আজও ইতিহাসের অধ্যায়।
The post এখনও কাঁদে নিদারাবাদ, আজও পাওয়া যায়নি একজনের লাশ appeared first on The voice of Brahmanbaria || Local news means the world is.
