চীনের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে শিক্ষার্থীদের দিন কাটে ক্লাস, পরীক্ষা, পড়াশোনা ও কঠোর সময়সূচির মধ্যে। এর মধ্যেই দেশটির হাইনান প্রদেশের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কথিত সময়সূচি ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন সন্ধ্যায় নির্দিষ্ট আধা ঘণ্টা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের প্রধান সংবাদ অনুষ্ঠান দেখতে বাধ্য করা হচ্ছে।
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি স্ক্রিনশটে দেখা যায়, হাইনান প্রদেশের হাইকৌ শহরের হাইকৌ নম্বর ৪ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের সন্ধ্যা ৭টা থেকে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশনের (সিসিটিভি) জনপ্রিয় সংবাদ অনুষ্ঠান ‘সিনওয়েন লিয়ানবো’ দেখতে হয়। এরপর তাদের জন্য রয়েছে দীর্ঘ সময়ের দুটি সন্ধ্যাকালীন অধ্যয়ন পর্ব।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের সকাল ৬টা ২০ মিনিটে ঘুম থেকে উঠতে হয় এবং রাত ১১টায় ঘুমানোর জন্য আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়।
তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য এপক টাইমস এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও প্রচারিত স্ক্রিনশটগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংবাদমাধ্যমটির সঙ্গে যোগাযোগের পরও স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
ফলে নির্দিষ্ট স্কুলে এমন নিয়ম চালু রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে ঘটনাটি চীনের শিক্ষাব্যবস্থায় রাজনৈতিক বার্তা ও রাষ্ট্রীয় আদর্শ প্রচারের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
সংবাদ দেখা, নাকি রাজনৈতিক মতাদর্শের শিক্ষা?
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির ‘সিনওয়েন লিয়ানবো’ দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ অনুষ্ঠান। এতে সাধারণত চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও সরকারের শীর্ষ নেতাদের কার্যক্রম, সরকারি নীতিমালা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অবস্থান তুলে ধরা হয়।
সমালোচকদের মতে, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত এ অনুষ্ঠান দেখতে বাধ্য করা হলে তা কেবল সমসাময়িক ঘটনা সম্পর্কে জানার সুযোগ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তাদের তথ্য গ্রহণের পরিসর ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
দ্য এপক টাইমস-এ উদ্ধৃত কয়েকজন চীনা ভাষ্যকার এ ব্যবস্থাকে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত প্রাতিষ্ঠানিক রুটিনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ একে রাজনৈতিক মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। তবে এগুলো সমালোচকদের ব্যাখ্যা; বিদ্যালয়টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত কোনো তথ্য নয়।
চীনে রাজনৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষা অবশ্য নতুন কিছু নয়। দেশটির শিক্ষা আইন এবং সরকারি নীতিমালায় কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রীয় আদর্শের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার সুস্পষ্ট সম্পর্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
পাঠ্যক্রমেই রয়েছে রাজনৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষা
চীনের শিক্ষা আইন অনুযায়ী, দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব অনুসরণ করবে। একই সঙ্গে শিক্ষার নির্দেশক নীতির মধ্যে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ‘নতুন যুগে চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতন্ত্র সম্পর্কে চিন্তাধারা’ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগ বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আদর্শিক ও রাজনৈতিক শিক্ষা বিস্তারের বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা প্রকাশ করে। এতে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত ধাপে ধাপে রাজনৈতিক শিক্ষা জোরদারের কথা বলা হয়।
প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের দেশ, জাতীয় প্রতীক ও বিপ্লবী ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে শেখানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ে রাজনৈতিক সচেতনতা ও জাতীয় পরিচয়বোধ গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আর উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে রাজনৈতিক বিষয়ে জ্ঞান এবং সি চিন পিংয়ের রাজনৈতিক দর্শন সম্পর্কে বোঝাপড়া বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এ কারণে হাইকৌয়ের কথিত সময়সূচি নিয়ে বিতর্কের মূল বিষয় শুধু রাজনৈতিক শিক্ষার উপস্থিতি নয়; বরং নিয়মিত রাষ্ট্রীয় সংবাদ অনুষ্ঠান দেখাকে দৈনন্দিন শিক্ষাজীবনের অংশ করার অভিযোগ।
আইনেও বাধ্যতামূলক দেশপ্রেমমূলক শিক্ষার নির্দেশনা
চীনের আদর্শিক শিক্ষার কাঠামো আরও সুস্পষ্ট হয় দেশটির ‘দেশপ্রেমমূলক শিক্ষা আইন’ কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে। ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি আইনটি কার্যকর হয়।
আইন অনুযায়ী, সব ধরনের ও সব স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যক্রমের বিভিন্ন অংশে দেশপ্রেমমূলক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও পাঠ্যবহির্ভূত কার্যক্রমেও এ শিক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর নির্দেশনা রয়েছে।
আইনটিতে দেশপ্রেমমূলক শিক্ষার আওতায় রাজনৈতিক আদর্শ, চীনের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, জাতীয় ঐক্য, জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা, জাতীয় প্রতীক এবং বীর ও আদর্শ ব্যক্তিত্বদের অবদানের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ কার্যক্রমে পরিবার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
আইনের ১৫ নম্বর ধারায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে দেশপ্রেমমূলক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। ১৬ নম্বর ধারায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি ও বিভিন্ন কার্যক্রমে তা যুক্ত করার নির্দেশনা রয়েছে।
তবে দেশপ্রেমের শিক্ষা এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য তৈরির মধ্যে পার্থক্য নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ এসব নীতিকে দেশপ্রেম, জাতীয় পরিচয় ও ঐক্য গঠনের অংশ হিসেবে বর্ণনা করে। অন্যদিকে, বিভিন্ন গবেষণায় সি চিন পিংয়ের শাসনামলে দেশপ্রেমের সরকারি ধারণার সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টি ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্যের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থায় সি চিন পিংয়ের দর্শনের বিস্তার
চীনের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আদর্শিক শিক্ষা জোরদারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের মে মাসে সি চিন পিং বিদ্যালয়গুলোতে আদর্শিক ও রাজনৈতিক শিক্ষা শক্তিশালী করার এবং তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকেন্দ্রিক শিক্ষাসামগ্রীর একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব স্তরে এ শিক্ষা সমন্বিত করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
চীনের সরকারি নীতিতে এর লক্ষ্য হিসেবে দেশপ্রেমিক, কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি অনুগত এবং জাতীয় পুনর্জাগরণে অবদান রাখতে সক্ষম নাগরিক গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
এ শিক্ষা শুধু রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা রাজনৈতিক শিক্ষার নির্দিষ্ট ক্লাসে সীমাবদ্ধ নয়। পাঠ্যবই, শ্রেণিকক্ষের পাঠদান, জাতীয় পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠান, পাঠ্যবহির্ভূত কর্মকাণ্ড এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রমেও আদর্শিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা রয়েছে।
২০২৬ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া প্রেসের মাধ্যমে প্রকাশিত একটি গবেষণাতেও দেশপ্রেমমূলক শিক্ষাকে বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে বিদ্যালয়, কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠন, প্রচারপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক সংস্থার ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণাটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, চীনের শিক্ষাব্যবস্থায় সি চিন পিংয়ের রাজনৈতিক দর্শনের গুরুত্ব ক্রমেই বেড়েছে এবং ২০২১ সাল থেকে এ বিষয়ে বিশেষ পাঠ্যবই বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে।
দৈনন্দিন রুটিনে রাষ্ট্রীয় বার্তার প্রভাব
হাইকৌয়ের কথিত সময়সূচি নিয়ে বিতর্কের তাৎপর্য এখানেই। রাজনৈতিক শিক্ষা, পাঠ্যবই কিংবা জাতীয় পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানের নির্দিষ্ট শিক্ষাগত ও নাগরিক উদ্দেশ্য রয়েছে। কিন্তু প্রতিদিনের সংবাদ অনুষ্ঠান সাধারণত সমসাময়িক ঘটনা সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়।
এ ধরনের অনুষ্ঠান যখন রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সম্প্রচারমাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে প্রচার করা হয় এবং বিদ্যালয়ের বাধ্যতামূলক রুটিনের অংশ হয়ে ওঠে, তখন শিক্ষার্থীরা কী ধরনের তথ্য পাচ্ছে, কোন তথ্য তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না এবং বিকল্প ব্যাখ্যা জানার সুযোগ কতটা রয়েছে—এসব প্রশ্ন সামনে আসে।
চীনের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির গণমাধ্যম কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে পরিচালিত হয় এবং রাজনৈতিক তথ্যের প্রবাহের ওপর রাষ্ট্রের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ে একটি জাতীয় বৈঠকেও শিক্ষার্থীদের নৈতিক বিকাশের ওপর নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সরকারি বক্তব্যে প্রাথমিক শিক্ষাকে চীনের বৃহত্তর জাতীয় উন্নয়নের কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয় এবং সি চিন পিংয়ের শিক্ষাবিষয়ক নির্দেশনা বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।
বিতর্কের কেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের তথ্য পাওয়ার অধিকার
হাইকৌয়ের বিদ্যালয়কে ঘিরে অভিযোগের সত্যতা এখনো নিশ্চিত না হলেও চীনের শিক্ষাব্যবস্থায় রাজনৈতিক ও দেশপ্রেমমূলক শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক উপস্থিতি সুস্পষ্ট।
দেশটির আইন ও সরকারি নির্দেশনায় শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে প্রতিদিন সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় সংবাদ অনুষ্ঠান দেখার বাধ্যবাধকতা সত্য হলে তা শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনে রাজনৈতিক বার্তা অন্তর্ভুক্ত করার আরেকটি উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে নির্দিষ্ট বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রচারিত স্ক্রিনশটের সত্যতা যাচাই না হওয়ায় এ বিষয়ে সতর্কতা জরুরি।
তারপরও ঘটনাটি একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এনেছে—শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কি শুধু শ্রেণিকক্ষ, পাঠ্যবই ও পরীক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন পরিবেশে তারা যে তথ্য গ্রহণ করে, সেটিও তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে?
চীনের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঘিরে বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে সেই প্রশ্নই।
সূত্র: ডেইলি মিরর
এমএস/
