শহীদ কমরেড আসাদ, শান্তি, মানিক, তোজো ও ফজলু—লাল সালাম!
খবির সিকদার
১৯৭১ সালের ২৩ অক্টোবর, বাংলা ৬ কার্তিক। যশোরের মনিরামপুর উপজেলার চিনাটোলা বাজারসংলগ্ন এলাকা থেকে পাকিস্তানি শাসকদের এদেশীয় দোসর রাজাকার বাহিনী গ্রেপ্তার করে পাঁচ বিপ্লবী কমরেড—আসাদ, শান্তি, মানিক, তোজো ও ফজলুকে। পরে হরি নদীর সেতুর ওপর তাঁদের নির্মমভাবে হত্যা করে মরদেহ নদীর জলে নিক্ষেপ করা হয়।
ঘাতকেরা পাঁচটি প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল, কিন্তু মুছে দিতে পারেনি তাঁদের রাজনৈতিক সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস। ছাত্র আন্দোলন, কৃষক সংগঠন ও বিপ্লবী রাজনীতির বিভিন্ন ধারায় যুক্ত হয়ে তাঁরা সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁদের জীবন, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো।
শহীদ কমরেড আসাদউজ্জামান আসাদ
কমরেড আসাদউজ্জামান আসাদ ১৯৪৯ সালের ৬ জানুয়ারি যশোর শহরের খড়কি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মো. শাহাদাত আলী এবং মাতা সাজেদা খাতুন। নয় ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ।
১৯৬৪ সালে যশোর জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৬৬ সালে মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয় থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে তিনি ভূগোল বিষয়ে সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ছাত্র আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি এমএম কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এবং পরবর্তী সময়ে সহসভাপতি (ভিপি) ছিলেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে যশোরের সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শ্রমিকশ্রেণির রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)-তে যোগ দেন। যশোর রিকশাচালক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে কাজ করেন। ১৯৭০ সালের দিকে পার্টির সভ্যপদ লাভের পর গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আত্মনিয়োগ করেন।
১৯৭১ সালের ২৩ অক্টোবর কমরেড শান্তি, মানিক, তোজো ও ফজলুর সঙ্গে রাজাকার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। পরে হরি নদীর সেতুতে তাঁদের হত্যা করা হয়।
শহীদ কমরেড সিরাজুল ইসলাম শান্তি
কমরেড সিরাজুল ইসলাম শান্তি ১৯৪৫ সালে যশোর জেলার শার্শা উপজেলা সদরে তাঁর মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আছির উদ্দিন এবং মাতা জোবেদা খাতুন। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ।
দেশভাগের পর তাঁর পরিবার ভারতের বনগাঁ থেকে যশোর শহরের ষষ্ঠীতলাপাড়ার পিটিআই রোডে এসে বসবাস শুরু করে। তিনি যশোর জিলা স্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সমাজতন্ত্র ও বিপ্লবী রাজনীতি-সম্পর্কিত বই পড়ার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। ১৯৬২ সালের দিকে যশোরের প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়।
ধীরে ধীরে তিনি সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৬৯-৭০ সালের কৃষক আন্দোলনে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭০ সালে পার্টির সভ্যপদ লাভ করেন এবং একই বছর আত্মগোপনে যান। তিনি যশোর জেলা কৃষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন।
১৯৭১ সালের ২৩ অক্টোবর কমরেড আসাদ, মানিক, তোজো ও ফজলুর সঙ্গে রাজাকার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। পরে হরি নদীর সেতুতে তাঁদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
শহীদ কমরেড আহসান উদ্দিন মানিক
কমরেড আহসান উদ্দিন মানিক ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা থানার তোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আফাজ উদ্দিন ছিলেন ফুড ইন্সপেক্টর। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। পিতার চাকরির সুবাদে তাঁদের পরিবার যশোর শহরের ডিসি বাংলো রোডের নিজস্ব বাড়িতে বসবাস করত। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল আনুমানিক ২৪ বছর।
১৯৬৪ সালে তিনি যশোর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতা হিসেবে যশোর জেলার বিভিন্ন এলাকার মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করে ছাত্রসংগঠন গড়ে তোলেন। ১৯৬৯ সালের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে তিনি জেলার ছাত্রসমাজের অন্যতম অগ্রণী নেতা ছিলেন। এ সময় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের যশোর জেলা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
ছাত্র আন্দোলনের পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)-এর সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৭০ সালে পার্টির সভ্যপদ লাভ করেন। ১৯৭১ সালে সার্বক্ষণিক পার্টিকর্মী হিসেবে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে আত্মনিয়োগ করেন। ছাত্রনেতা থেকে সার্বক্ষণিক বিপ্লবী কর্মীতে উত্তরণ তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৯৭১ সালের ২৩ অক্টোবর কমরেড আসাদ, শান্তি, তোজো ও ফজলুর সঙ্গে রাজাকার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। তাঁদের সঙ্গে তিনিও শহীদ হন।
শহীদ কমরেড মাশুকুর রহমান তোজো
কমরেড মাশুকুর রহমান তোজো ১৯৪২ সালের ৩১ জানুয়ারি যশোর শহরের ষষ্ঠীতলাপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান এবং মাতা করিমা। দুই ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়।
১৯৫৬ সালে যশোর জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৫৮ সালে যশোর এমএম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতশাস্ত্রে সম্মান শ্রেণির পড়াশোনা সম্পন্ন করে পদার্থবিজ্ঞানে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গেলেও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার তাগিদে অ্যাকচুয়ারিয়াল বিষয়ে পড়াশোনা শেষ না করেই দেশে ফিরে আসেন। ১৯৬৯ সালের দিকে হোমল্যান্ড বীমা কোম্পানিতে যোগ দেন।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দেশে ফিরে প্রথমে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)-এর সঙ্গে যুক্ত হন। পরে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)-তে যোগ দেন। একই বছরের মার্চ মাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হন। মুক্তি পাওয়ার পর গ্রামে ফিরে সার্বক্ষণিক পার্টিকর্মী হিসেবে কৃষকদের মধ্যে কাজ শুরু করেন।
১৯৭১ সালের ২৩ অক্টোবর কমরেড আসাদ, শান্তি, মানিক ও ফজলুর সঙ্গে রাজাকার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। পরে তাঁদের সঙ্গে তিনিও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
শহীদ কমরেড ফজলু দফাদার
ফজলু দফাদার ১৯৫১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি যশোর জেলার মনিরামপুর থানার গোপালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা রজব আলী দফাদার ছিলেন সাধারণ কৃষক এবং মাতা নুরজাহান। ছয় ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়।
স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি এবং জুনিয়র হাইস্কুল থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। দেশে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হলে সেনাবাহিনী ত্যাগ করে গ্রামে ফিরে আসেন।
গ্রামে ফিরে একপর্যায়ে কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিইপি—মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)-এর নেতৃত্বে বিপ্লবী সংগ্রামে যুক্ত হন। সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান হিসেবে তাঁর জীবনপথ গ্রামীণ জনজীবন থেকে উঠে আসা মানুষের বিপ্লবী রাজনীতিতে অংশগ্রহণের একটি দৃষ্টান্ত।
১৯৭১ সালের ২৩ অক্টোবর কমরেড আসাদ, শান্তি, মানিক ও তোজোর সঙ্গে রাজাকার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। তাঁদের সঙ্গে তিনিও শহীদ হন।
পাঁচ শহীদের বিপ্লবী উত্তরাধিকার
আসাদ, শান্তি, মানিক, তোজো ও ফজলু—পাঁচজনের জীবনপথ এক ছিল না। কেউ ছিলেন ছাত্র আন্দোলনের অগ্রণী নেতা, কেউ কৃষক আন্দোলনের সংগঠক, কেউ উচ্চশিক্ষিত মেধাবী মানুষ, আবার কেউ গ্রামীণ সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা বিপ্লবী কর্মী। কিন্তু তাঁদের রাজনৈতিক জীবনের অভিন্ন সূত্র ছিল সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবং সেই লক্ষ্যে নিজেদের নিয়োজিত করা।
মাওবাদী বিপ্লবী দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁদের স্মরণ করা মানে শুধু অতীতের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং শ্রমিক-কৃষকসহ শোষিত মানুষের মুক্তির প্রশ্নকে সামনে আনা, শ্রেণিশোষণ ও বৈষম্যের বাস্তবতা উপলব্ধি করা এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া।
হরি নদীর সেতুতে তাঁদের জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের স্মৃতি ও সংগ্রামের ইতিহাস নদীর জলে বিলীন হয়নি। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁদের জীবন, রাজনৈতিক ভূমিকা ও আত্মত্যাগের ইতিহাস পৌঁছে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।
