নিরামিষ আর আমিষ—খাবার মূলত এই দুই ধরনের। কিন্তু সনাতন ধর্মমতে খাবার তিন ধরনের—সাত্ত্বিক, রাজসিক আর তামসিক। মেয়ে যখন বছরান্তে ঘরে ফেরে, তখন এই সব ‘ধরন’ ধরে ধরে খাওয়া হয় না, যায়ও না। ‘মেয়ে ঘরে ফেরে’—দুর্গাপূজায় এই বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাই শাস্ত্রবিধিবদ্ধ খাবারের চেয়ে বরং প্রচলিত বা লোকায়ত খাবারের উপস্থিতি থাকে এ সময়। দেবী দুর্গা বাঙালি হিন্দুর কাছে যতটা না দেবী, তার চেয়ে বেশি ঘরের মেয়ে, যিনি বছর শেষে বাপের বাড়ি আসেন বেড়াতে। ফলে এই পূজায় লৌকিকতা বেশি। সন্তান বাপের বাড়ি এলে আর যা-ই হোক, খাওয়াদাওয়ার কমতি হয় না। এ জন্যই হয়তো দুর্গাপূজায় খাবারের এত আয়োজন।
শুধু আয়োজন থাকলেই তো আবার হবে না, ‘মেয়ে’ হলেও তিনি আবার দেবীও বটে। তাই তাঁকে খাবার উৎসর্গ করারও কিছু নিয়মকানুন আছে, সেটা মানতে হয়। ষষ্ঠী থেকে দশমী—প্রতিদিনই খাবার হওয়া চাই জবরদস্ত! এই খাবার হবে মূলত নিরামিষ। দুধ, দই, মুড়ি, মুড়কি, মিষ্টি, মাছ, মাংস, লুচি, লাবড়া—সবই থাকবে পূজার খাবারের তালিকায়, তবে তিথি ধরে। সাধারণত প্রতিমা বিসর্জনের পর হবে আমিষ খাওয়া, তার আগে নিরামিষ। আবার এসবের মধ্যে অনেক পরিবারে আছে নানা নিয়ম। কোনো পরিবার পূজার পুরো সময় নিরামিষ খাবার খাবে, আবার কোনো পরিবার প্রতিমা বিসর্জনের পর আমিষ খাবে। যেমন জানা যায়, বিক্রমপুরের জমিদার যদুনাথ রায়ের পরিবারে পূজার সময় প্রতিদিন খাওয়া হতো ইলিশ। এটা ছিল তাঁদের পারিবারিক প্রথা। কিন্তু জমিদারবাড়ির বাইরে এই প্রথা প্রায় দেখা যায় না।
ষষ্ঠী থেকে নবমীর সময় নিরামিষ কী খাবেন, সেটি একেবারেই আপনার পছন্দ। তবে সাধারণত এ সময়টায় খাওয়া হয় নিরামিষ খিচুড়ি, লাবড়া বা ঘন্ট-জাতীয় সবজি, ডালের বড়া, পাঁপড় ইত্যাদি আর ডাল। তবে মসুর ডাল খাওয়া হবে না। আবার এ সময় অনেক মন্দিরে বিশেষ ধরনের ভোগের আয়োজন করা হয় বলেও নিরামিষের আয়োজন বেশি থাকে। শীতের সবজি বাজারে আসতে শুরু করেছে। ফলে জমিয়ে নিরামিষ খাওয়া হবে এবার। এই খাবারের মজাটা হলো কম্বিনেশন। কোন খাবারের সঙ্গে কোনটিকে মেলানো যায়, সেটি গবেষণার বিষয়। পাতে থাকতে পারে পাঁচফোড়নের সম্ভার দেওয়া সয়াবড়ি, কাঁচা কলা, আলু, কচুমুখী দিয়ে রান্না করা ঘন্ট, মুগ বা অড়হর ডাল, পাঁপড় ভাজা, চুকাই ফুল বা আমড়ার চাটনির কম্বিনেশন। অথবা রাঁধতে পারেন খুব সাধারণ পুরোনো কোনো খাবার। আবার নিরামিষ খাবারে প্রচুর নিরীক্ষা করা যায় বলে নতুন কোনো রেসিপিও তৈরি করে ফেলতে পারেন। তবে যা-ই করুন, স্বাদের একটা সমন্বয়ের চেষ্টা করবেন।
এবার আসা যাক মিষ্টির কথায়। পূজার কয়েক দিন সকালের নাশতায় রসগোল্লা বা জিলাপি কিংবা সন্দেশ—কোনো না কোনো মিষ্টি থাকবেই। মিষ্টি আর দই ছাড়া পূজার খাবার কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব! দইয়ের কথা যখন এলই; বলে রাখি, পূজার এই সময়টাতে যেকোনো সময় দই খাওয়া যায়। তবে সম্ভবত দশমীর সকাল হলো দই-মিষ্টি খাওয়ার আদর্শ সময়।
দশমী মানেই বিসর্জনের বিষণ্ন সুর। দেবী দুর্গা ফিরে যাবেন কৈলাসে, নিজের সংসারে। তাই শেষ খাবারটা ভালো হওয়া চাই। এ জন্যই মনে হয় বিভিন্ন জায়গায় দশমীর খাবার নিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রথা ও মিথ প্রচলিত আছে। যেমন বরিশাল বা পাবনা অঞ্চলে দশমীর দিন খাওয়া হয় ইলিশ। সম্পন্ন গৃহস্থদের বাড়িতে আবার আসে জোড়া ইলিশ। উত্তরবঙ্গে খাওয়া হয় মাংস।
দশমীর দুপুরের আয়োজন? জুঁই ফুলের মতো সাদা সুগন্ধি চালের ভাত, তার ওপর গাঢ় খয়েরি রঙের মাংসের ঝোল, ঝিরিঝিরি করে কাটা আলু আর ফালি করে কাটা পটোল ভাজা, একফালি কাগজি লেবু আর এক বাটি ঘন ডাল। আর কী চাই!
